kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৪ জানুয়ারি ২০১৭ । ১১ মাঘ ১৪২৩। ২৫ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মাতম আহাজারি

‘ভোটাভুটি করে তারা, আর গুলি খাইয়া মরে কারা?’

কালের কণ্ঠ ডেস্ক   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



‘ভোটাভুটি করে তারা, আর গুলি খাইয়া মরে কারা?’

‘ভোটাভুটি করে তারা, আর গুলি খাইয়া মরে কারা?’

‘আমার সোনামানিক কোনো দিন কারো সাথে ঝগড়া করেনি। কোনো রাজনৈতিক দলের সাথে জড়িতও ছিল না।

ওর বাবা অটোরিকশা চালিয়ে সংসার চালাত। আমাদের স্বপ্ন ছিল লেখাপড়া শেষ করে সুজন অনেক বড় চাকরি করবে; কিন্তু পুলিশ আমাদের সব শেষ করে দিল। ’—এই আহজারি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র সুজন মৃধার মা শান্তা বেগমের। সুজন গত বৃহস্পতিবার মাদারীপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় গুলিতে প্রাণ হারান।

শুধু সুজনের পরিবার নয়, ঢাকার কেরানীগঞ্জের হযরতপুরে ভোটকেন্দ্রে গিয়ে শিশুসন্তান শুভকে হারিয়ে মা সুর্মনা বেগম ক্ষণে ক্ষণে সংজ্ঞাহীন হয়ে পড়ছেন। বাবা হালিম কাজী অবিরত আহাজারি করছেন। সন্তান হারানো বাবা বলছিলেন, ‘ভোটাভুটি করে তারা, আর গুলি খাইয়া মরে কারা? যে সন্ত্রাসীরা আমার পোলাডারে গুলি কইরা মারল, আমি তাগো শাস্তি চাই। শুভ নাই, আমি কারে নিয়া থাকমু। ’

‘হায়রে মজা, ঝুড়িভাজা। যে খায় সেই রাজা। ’—এমন গান গেয়ে স্কুলে স্কুলে শিশুদের মজিয়ে রাখতেন যশোরের বিষু আলী কারিগর। পায়ে ঘুঙুর বেঁধে, কোমর বাঁকানো তাঁর নাচ শিশুরা খুব পছন্দ করত। এমনিভাবে ৫৫ বছর ধরে ঝুড়িভাজা বিক্রি করে জীবিকা চালাতেন বিষু আলী (৭৫)। গত বৃহস্পতিবার সকালে তিনি ঝুড়িভাজা নিয়ে এসেছিলেন তাঁর প্রিয় চাঁচড়া ভাতুড়িয়া প্রাথমিক বিদ্যালয় মাঠে। কিন্তু নির্বাচনী সহিংসতার বোমা কেড়ে নিল তাঁর প্রাণ। এখন তাঁর পরিবারে চলছে শোকের মাতম। দরিদ্র পরিবারের কথা ভেবে স্ত্রী আছিয়া বেগম দিশাহারা।

গত বৃহস্পতিবার দ্বিতীয় দফা ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে গুলি ও বোমায় অন্তত ৯ জন নিহত হয়। একই সঙ্গে আহত হয়েছেন আরো ৪০০ জন। নিহতদের মধ্যে শিশু শুভর পরিবার ও ফেরিওয়ালা বিষু কারিগর কোনোভাবেই নির্বাচনের কোনো প্রার্থী বা দলের সঙ্গে জড়িত ছিলেন না। তাঁরা নিতান্তই দরিদ্র পরিবারের সদস্য। গতকাল শুক্রবার আমাদের বিশেষ প্রতিনিধি, নিজস্ব প্রতিবেদক ও প্রতিনিধিরা নিহতদের বাড়িতে গিয়ে দেখেছেন শোকের মাতম। বিস্তারিত তাঁদের পাঠানো খবরে—

