kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


হবিগঞ্জে সুরাবই পালপাড়া

বাপ-দাদার পেশায় পেট ভরে না আর

হবিগঞ্জ প্রতিনিধি   

৩ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



যতক্ষণ রোদ আছে পালপাড়ায় ততক্ষণ চলে কাজ। রোদের সঙ্গে কাজের সম্পর্ক।

তাই কুমারদের বলা হয় রুদ্র পাল। হবিগঞ্জ সদর উপজেলার সুতাং নদীর অববাহিকায় সুরাবই গ্রাম। পূর্বপুরুষের পেশা ধরে এখানে গড়ে ওঠে পালপাড়া। একসময় সুতাং নদীর ঘাটে বড় বড় নৌকা ভিড়ত। সেগুলো বোঝাই হতো পালপাড়ার তৈরি মাটির পণ্যে। সেই পণ্য দূর-দূরান্তে বিক্রি হতো। এ নিয়ে পেটে-ভাতে বাঁচত পালপাড়ার মানুষ। কিন্তু এসব এখন কেবলই গল্প। প্লাস্টিক, স্টেইনলেস, মেলামাইন, কাচসহ বিভিন্ন বাসন-কোসন দখল করেছে বাজার। ফলে সেই পালপাড়ার প্রতাপ এখন নেই। বেচাকেনা হয় না মাটির হাঁড়ি-পাতিল।     

ফলে বাপ-দাদার পুরনো পেশার প্রতি এখন আর আগ্রহ নেই নতুন প্রজন্মের। এখন তারা নিজেদের বিকল্প কর্মসংস্থানে নিযুক্ত করছে। সুরাবই পালপাড়ার বাসিন্দা বাদল পাল। পূর্বপুরুষদের মাটির কাজ করে নুন আনতে পান্তা ফুরায় অবস্থা। বংশের পেশা ছেড়ে শেখেন দর্জির কাজ। সুরাবই বাজারে একটি দর্জির দোকান চালু করেন। সেখানেও আয়-রোজগার কম। তবে বিভিন্ন শ্রেণির মানুষের সঙ্গে চলাফেরা করতে গিয়ে উপলব্ধি করেন, নিজেদের উন্নতি করতে হলে সবার আগে প্রয়োজন শিক্ষার। নিজের আয়ের সবটুকু ঢেলে দিয়ে মেয়ে আঁখি রানী পাল ও ছেলে বাবুল চন্দ্র পালকে ভর্তি করেন স্কুলে।

আঁখি চন্দ্র পাল যখন সুরাবই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় থেকে পঞ্চম শ্রেণিতে বৃত্তি পায় তখন বাদল পালের পরিবারে কী আনন্দ। মেয়েকে ভর্তি করেন নুরপুর হাই স্কুলে। পরে এসএসসি ও এইচএসসিতে ভালো ফল করে আঁখি ভর্তি হয় চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগে। আঁখির এই সফলতায় পালপাড়ায় নতুন স্পন্দনের সৃষ্টি হয়। আঁখির ভাই বাবুলও নুরপুর উচ্চ বিদ্যালয়ের নবম শ্রেণিতে অধ্যয়নরত।

আঁখির বাবা বাদল পাল জানান, তাঁর মেয়ে আরো লেখাপড়া করতে চায়। কিন্তু তাঁর তেমন সামর্থ্য নেই। এর পরও সন্তানদের ভবিষ্যতের কথা চিন্তা করে তিনি আঁখি ও বাবুলকে লেখাপড়া করাচ্ছেন।

আঁখি পাল বলে, ‘সবাই যদি লেখাপড়া করে বড় হতে পারে, তাহলে আমরা কেন কষ্টের এই পেশাকে নিয়ে পড়ে থাকব? আমরাও বড় হতে চাই। ’

বাদলের পরিবারের সফলতা দেখে সুরাবই পালপাড়ায় সবাই নজর দেন তাঁদের বাচ্চাদের স্কুলে পাঠানোর জন্য। সুরাবই পালপাড়ার পাশের বাড়ি শিপ্রা শুক্ল বৈদ্য পালের। তিনি সুরাবই সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের খণ্ডকালীন শিক্ষক। তিনি জানান, পালপাড়ার প্রতিটি শিশু এখন স্কুলে যায়। তারা এখন হাই স্কুল ও কলেজেও পড়তে চায়।

