kalerkantho

রবিবার । ১৯ ফেব্রুয়ারি ২০১৭ । ৭ ফাল্গুন ১৪২৩। ২১ জমাদিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাউজানের আদর্শ শিক্ষক বনমালী দাশ

৩২ বছরে ছুটি মাত্র ১২ দিন!

শেষ ১৪ বছর টানা স্কুলে যাচ্ছেন তিনি

জাহেদুল আলম, রাউজান (চট্টগ্রাম)   

১ সেপ্টেম্বর, ২০১৬ ০০:০০



তাঁর বয়স ৫৯ বছর। ৩২ বছরের শিক্ষকতা জীবনের শেষ ১৪ বছরে তিনি কোনো নৈমিত্তিক ছুটি কাটাননি। প্রথম ১৮ বছরে নৈমিত্তিক ছুটি কাটিয়েছেন একেবারেই কম, মাত্র ১২ দিন! সামনের ডিসেম্বরে শিক্ষকতা থেকে অবসরে যাবেন। বাকি কয়েক মাসেও নৈমিত্তিক ছুটি কাটাতে চান না তিনি।

এমন এক শিক্ষকের খোঁজ মিলেছে চট্টগ্রামের রাউজানের পাঁচখাইন দরগাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। তাঁর নাম বনমালী দাশ। তিনি বিদ্যালয়টির সহকারী প্রধান শিক্ষক। ১৪ বছর ধরে নিজের প্রাপ্য ছুটি না নিয়ে বিদ্যালয়ে গিয়ে পাঠদান করছেন। এমনকি ছোট ভাইয়ের মৃত্যুর দিনও তিনি ক্লাস নিয়েছেন। এমন দৃষ্টান্ত দেশে আর আছে কি না, জানা নেই খোদ উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা ও তাঁর সহকর্মীদের।

শিশুশিক্ষা বিস্তারেও বনমালী দাশের চেষ্টা, আগ্রহ অতুলনীয়। ছাত্রছাত্রীদের বিদ্যালয়ে আসা-যাওয়ার তদারকি, বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিভাবকদের সচেতনতা সৃষ্টিসহ শিক্ষামূলক নানা কাজে তিনি রেখে চলেছেন ভূমিকা। শিক্ষা বিস্তারে প্রবল আগ্রহের কারণে তিনি তাঁর সহকর্মীসহ সাধারণ মানুষের কাছে সত্যিকারের মানুষ গড়ার কারিগর হিসেবে পরিচিতি পেয়েছেন। শিক্ষায় তাঁর এমন ত্যাগ দেখে মুগ্ধ অভিভাবক ও স্থানীয় জনসাধারণ। নিজের কর্মের প্রতি নিরলস বনমালী দাশ বিদ্যালয়ের অন্য শিক্ষক ও স্থানীয়দের মধ্যে এক আদর্শ। কিন্তু তিনি পাননি সরকারি কোনো স্বীকৃতি বা সম্মাননা।

উপজেলা শিক্ষা কর্মকর্তা চৌধুরী আবদুল্লাহ আল মামুন বলেন, ‘একজন শিক্ষক চাইলে বছরে ২০ দিন নৈমিত্তিক ছুটি কাটাতে পারেন। সহকারী প্রধান শিক্ষক বনমালী দাশ তাঁর চাকরির ৩২ বছরে ৬৪০ দিন ছুটি কাটাতে পারতেন। কিন্ত তিনি ছুটি নিয়েছেন মাত্র ১২ দিন। তাও চাকরির প্রথম ১৮ বছরে। শেষের ১৪ বছর তিনি কোনো নৈমিত্তিক ছুটি নেননি। তাঁর মতো নিঃস্বার্থ, নিবেদিতপ্রাণ শিক্ষক আর একজনও দেশে আছেন কি না, আমার জানা নেই। তিনি শিক্ষকসমাজের অহংকার। ’