মাদারীপুর : মাদারীপুরে গুলিতে নিহত ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের মার্কেটিং বিভাগের তৃতীয় বর্ষের ছাত্র সুজন মৃধার (২৩) বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। সুজন মিঠাপুর এলএন উচ্চ বিদ্যালয় এবং নটর ডেম কলেজ থেকে এসএসসি ও এইচএসসিতে জিপিএ ৫ পান। পরে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে মার্কেটিং বিভাগে ভর্তি হন। সুজনের এমন মৃত্যু মেনে নিতে পারছে না তাঁর পরিবার। গতকাল সন্ধ্যা পর্যন্ত এ ঘটনায় কোনো মামলা হয়নি। মাদারীপুরের এএসপি সার্কেল মো. মনিরুজ্জামান ফকির বলেন, ‘সুজন পুলিশের গুলিতেই নিহত হয়েছেন কি না, বিষয়টি আমরা এখনো নিশ্চিত নই। ময়নাতদন্তের প্রতিবেদন পেলে নিশ্চিত হওয়া যাবে। ’

গত বৃহস্পতিবার মাদারীপুরের ধুরাইল ইউনিয়নের ৪ নম্বর ওয়ার্ডের দক্ষিণ বিরঙ্গল মাদ্রাসা কেন্দ্রে ফলাফল ঘোষণা করার সময় দুই মেম্বার প্রার্থী আব্দুল মোতালেব মৃধা ও আয়ুব আলী ফকিরের সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়। এ সময় গুলিতে সুজন নিহত হন।

সুজনের সহপাঠী বিল্পব মজুমদার বলেন, একজন মেধাবী বন্ধুকে হারিয়ে আমরা মর্মাহত। সুজন বেঁচে থাকলে অনেক বড় কিছু হতো। চাচা আলমগীর মৃধা বলেন, ‘নির্বাচনের দিন সন্ধ্যায় আমার চোখের সামনে পুলিশ গুলি ছোড়ে। ’

কেরানীগঞ্জ : বৃহস্পতিবার রাতেই কেরানীগঞ্জে দ্বিতীয় দফায় ইউপি নির্বাচনী সহিংসতার শিকার হয়ে নিহত শিশু শুভ কাজীর লাশের দাফন সম্পন্ন হয়েছে। এ ঘটনায় ওই রাতেই শুভর চাচা সালাল কাজী বাদী হয়ে অজ্ঞাতপরিচয় ব্যক্তিদের আসামি করে কেরানীগঞ্জ মডেল থানায় একটি হত্যা মামলা দায়ের করেছেন। তবে ঘটনার ২৪ ঘণ্টা পার হলেও এখনো কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ। ফলে এ নিয়ে ঢালিকান্দি গ্রামরে বাসিন্দারা ক্ষোভ প্রকাশ করেছে।

বৃহস্পতিবার সকাল ১০টার দিকে ২৫-৩০ জন অস্ত্রধারী কেন্দ্র দখলের উদ্দেশ্যে গুলি চালায়। এ সময় একটি গুলি এসে লাগে মা ও চাচার সঙ্গে ভোটকেন্দ্রে আসা ওই বিদ্যালয়েরই (ভোটকেন্দ্র) চতুর্থ শ্রেণির ছাত্র শুভর বুকে। স্থানীয় সূত্র জানায়, রানা মোল্লা নামের এক সন্ত্রাসীর নেতৃত্বে এ ঘটনা ঘটানো হয়। রানা আওয়ামী লীগের প্রার্থী আনোয়ার হোসেন আয়নালের ক্যাডার।

