kalerkantho

শুক্রবার । ২০ জানুয়ারি ২০১৭ । ৭ মাঘ ১৪২৩। ২১ রবিউস সানি ১৪৩৮।


পুলিশ ফাঁড়ি টোল আদায়কেন্দ্র!

রফিকুল ইসলাম   

৩ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



পুলিশ ফাঁড়ি টোল আদায়কেন্দ্র!

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়িতে নতুন স্থাপনা নির্মাণ না করার দাবি এবং শতবর্ষী গাছ কাটার প্রতিবাদে ফাঁড়ির সামনে গতকাল মানববন্ধন করে শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা। ছবি : কালের কণ্ঠ

বুধবার রাত ২টা। নীলক্ষেত মোড় থেকে তিনটি মালভর্তি ভ্যান পলাশীর দিকে যাচ্ছে। মোড়েই দায়িত্বরত তিনজন পুলিশ সদস্য ভ্যানগুলোকে থামালেন। দুই-চার কথা পর টাকা নিয়ে ছেড়ে দিলেন। কেন টাকা নিলেন জানতে চাইলে পুলিশের তিন সদস্য কোনো জবাব না দিয়েই হাঁটা দিলেন নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়িতে।

২৮ মার্চ রাত আড়াইটা, টিএসসি মোড়। চারদিকে আলো-আঁধারি পরিবেশ। মানুষের আনাগোনা নেই বললেই চলে। দুই-একটা রিকশা কিংবা অ্যাম্বুল্যান্স ছুটে চলছে। মিলন চত্বরসংলগ্ন রাস্তার ধারে বড় বড় দুটি ট্রাক দাঁড়িয়ে। চালকের দাবি, কাগজপত্র ঠিক থাকলেও চাঁদার দাবিতে ট্রাকগুলো আটকে রেখেছে পুলিশ। শুরুতে রাজি না হলেও পরে টাকা দিয়েই ছাড়িয়ে নিতে হয়েছে ট্রাক।

এভাবেই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের নীলক্ষেত ও বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা নিয়মিত হয়রানির মাধ্যমে টাকা আদায় করছেন। দুই ফাঁড়ি এখন অনেকটাই নিয়মিত টোল আদায়কেন্দ্রে রূপান্তরিত হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট অফিস সূত্রে জানা গেছে, ১৯৪৮ সালের দিকে বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের সুবিধার্থে নীলক্ষেত মোড়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ি স্থাপন করা হয়। তবে বাবুপুরা ফাঁড়ি কখন স্থাপন করা হয়েছিল এমন সঠিক তথ্য নেই। ১৯৬১ সালে আজম খান কমিশনের জমি বুঝিয়ে দেওয়ার সময় বাবুপুরাকে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি হিসেবে বুঝিয়ে দেওয়া হয়।

বিশ্ববিদ্যালয়ের এস্টেট ম্যানেজার সুপ্রিয়া দাস বলেন, ‘দুই পুলিশ ফাঁড়িই ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের জমিতে। ১৯৬১ সালের আজম খান কমিশনের সীমানাপ্রাচীরে বিশ্ববিদ্যালয়ের জমি হিসেবেই দেখানো হয়েছে। বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীদের নিরাপত্তায় পুলিশকে বসতে দেওয়া হয়েছিল। ’

সম্প্রতি বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়িকে নিজেদের জয়গা দাবি করে বহুতল ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা করছে পুলিশ। এরই মধ্যে বিশ্ববিদ্যালয়ে শতবর্ষী গাছসহ ১০-১২টি গাছ কেটে ফেলা হয়েছে। এ নিয়ে গতকাল শনিবার বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক-শিক্ষার্থীরা মানববন্ধন করেছে। ভবন নির্মাণ বন্ধ করে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়গা ফেরত চেয়ে আজ রবিবার ঢাকা মেট্রোপলিটন পুলিশকে চিঠি দেবে প্রশাসন।