বনমালী দাশের এমন দায়িত্বশীলতার জন্য কোনো স্বীকৃতি না পাওয়া প্রসঙ্গে জানতে চাইলে শিক্ষা কর্মকর্তা বলেন, ‘আমাদের নানা সীমাবদ্ধতা রয়েছে। তার পরও তাঁকে আমরা একটি অনুষ্ঠানে শিক্ষার্থীদের দাঁড় করিয়ে স্যালুট প্রদান করেছি। তাঁর ন্যায়নিষ্ঠতা এবং অভিজ্ঞতার বিষয়টি তুলে ধরার জন্য বক্তব্য প্রদানের সুযোগ করে দেওয়া হয়। তাঁকে রাষ্ট্রীয়ভাবে সম্মাননা জানানো প্রয়োজন বলে মনে করি। ’

পাঁচখাইন দরগাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক দিপস কুমার বড়ুয়া বলেন, ‘টানা ১৪ বছর ছুটি না কাটানোর ঘটনা এ দেশে বিরল। তিনি তাঁর ভাই দোলন দাশ মারা যাওয়ার পর দাহ করেই স্কুলে ক্লাস নিতে চলে আসেন। দেশের সাড়ে চার লাখ শিক্ষকের মধ্যে এমন আদর্শ শিক্ষক আর আছেন কি না সন্দেহ। শিক্ষক হিসেবেও তিনি খুব ভালো। সকাল ৯টায় স্কুলে আসেন, ফেরেন বিকেলে ছুটির সময়। শিক্ষায় নিজের জীবনকে বিলিয়ে দিতে বিয়েও করেননি। ’

সাদাসিধা জীবনযাপনকারী বনমালী দাশ বলেন, ‘নিজের দায়িত্ব ও শিক্ষাকে সবচেয়ে বেশি গুরুত্ব দিয়ে থাকি আমি। এ কারণেই আমি ছুটি নেয়নি। ’ তিনি বলেন, ‘শিক্ষকতা জীবনের ২০০০ সালে পাঁচখাইন দরগাহ সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে যোগদান করি। তখন বিদ্যালয়টি ‘সি’ গ্রেডে ছিল। শিক্ষার মান ও পরিবেশ সৃষ্টি হয়েছে ধাপে ধাপে। বিদ্যালয়ে এখন শিশুপার্ক, তোরণসহ অনেক উন্নয়ন হয়েছে। এ কারণে ধীরে ধীরে ‘সি’ গ্রেড থেকে ‘বি’ এবং বর্তমানে ‘এ’ গ্রেডে উন্নীত হয়েছে বিদ্যালয়টি। বিদ্যালয়ের পাশের হারও এখন শতভাগ। ’

শিক্ষক ওয়াশিংটন দেবনাথ বলেন, ‘বনমালী দাশ নীতিপরায়ণ মানুষ। যেকোনো অনুষ্ঠানে কিংবা স্থানে তিনি অন্যায়ের প্রতিবাদ করেন। ’

এলাকার লোকজনের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, শিক্ষার উন্নয়ন ও শিশুশিক্ষার প্রসারেও কাজ করেন বনমালী দাশ। তিনি বাড়ি বাড়ি গিয়ে শিশুদের বিদ্যালয়ে পাঠানো এবং বিদ্যালয়ে যাওয়া-আসার বিষয়ে তদারকি করেন।

ছিপছিপে বনমালী দাশ ১৯৮৫ সালে সহকারী শিক্ষক হিসেবে শিক্ষকতা জীবন শুরু করেন। তিনি উপজেলার বাগোয়ান ইউনিয়নের গশ্চি গ্রামের ব্রাহ্মণ দাশপাড়ার হীরা লাল দাশ (মৃত) ও রানী বালা দাশের (মৃত) ছেলে। তাঁর ছয় ভাইয়ের মধ্যে বড় দুই ভাই গৌরাঙ্গ প্রসাদ দাশ ও রামকৃষ্ণ দাশ মুক্তিযুদ্ধকালে মুক্তিযোদ্ধা হিসেবে শহীদ হন। পরে তাঁর অন্য ভাইদের মৃত্যু হয়।


মন্তব্য