kalerkantho

বুধবার । ৭ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৩ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৬ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


ব্রাজিলে দিউমা অপসারিত নতুন প্রেসিডেন্ট তেমার

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



ব্রাজিলের নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিয়েছেন রক্ষণশীল নেতা মিশেল তেমার। প্রেসিডেন্ট পদ থেকে দিউমা হুসেফ অপসারণের কয়েক ঘণ্টার মধ্যেই নতুন প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন তিনি।

শপথগ্রহণের পর ব্রাজিলের নতুন যুগের সূচনার অঙ্গীকার করেন তিনি। তবে দিউমা হুসেফ অভিযোগ করেছেন, তাঁকে অন্যায়ভাবে অপসারণ করে ‘পার্লামেন্টারি অভ্যুত্থান’ সংঘটিত করা হয়েছে।

গত বুধবার দেশটির আইনসভার উচ্চ কক্ষ সিনেটে সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটে দিউমা হুসেফকে অপসারণ করা হয়। সিনেটের ভোটাভুটিতে ৬১-২০ ভোটে ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট দিউমা হুসেফের বিদায় নিশ্চিত হয়। একই সঙ্গে অবসান হয় ১৩ বছরের বামপন্থী শাসনের। এর আগে গত মে মাসে দিউমা হুসেফের বিরুদ্ধে অভিশংসন প্রক্রিয়া শুরু হয়েছিল। তখন তাঁকে ছয় মাসের জন্য বরখাস্ত করেছিল সিনেট।

গত বুধবার সিনেট ভোটাভুটির পর দিউমা হুসেফ বলেন, “কোনো অপরাধ ছাড়াই তারা প্রেসিডেন্টের ক্ষমতা খর্ব করল। তারা একজন নিরপরাধী ব্যক্তিকে দোষী সাব্যস্ত এবং ‘পার্লামেন্টারি অভ্যুত্থান’ সংঘটিত করল। ’’

গত মে মাসে হুসেফ সাময়িক বরখাস্ত হওয়ার পর থেকে অস্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্বপালন করছিলেন তেমের। বুধবার স্থায়ী প্রেসিডেন্ট হিসেবে শপথ নিলেন ৭৫ বছর বয়সী এই নেতা। ২০১৮ সালে পরবর্তী নির্বাচনের আগ পর্যন্ত তিন প্রেসিডেন্ট হিসেবে থাকবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

শপথ নেওয়ার পর টেলিভিশনে সম্প্রচারিত জাতির উদ্দেশে দেওয়া এক ভাষণে অর্থনীতি পুনরুদ্ধার ও ১১ শতাংশ বেকারত্ব মোকাবিলায় ঐক্যবদ্ধভাবে তাঁকে সমর্থন দিতে জনগণের প্রতি আহ্বান জানিয়েছেন। চীনে জি-টোয়েন্টি সম্মেলনে যোগ দিতে দেশ ছাড়ার আগে দেওয়া এক ভাষণে রক্ষণশীল এ নেতা বলেন, ‘এই মুহূর্তটি ব্রাজিলের আত্মবিশ্বাস ফিরিয়ে আনার আশা জাগিয়েছে। অনিশ্চয়তা শেষ হয়েছে। ’

দ্রুত বর্ধনশীল অর্থনীতির দেশ হিসেবে কয়েক বছর আগেও ব্রাজিল বিশ্বে মর্যাদার আসনে প্রতিষ্ঠিত হচ্ছিল। কিন্তু মন্দার কবলে পড়ে ব্রাজিলের অর্থনীতি ক্রমেই খারাপের দিকে যায়। এর ওপর রাষ্ট্রীয় তেল কম্পানি পেট্রোব্রাসের ঘুষ কেলেঙ্কারি প্রেসিডেন্ট হুসেফের জোট সরকারের ওপর কালো ছায়া ফেলে। লাখ লাখ মানুষ রাস্তায় নেমে বিক্ষোভ করে। তারা হুসেফের পদত্যাগ দাবি করে। হুসেফ মাত্র আড়াই বছর আগে ব্রাজিলের প্রথম নারী প্রেসিডেন্ট হিসেবে দ্বিতীয়বারের মতো নির্বাচিত হয়েছিলেন। কিন্তু কংগ্রেস সদস্যদের দুর্নীতি এবং বাজেট ঘাটতি কম দেখানোর অভিযোগ তাঁর সর্বনাশের কারণ হয়ে দাঁড়ায়। পেট্রোব্রাস কেলেঙ্কারির সঙ্গে অবশ্য হুসেফের কোনো সংস্পর্শ পাওয়া যায়নি। তবে তাঁর জোট সরকারের শরিক অনেক নেতা এবং ব্রাজিলের ব্যবসায়ী নেতাদের অনেকেই জড়িত আছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়। তদন্তের পর শরিক দলের অনেক নেতা ও কংগ্রেস সদস্য গ্রেপ্তার হওয়ার পর একসময় প্রেসিডেন্ট হুসেফের বিরুদ্ধে বাজেট ঘাটতি কমিয়ে দেখানোর অভিযোগ ওঠে। বলা হয়, ২০১৮-এর নির্বাচনে সুবিধা পেতেই এমনটি করেছেন তিনি। এ অভিযোগেই অভিশংসনের কবলে পড়েন তিনি।

