kalerkantho


২৬ মার্চই বরিশালে চালু হয় স্বাধীন দেশের সচিবালয়

তৌফিক মারুফ   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



১৯৭১ সালের ২৬ মার্চ বরিশালে চালু করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সচিবালয়। এক মাস কার্যকর ছিল সেটি। সেখান থেকেই দক্ষিণাঞ্চলের প্রশাসনিক কার্যক্রম পরিচালিত হতো। যুদ্ধও পরিচালিত হয়েছে সেখান থেকে। মুক্তিযোদ্ধাদের জন্য সামরিক সরঞ্জাম, খাদ্য-অর্থ সংগ্রহ ও সরবরাহ করা হতো ওই কার্যালয়ের মাধ্যমে।

বরিশালের মুক্তিযুদ্ধ নিয়ে বিভিন্ন লেখায়, বইয়ে বিষয়টির উল্লেখ রয়েছে। এবার বরিশাল অঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের মূল সংগঠক ও তত্কালীন এমএনএ নুরুল ইসলাম মনজুরের আত্মজীবনীমূলক বইয়ে এ তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। চলতি মাসের শুরুর দিকে প্রকাশিত বইটিতে উল্লেখ করা হয়েছে স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সচিবালয়ের কথা। এটি স্থাপন করা হয়েছিল বর্তমানের বরিশাল সদর গার্লস স্কুলে। সেখানে পরে স্থাপন করা হয় স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম সচিবালয়ের একটি স্মারক।

এমএনএ ও বরিশাল জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ছিলেন নুরুল ইসলাম মনজুর। বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রীও ছিলেন। পরে আওয়ামী লীগ ছেড়ে বিএনপিতে যুক্ত হন। এখন রাজনীতি করেন না। তাঁর সদ্য প্রকাশিত ‘বাংলাদেশের স্বাধীনতাযুদ্ধে দক্ষিণাঞ্চল’ বইয়ে তিনি উল্লেখ করেছেন, জাতির জনক বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর ৭ই মার্চের বক্তব্যের শেষ দিকে যা বলেছেন, এর নিরপেক্ষ বিচার-বিশ্লেষণ করলে এটা স্পষ্ট করেই বোঝা যাবে, ওই দিনই (৭ মার্চ) তিনি স্বাধীনতার ঘোষণা দিয়েছেন।

নুরুল ইসলাম মনজুর জানান, ৭ মার্চের পরই শুরু হয়ে যায় প্রস্তুতি। বরিশালে স্থায়ী মঞ্চ করে প্রতিদিন চলতে থাকে প্রতিবাদী সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান ও গণসংগীত। একদিন উজিরপুর থেকে এসে এক লোক জানান, তাঁর নাম এম এ জলিল। তিনি পাকিস্তানি সেনাবাহিনীতে মেজর ছিলেন। পূর্ব পাকিস্তানের ওপর পশ্চিম পাকিস্তান বড় ধরনের হামলার প্রস্তুতি নিচ্ছে জানতে পেরে তিনি চাকরি ছেড়ে পালিয়ে বাড়ি চলে এসেছেন। প্রয়োজনে তাঁকে কোনো কাজে লাগাতে চাইলে তিনি প্রস্তুত আছেন। আলাপ-আলোচনার পর তাঁকে নাম-ঠিকানা রেখে বাড়ি চলে যেতে বলা হয়। প্রয়োজন হলে তাঁকে ডাকা হবে বলে জানানো হয়।