যশোর : যশোর শহর থেকে আট কিলোমিটার দূরে রামনগর গ্রামের সানোয়ার হোসেনের বাড়িতে ভাড়া থাকতেন বিষু কারিগর। গতকাল দুপুরে তাঁর বাড়িতে গিয়ে দেখা যায় স্ত্রী আছিয়া বেগম (৫৫) মাতম করছেন। তিনি চিত্কার করে বলছেন, ‘আমারেও তুমরা ওর সঙ্গে জবাই কইরে দেও। আমার ছিটেরুটি এখন কিডা খাবে?’ বিষু ছোট ছেলে লিটনকে নিয়ে এ বাড়িতে বসবাস করতেন।

পরিবারের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, নির্বাচন উপলক্ষে কয়েক শ ঝুড়িভাজা তৈরি করেন বিষু কারিগর। বুধবার দুপুরে তিনি ওই ঝুড়িভাজা নিয়ে বাড়ি থেকে বের হন। যাওয়ার আগে স্ত্রীকে বলে যান আমি পাঁচ কেজি ওজনের একটি মুরগি নিয়ে আসব। তুমি ছিটেরুটি বানিয়ে রাখবে। এ জন্য আছিয়া এখন তাঁর ছিটেরুটি কে খাবে এই বলেই মাতম করছেন। পুলিশ সূত্রে জানা যায়, এ ঘটনায় ছেলে ফারুক হোসেন বাদী হয়ে বৃহস্পতিবার রাতেই ২৮ জনের নাম উল্লেখ করে থানায় একটি মামলা করেছেন। তবে কাউকে গ্রেপ্তার করতে পারেনি পুলিশ।

বুধবার রাতে যশোর সদরের লেবুতলা ইউনিয়নের আন্দোলপোতা গ্রামে বোমা বানাতে গিয়ে নিহত হন ইবাদ আলী মোল্লা ও সবুজ। জানা যায়, ইবাদ একজন রাজমিস্ত্রি। জিহাদ নামে পাঁচ বছরের এক ছেলে রয়েছে তাঁর। স্ত্রী রিনা বেগম আট মাসের অন্তঃসত্ত্বা। জিহাদ এখনো ঠিকমতো বুঝতে শেখেনি। সে বলল, ‘আমার আব্বা হাসপাতালে গেছে। ’ রিনা বেগম অচেতন হয়ে পড়েছেন। ইবাদের ভাই জায়েদুল ইসলাম বললেন, ‘আমরা গরিব মানুষ। আমি যতটুক জানি বন্ধুরা ওকে ডেকে নিয়ে গিয়েছিল। বন্ধুরাই ওর সর্বনাশ করল। ’

নাটোর : নাটোরের লালপুরে নির্বাচনী সহিংসতায় নিহত বিপ্লবের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এ ঘটনায় এখনো মামলা দায়ের করা হয়নি। বৃহস্পতিবার নির্বাচন কেন্দ্রে আসার সময় আওয়ামী লীগের সমর্থকদের হামলায় বিএনপি সমর্থক বিপ্লবসহ তাঁরা তিন ভাই আহত হন। রাতেই রাজশাহী সিডিএম হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় বিপ্লবের মৃত্যু হয়।

মানিকগঞ্জ : মানিকগঞ্জের দৌলতপুরে নির্বাচন-পরবর্তী সহিংসতায় নিহত নমেসা বেগমের বাড়িতে চলছে শোকের মাতম। এ ঘটনায় নিহতের ভাই রহিম বাদী হয়ে একটি মামলা করেছেন। গত বৃহস্পতিবার ফল প্রকাশের পরপর বিজয়ী প্রার্থী মিজানুর রহমান তোতা মিয়া বিজয় মিছিল বের করেন। ওই বিজয় মিছিল থেকে ১০-১২ জন ধারালো অস্ত্র এবং লাঠিসোঁটা নিয়ে নমেসা বেগমের বাড়িতে হামলা চালায়। এতে ঘটনাস্থলেই নিহত হন নমেসা বেগম (৪০)। আহত হন তাঁর স্বামী ইমাম শেখ, ছেলে আমিনুর শেখ, হাবু শেখ, মেয়ে কমলা ও শিল্পী।


মন্তব্য