অনুসন্ধানে জানা যায়, নীলক্ষেত ফাঁড়ির পুলিশ সদস্যরা নীলক্ষেত মোড়, টিএসসি ও পলাশী মোড়ে সিএনজি, ভ্যান ও ট্রাক থেকে টোল আদায় করেন। শাহবাগ থানার কয়েকজন এসআইও রাতের বেলা চাঁদা আদায়ের সঙ্গে জড়িত। কার্জন হল এলকায় পুলিশের টহলে থাকা শাহবাগ থানার পুলিশ সদস্যরা রাস্তার ওপর ফুলের দোকান থেকেও নিয়মিত টাকা আদায় করেন। বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির সদস্যরা আনন্দ বাজার মোড়, বঙ্গবাজার ও চানখাঁর মোড় এলাকায় নিয়মিতই টাকা আদায়ের অভিযোগ রয়েছে। রাতের বেলায় এসব এলাকায় সরেজমিনে পরিদর্শন ও স্থানীয় দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে এমন তথ্যই জানা গেছে।

শাহবাগ থানা পুলিশের এক এসআই জানান, রাতের বেলা গাড়িভেদে ৩০০ থেকে এক হাজার পর্যন্ত টাকা আদায় হয়। আর এই টাকা রাতে ডিউটিতে থাকা পুলিশ সদস্যরা ভাগাভাগি করে নেন।

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অমর একুশে হল ও আনন্দ বাজার এলাকার দোকানদারদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, কখনো মাসিক কিংবা সাপ্তাহিক হিসাবে পুলিশকে টাকা দিতে হয়। ফুটপাতের ওপর বসানো দোকানদের টাকা না দিলে উঠিয়ে দেওয়া হয়। কোনো কোনো দোকান থেকে ২০০ থেকে ৫০০ টাকা আদায় করা হয়। এ বিষয়ে নীলক্ষেত পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই ওয়াহিদুজ্জামান বলেন, ‘এ ধরনের কোনো ঘটনা আমার মনে পড়ছে না। ’

শাহবাগ থানার ওসি আবু বকর সিদ্দিক বলেন, ‘রাতের বেলা ট্রাক থেকে চাঁদা আদায়ের বিষয়টি জানা নেই। ’ প্রতিবেদকের কাছ থেকে তথ্য নিয়ে তিনি বলেন, ‘আমি খোঁজ নিয়ে দেখছি। ’

বাবুপুরা পুলিশ ফাঁড়ির ইনচার্জ এসআই মাহবুব বলেন, ‘রাত ১০টা পর্যন্ত ডিউটি করে আমি বাসায় চলে যাই। কেউ টাকা বা চাঁদা নেয় বলে আমার জানা নেই। ’

প্রয়োজনীয়তা নেই পুলিশ ফাঁড়ির : ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের চারপাশেই রয়েছে থানা; শাহবাগ, নিউ মার্কেট, বংশাল ও চকবাজার মডেল থানা। যদিও এই থানাগুলোর প্রতিষ্ঠা বিশ্ববিদ্যালয়ের মধ্যে থাকা পুলিশ ফাঁড়ির পরে। কাছাকাছি দুই থানার অবস্থানের কারণে পুলিশ ফাঁড়িকে এখন অপ্রয়োজনীয় মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা।

বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক সমিতির সভাপতি ফরিদ উদ্দিন আহমেদ বলেন, ‘দীর্ঘদিন আগে নিরাপত্তার স্বার্থে পুলিশ ফাঁড়ি নির্মাণ করা হলেও এখন কোনো প্রয়োজন নেই। কারণ বিশ্ববিদ্যালয়ের পাশেই দুটি থানা রয়েছে। কাজেই ফাঁড়ি উঠিয়ে নিয়ে বিশ্ববিদ্যালয়ের জয়গা ফিরিয়ে দেওয়া হোক। ’


মন্তব্য