স্কুলের শিক্ষক নাছরিন আক্তার জানান, পালপাড়ার ছেলেমেয়েরা স্কুলে আসে নিয়মিত এবং তাদের ফলও ভালো। সুরাবই পালপাড়ায় প্রবেশ করতেই দেখা হয় রমেশ পাল ও তাঁর স্ত্রী সুমিত্রা পালের সঙ্গে। মাটির জিনিসপত্র পোড়ানোর পর তা পন (মাটির জিনিস পোড়ানোর চুলা) থেকে অন্যত্র সরানোতে ব্যস্ত তাঁরা। মুক্তিযুদ্ধের আগে তাঁদের বিয়ে হয়। স্বাধীনতাযুদ্ধে পালিয়ে থাকার সময় তাঁদের এক মৃত সন্তান জন্ম নেয়। পরে আরো দুই সন্তান জন্ম নিলেও তারা একজন এক মাসের মধ্যে এবং আরেকজন জন্মের দুই দিনের মধ্যে মারা যায়। তাঁরা মনে করেন এটি উপরির দোষ। অনেক কবিরাজ-বৈদ্য দেখিয়েও কোনো প্রতিকার হয়নি। জীবিকার তাগিদে তাঁরা মাটির জিনিস তৈরি করেই জীবিকা নির্বাহ করেন। তাঁরা জানান, এখন জমি থেকে মাটি কিনে আনতে হয়। দামও বেশি পাওয়া যায় না। এর পরও নিরুপায় হয়ে তাঁরা এ কাজ করছেন। তাঁরা আরো জানান, তাঁদের বাড়ির পাশে অনেক শিল্প-কারখানা গড়ে উঠেছে। পালপাড়ার যুবক ও যুবতীরা সেখানে কাজ নিচ্ছেন। অনেকেই ব্যবসা-বাণিজ্য করছেন। এভাবে চলতে থাকলে একসময় মৃিশল্প বিলুপ্ত হয়ে যাবে।

১২ বছর আগে নিরঞ্জন পাল সড়ক দুর্ঘটনায় মারাত্মকভাবে আহত হন। এখন অসুস্থ অবস্থায় শয্যায় দিন কাটে তাঁর। তবে স্ত্রী চারুবালা পাল ও সন্তান দুলাল পাল মাটির কাজ করে ঠিকই তাঁর ভরণপোষণ করছেন। যান্ত্রিক সভ্যতায় আবেগ কমে এলেও পালপাড়ায় আছে ভালোবাসার ছোঁয়া। এখানে নেই কোনো কলহ। সামান্য ঝগড়া হলে তা নিজেরাই নিষ্পত্তি করে। পালপাড়ার লোকজন কোনো দিন মামলা করেনি। আইন-আদালত তারা চেনে না। বাস্তবতা মেনে তারা পৈতৃক পেশা ছেড়ে দিচ্ছে। এ নিয়ে প্রবীণদের মধ্যে আক্ষেপ থাকলেও কম পরিশ্রমে অধিক আয়ের দিকেই এখন মনোযোগ তাঁদের।

হবিগঞ্জ সমাজসেবা অধিদপ্তরের উপপরিচালক হাবিবুর রহমান জানান, দেশের মৃিশল্পসহ বিলুপ্তপ্রায় শিল্পকে বাঁচাতে সমাজসেবা অধিদপ্তর সুদবিহীন ঋণের ব্যবস্থা করেছে। হবিগঞ্জের বিভিন্ন এলাকায় মৃিশল্পের জন্য এই ঋণ দেওয়া হয়। পালপাড়ায় শিক্ষার হার বাড়ছে। এটি ইতিবাচক। তবে এ শিল্পকে বাঁচিয়ে রাখতে হবে।

বাংলাদেশ পরিবেশ আন্দোলন বাপার সাধারণ সম্পাদক তোফাজ্জল সোহেল জানান, দেশে প্লাস্টিক ও সিনথেটিক তৈজসপত্রের ব্যবহার বেড়ে যাওয়ায় মৃিশল্প মার খাচ্ছে। অথচ কুমারদের তৈরি জিনিসপত্র পরিবেশবান্ধব। পাল সম্প্রদায়ের লোকজন যদি লেখাপড়া করার পর মাটির তৈরি জিনিসকে শিল্পে রূপ দিতে পারে, তাহলে তা দেশের জন্য মঙ্গল হবে। এ ক্ষেত্রে সরকারকে সবার আগে এগিয়ে আসতে হবে।


মন্তব্য