নতুন প্রেসিডেন্ট তেমার জানিয়েছেন, তিনি তাঁর অর্থনৈতিক সংস্কার কর্মসূচি সফল করতে চান। এর মধ্যে বেসরকারীকরণ, জনকল্যাণমূলক পেনসন ও জনকল্যাণ আইন এবং সরকারি ব্যয়ের উচ্চমাত্রা কমিয়ে আনা অন্যতম। তিনি আশা করছেন, আইনপ্রণেতারা তাঁর এসব কর্মসূচিকে সমর্থন করবেন।

তবে সংস্কার কর্মসূচি বাস্তবায়ন করতে গিয়ে তেমেরকে সদ্য বিরোধী দলে পরিণত হওয়া ওয়ার্কার্স পার্টির তীব্র বাধার সম্মুখীন হতে হবে বলে মনে করছেন বিশ্লেষকরা। আগামী দিনগুলোতে সরকারের বিরোধিতায় পার্লামেন্ট ও রাজপথ উভয় স্থানেই ওয়ার্কার্স পার্টি তাদের শক্তি প্রদর্শন করবে বলে ধারণা করা হচ্ছে।

বুধবার তেমের যখন শপথগ্রহণ করেন, সমর্থকরা হাততালি দিয়ে তাঁকে স্বাগত জানায়। পরবর্তী নির্বাচন অনুষ্ঠিত না হওয়া পর্যন্ত অর্থাৎ ২০১৮ সালের শেষ নাগাদ ব্রাজিলের প্রেসিডেন্ট হিসেবে তিনি দায়িত্ব পালন করবেন বলে আশা করা হচ্ছে।

শপথগ্রহণের পর মন্ত্রিসভার এক বৈঠকে ব্রাজিল সরকারের জন্য নতুন যুগের সূচনা করার অঙ্গীকার করেন নতুন প্রেসিডেন্ট। তিনি বলেন, ‘বর্তমান প্রেসিডেনশিয়াল শাসনের অংশ হিসেবে আজ আমরা দুই বছর চার মাস সময়ের জন্য নতুন একটি যুগের সূচনা করলাম। ’

এর আগে পাঁচ দিনের বিচারপ্রক্রিয়া চলার পর বুধবার ব্রাজিলের সিনেটের ৮১ জন সদস্যের মধ্যে হুসেফ চূড়ান্তভাবে অভিশংসনের পক্ষে ভোট দেন ৬১ জন। হুসেফের ক্ষমতায় থাকার পক্ষে ভোট দেন মাত্র ২০ জন সিনেট সদস্য।

বিরোধী পক্ষ হুসেফের বিরুদ্ধে অভিযোগ আনে, তিনি ক্ষমতায় থাকাকালে ক্রমবর্ধমান ঘাটতি লুকাতে বাজেটে অবৈধভাবে হস্তক্ষেপ করেছেন। এ অভিযোগে গত মে মাসে ব্রাজিলের পার্লামেন্টে ভোটাভুটির মাধ্যমে তাঁকে অভিশংসনের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয় এবং তাঁকে সাময়িকভাবে প্রেসিডেন্ট পদ থেকে বরখাস্ত করা হয়। এই ছয় মাস সিনেটে অভিশংসন শুনানি চলে। এ সময় হুসেফ প্রেসিডেন্টের পদ থেকে বরখাস্ত ছিলেন। সে সময় ভাইস প্রেসিডেন্ট মাইকেল তেমার অন্তর্বর্তীকালীন প্রেসিডেন্ট হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন। তবে হুসেফ বরাবরই তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ অস্বীকার করেছেন। সিনেট শুনানিতে অভিযোগ অস্বীকার করে তিনি বলেছিলেন, তাঁকে ক্ষমতাচ্যুত করার কোনো ন্যায্যতা নেই। হুসেফ দাবি করেন, তিনি আইন ভঙ্গ করেননি। এমন কোনো কাজ করেননি যার জন্য তাঁকে অভিশংসন করা যেতে পারে। তিনি বলেন, ‘আমার সরকার ভুল করেছে কিন্তু কখনো ভোটারদের সঙ্গে প্রতারণা করেনি। যে অপরাধ আমি করিনি, সে অভিযোগ অযৌক্তিক ও অন্যায়ভাবে আমার বিরুদ্ধে আনা হয়েছে। ’

বিক্ষোভ : বুধবার দিউমা হুসেফকে অভিসংশনের পর তাঁর সমর্থকরা রাজপথে নেমে আসে। তারা রাজধানী ব্রাসিলিয়ায় ন্যাশনাল কংগ্রেস ভবনের সামনে জড়ো হয়ে বিক্ষোভ প্রদর্শন করে। এ সময় বিক্ষোভকারীদের একজন ৬১ বছর বয়স্ক প্রবীণ কৃষক অরলেন্দো রিবেইরো বলেন, ‘আমরা অভ্যুত্থানের বিরুদ্ধে প্রতিবাদ এবং গণতন্ত্রের জন্য যুদ্ধ করছি। ’ এ ছাড়া ব্রাজিলের সাও পাওলো শহরেও বিক্ষোভ করে হুসেফের সমর্থকরা। সাও পাওলোতে বিক্ষোভকারীদের ছত্রভঙ্গ করতে টিয়ার গ্যাস নিক্ষেপ করে। তবে রিও ডি জেনেরিওতে পতাকা উড়িয়ে শান্তিপূর্ণ বিক্ষোভে অংশ নেয় সমর্থকরা। এ সময় তারা ‘তেমার, চলে যাওয়া’ বলে স্লোগান দেয়। সূত্র : এএফপি, আল-জাজিরা।


মন্তব্য