মনজুর তাঁর বইয়ে বলেছেন, ‘২৩ মার্চ আমি বরিশাল থেকে লঞ্চযোগে ঢাকা রওয়ানা দিয়ে এসে ২৪ মার্চ বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে গিয়ে তাঁর সাথে দেখা করে মেজর জলিলের দেওয়া পাকিস্তানি সেনাবাহিনীর প্রস্তুতিমূলক কিছু তথ্য তাঁকে জানিয়ে ওই দিনই আবার বরিশালের উদ্দেশে রওয়ানা দিয়ে ২৫ মার্চ বরিশালে পৌঁছাই। বঙ্গবন্ধুর বাড়িতে ওই সময় কর্নেল ওসমানী ও ফ্লাইট সার্জেন্ট ফজলুল হকের সাথে দেখা হয়। বরিশালে ফিরে আওয়ামী লীগের স্থানীয় নেতাকর্মীদের প্রস্তুতি নিয়ে দিনভর নানা কাজ করছিলাম। পঁচিশে মার্চ রাত সাড়ে ১১টার দিকে ঢাকায় গণহত্যার খবর পেয়ে যাই টেলিফোনে। আগে থেকেই বাড়ির সামনে পুকুরপাড়ে চলছিল গণসংগীতের অনুষ্ঠান। উপস্থিত ছিলেন বরিশালের তরুণ সাংস্কৃতিক কর্মী ও ছাত্রলীগ-যুবলীগের কর্মীরা। ঢাকার খবর পাওয়ার পরপরই বরিশালের আওয়ামী লীগের নেতা, এমপিএ, এমএনএ—সবাইকে খবর দিয়ে আনা হয় আমার বাড়িতে। জরুরি বৈঠক হয়। ভোররাতে বরিশালের একদল সাহসী মুক্তিকামী তরুণকে নিয়ে ছুটে যাই বরিশাল পুলিশ লাইনে। সেখানকার অস্ত্রাগার থেকে সব অস্ত্র বের করে নিয়ে আমি শহরের বগুড়া রোডের পেস্কার বাড়ি এলাকার আমার বাড়িতে যাই। ওই বাড়িতেই গড়ে তুলি মুক্তিযোদ্ধাদের অস্ত্রাগার। পেস্কার বাড়ির পুকুরে অজু করে আসতে বলি মুক্তিযোদ্ধাদের। তাদের শপথ করাই। এরপর ২৬ মার্চ সকালেই মুক্তিযোদ্ধাদের মাঝে অস্ত্র বিতরণ করি। মেজর জলিলের কাছে খবর পাঠাই দ্রুত বরিশাল শহরে এসে মুক্তিযোদ্ধাদের প্রশিক্ষণ শুরু করতে। একই দিন বাড়ির সামনে সদর গার্লস স্কুলে প্রতিষ্ঠা করা হয় স্বাধীন বাংলার প্রথম সচিবালয়। গঠন করা হয় একটি পরিচালনা পরিষদ। ২৬ এপ্রিল পর্যন্ত ওই পরিষদের মাধ্যমেই দক্ষিণাঞ্চলের সব কিছু পরিচালিত হয়। ১৭ এপ্রিল পাক হানাদার বাহিনী প্রথম বরিশালে আক্রমণ করে এবং ২৬ এপ্রিল বরিশাল শহরের দখল নেয়। ফলে সদর গার্লস স্কুলে স্থাপিত স্বাধীন বাংলাদেশের প্রথম ওই সদর দপ্তরের আনুষ্ঠানিক কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যায়। তবে পরবর্তীতে পরিচালনা পরিষদের তত্ত্বাবধানে আশপাশের বিভিন্ন এলাকায় কেন্দ্র স্থাপন করে পরিচালিত হয় মুক্তিযুদ্ধ এবং দখলমুক্ত হয় ৯ নম্বর সেক্টর। ’

বরিশালসহ দক্ষিণাঞ্চলের মুক্তিযুদ্ধের প্রধান সংগঠক সাবেক এমএনএ ও বঙ্গবন্ধু সরকারের মন্ত্রী মোহাম্মদ নুরুল ইসলাম মনজুর ৪৪ বছর পর নিজের বইয়ে জানান এমন সব তথ্য। স্বাধীন বাংলার প্রথম সচিবালয়ের বেসামরিক প্রধান মনোনীত হন তিনি। সামরিক বিভাগের প্রধান করা হয় মেজর এম এ জলিলকে।


মন্তব্য