kalerkantho


সাইফুরসের প্রলোভনে পাদিয়ে বিপাকে শিক্ষার্থীরা

► চটকদার বিজ্ঞাপনই ভরসা ইজারার মাধ্যমে চলছে ঢাকার বাইরের শাখা ► কঠোর ব্যবস্থা নিচ্ছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়

শরীফুল আলম সুমন   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সাইফুরস কোচিং সেন্টারের নানা প্রলোভনে পা দিয়ে অসহায় হয়ে পড়েছে শিক্ষার্থীরা। তাদের অভিযোগ, বাহারি বিজ্ঞাপন দেখে সাইফুরসে ভর্তি হয়ে শুধু টাকাই নষ্ট হচ্ছে। মাত্র তিন মাসে ‘ইংরেজির জাহাজ’ বানানোর কথা বললেও বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ফলাফল শূন্য। অন্য কোচিং সেন্টারগুলোর সঙ্গে টেক্কা দিতে গিয়ে বরাবরই চটকদার বিজ্ঞাপনের আশ্রয় নেয় সাইফুরস। তবে এত দিন পার পেয়ে গেলেও এবার বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনাকে কেন্দ্র করে একটি বিজ্ঞাপন দিয়ে ফেঁসে যাচ্ছে কোচিং সেন্টারটি। তাদের বিরুদ্ধে মামলাসহ কঠোর ব্যবস্থা নেওয়ার নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী নুরুল ইসলাম নাহিদ। এরই মধ্যে গত সোমবার রমনা থানায় এ বিষয়ে সাধারণ ডায়েরি (জিডি) করেছে মন্ত্রণালয়।

রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় সাইফুরসের সাম্প্রতিক বিজ্ঞাপনে বলা হয়েছে, ‘ইংলিশ এর ভুলে বাংলাদেশ ব্যাংকের ১৬০ কোটি টাকা হ্যাকারদের হাতছাড়া। ’ একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপনটি প্রকাশ করে তারা। এ বিষয়ে শিক্ষাসচিব মো. সোহরাব হোসাইনকে সাইফুরসের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে গত সোমবার পাঁচ দফা নির্দেশনা দিয়েছেন শিক্ষামন্ত্রী। নির্দেশনার শুরুতে তিনি লিখেছেন, বিষয়টি মারাত্মক, সিরিয়াসলি ব্যবস্থা নেওয়া প্রয়োজন। এ বিষয়ে আনুষ্ঠানিকভাবে নথিতে সিদ্ধান্ত নিয়ে অগ্রসর হওয়া প্রয়োজন।

শিক্ষামন্ত্রীর নির্দেশনার মধ্যে রয়েছে থানায় জিডি করা, মামলা করা, দুদকে চিঠি দিয়ে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নিতে অনুরোধ করা, অন্যান্য গোয়েন্দা সংস্থাকে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার জন্য বলা। এ ছাড়া গত ২৩ মার্চের আইনশৃঙ্খলা সভায় ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তাদের বিষয়টি বলা হয়েছে। নির্দেশনায় বিষয়টি ফের তাঁদের স্মরণ করিয়ে দিতে বলা হয়েছে। মন্ত্রীর নির্দেশনার পর ওই দিনই রমনা থানায় জিডি করে শিক্ষা মন্ত্রণালয়। গত মঙ্গলবার এ বিষয়ে মন্ত্রণালয়ের আইন কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলেছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। বাকি ব্যবস্থা আগামী সপ্তাহের মধ্যে নেওয়া হবে বলে মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে।

মঙ্গলবার রাজধানীর সোনারগাঁও হোটেলে এক অনুষ্ঠানে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, গবেষক, হ্যাকার—সব এক মাপে নিয়ে এসেছে সাইফুরস কোচিং। তারা বলছে, আমার কাছে আসো, হ্যাকিং ভালো করে শিখে যাও! তিনি (সাইফুরস প্রধান) নাকি শিক্ষক ছিলেন। অথচ নিজে ব্যবসা করার জন্য ছেলেমেয়েদের প্রলোভন দেখাচ্ছেন। ’

প্রতিষ্ঠানটির প্রধানকে ‘চোরের রাজা’ আখ্যা দিয়ে শিক্ষামন্ত্রী বলেন, ‘আর এই চোরের রাজা, যিনি চোরামি শেখাতে চান, তাঁর বিরুদ্ধে কী হবে, এ দেশের আইন কী বলে? আমরা শেষ পর্যন্ত দেখে ছাড়ব। কোচিং ব্যবসা হাইকোর্টের রায়ে বেআইনি। আর এই বেআইনি কাজ করেই সাইফুরস রমরমা ব্যবসা করছে।

এর আগেও নানা চটকদার বিজ্ঞাপন দিয়েছে সাইফুরস কর্তৃপক্ষ। এর মধ্যে রয়েছে, ‘বোবার মুখেও খৈ ফুটিয়ে তুলবো, তাও আবার বিশুদ্ধ ইংলিশে, এই হলো ন্যাচারাল স্পোকেন’, ‘চাকুরির ভাইভাতে কাশি দিলেও তা ইংরেজিতে দিতে হয়’, ‘চৈতী তুমি কার’। এমনকি অভিভাবকদের টানতেও একটি বিজ্ঞাপনে একজন প্রধান শিক্ষকের উদ্ধৃতি দিয়ে বলা হয়েছে, ‘সাইফুরসে কোর্স করায় অস্ট্রেলিয়া প্রবাসী পাত্রের সঙ্গে আমার মেয়ের বিয়ে হয়েছে। ’

জানা যায়, সাইফুরসে বর্তমানে ইংলিশ স্পোকেন, রাইটিং, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি কোচিং, বিবিএ, এমবিএ ভর্তি কোচিং, ব্যাংক জব, বিসিএস কোচিংসহ নানা ধরনের কোচিং করানো হয়। শাখাভেদে ফির পরিমাণ ভিন্ন।

মিরপুর শাখায় ভর্তি হওয়া একজন শিক্ষার্থী নাম প্রকাশ না করে বলে, ‘বিজ্ঞাপন দেখে জানলাম একটি কোর্স করলে ইংরেজি শিখতে পারব। ভর্তি ফি ছয় হাজার টাকা। ভর্তিও হলাম। এখন দেখি স্পোকেন ও রাইটিংয়ের জন্য পৃথক কোর্স। মানে দিতে হবে দ্বিগুণ টাকা। এটা তো প্রতারণা। ’

‘ঠাসঠাস ইংরেজি বলতে আপনাকে করতে হবে সাইফুরসের জেনন মাস্টার প্রোগ্রাম’—এ রকম বিজ্ঞাপন দেখে সাইফুরসে ভর্তি হয়েছিলেন চাকরিপ্রার্থী আদনান হোসেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, গত অক্টোবরে সাইফুরসের পান্থপথ শাখায় আইইএলটিএস কোর্সে ১২ হাজার টাকা দিয়ে ভর্তি হই। ভর্তির সময় বলা হয়েছিল, এক ক্লাসে ২০ জন শিক্ষার্থী থাকবে। কিন্তু ক্লাস শুরু হওয়ার পর দেখলাম শিক্ষার্থী ৬০ জন। এই কোচিং সেন্টার থেকে আইইএলটিএস করা শিক্ষার্থীরাই আমাদের ইংরেজি শেখাত। লেকচারার তার মতো লেকচার দিয়ে যেত, আমরা কিছুই বুঝতাম না। কোনো প্রশ্ন জিজ্ঞাসা করলে শিক্ষকরা লজ্জা দিতেন, তাই প্রশ্নও করা যেত না। অথচ ভর্তির সময় বলেছিল, হাতে ধরে শেখাবে। তবে কর্তৃপক্ষ বলছে, এভাবেই ক্লাস করতে হবে। তাই দেড় মাসের মতো ক্লাস করেছি। এর পরও আমাকে পুরো টাকাই দিতে হয়েছে। ইংরেজিতে আগের চেয়ে আমার কোনো উন্নতি হয়েছে বলে মনে হচ্ছে না। আসলে টাকাটাই পানিতে গেছে। ’

সাইফুরসের বর্তমান প্রধান সাইফুর রহমান খান। তাঁর বিরুদ্ধেও রয়েছে নানা অভিযোগ। সাইফুরস কর্তৃপক্ষ তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের আইবিএর সাবেক শিক্ষক হিসেবে পরিচয় দিলেও তিনি আসলে খণ্ডকালীন শিক্ষক ছিলেন বলে জানা যায়। ঢাকার বাইরে প্রতিটি জেলায়ই সাইফুরস কোচিংয়ের শাখা থাকলেও তা চলছে ইজারার মাধ্যমে। অভিযোগ রয়েছে, ঢাকার বাইরে সাইফুরসের বিভিন্ন শাখায় শিক্ষকরাই ভালো ইংরেজি জানেন না।

এসব বিষয়ে জানতে চাইলে সাইফুরস কোচিং সেন্টারের প্রধান নির্বাহী কর্মকর্তা আনজাম আনছার বাজু কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আসলে আমরা ইংরেজির গুরুত্ব বোঝাতে এই বিজ্ঞাপন (হ্যাকিং-সংক্রান্ত) দিয়েছি। অন্য কোনো ইনটেনশন আমাদের ছিল না। তবে এ ধরনের বিজ্ঞাপন দেওয়া যে ভুল হয়েছে, সেটা আমরা বুঝতে পেরেছি। এ জন্য আমরা দুঃখ প্রকাশ করছি। আর মন্ত্রণালয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের ব্যাপারে আমরা অফিশিয়ালি এগোচ্ছি। ’


মন্তব্য