kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


শহীদ ভাইয়ের স্বীকৃতি পেতে লড়াই

ফখরে আলম, যশোর   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



শহীদ ভাইয়ের স্বীকৃতি পেতে লড়াই

শেখ জাবির

১৯৭১ সালে যশোর কারাগারে পাকিস্তানি হানাদারদের গুলিতে শহীদ হন কারারক্ষী শেখ মনসুর আলী। কিন্তু আজও তিনি শহীদের স্বীকৃতি পাননি। এই স্বীকৃতিটুকু পেতে তাঁর ভাই শেখ জাবির দীর্ঘ ৪৫ বছর ধরে দৌড়ঝাঁপ করছেন। ধরনা দিচ্ছেন কারা কর্তৃপক্ষসহ নানাজনের কাছে। আজ নড়াইল তো কাল খুলনায় গিয়ে শহীদ ভাইয়ের জন্য তথ্য-প্রমাণ সংগ্রহ করছেন তিনি। কিন্তু কারা কর্তৃপক্ষের একই কথা—‘প্রতিবেদন শূন্য। শহীদ করারক্ষীর কোনো তথ্য নেই। ’

একাত্তরের মার্চ মাসের শেষ সপ্তাহে যশোর কেন্দ্রীয় কারাগারে পাকিস্তানি সেনাদের হামলায় দুজন কারারক্ষীসহ তিনজন শহীদ হন। তাঁদেরই একজন মনসুর আলী। বাবার নাম শেখ সুবরাতী। বাড়ি যশোর শহরের বারান্দিপাড়া কাঁঠালতলায়। আরেকজন কারারক্ষীর নাম মুনীর। বাড়ি যশোর উপশহর এলাকায়। অন্যজন ছিলেন জেলা প্রশাসকের কার্যালয়ের গাড়িচালক। তাঁর নাম জানা যায়নি। অথচ ২০১৬ সালে এসেও যশোর কারাগারের ওই হত্যাকাণ্ডের গুরুত্বপূর্ণ হত্যাকাণ্ডটি মাটিচাপা পড়ে আছে।

জাবির বলেন, ‘একাত্তরে আমার বয়স ছিল চার কি পাঁচ বছর। যখন বুঝতে শিখেছি তখন থেকেই দেখেছি মা-বাবা কেবল কান্নাকাটি করেন। তাঁদের কাছ থেকেই জেনেছি, কারাগারে দায়িত্ব পালনের সময় হানাদাররা বড় ভাইকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। কিন্তু লাশের সন্ধান মেলেনি। মা, বাবা ও ভাবি স্বজন হারানোর সেই শোক নিয়ে মারা যান। আমি শহীদ ভাইয়ের একটি সনদের জন্য কারা কর্তৃপক্ষের কাছে দীর্ঘদিন ধরনা দিয়েও পাইনি। ’

এ অবস্থায় শেখ জাবির ও মুক্তিযোদ্ধা সংসদের যশোর সদর ইউনিট কমান্ডার মোহাম্মদ আলী স্বপন গত বছর কয়েক দফা সিনিয়র জেল সুপার ও কারা উপমহাপরিদর্শককে এ ব্যাপারে চিঠি দেন। কারা উপমহাপরিদর্শক টিপু সুলতান ওই বছরের ২ ডিসেম্বর ও সিনিয়র জেল সুপার শাহাজাহান আহমেদ একই বছরের ৮ আগস্ট চিঠি দিয়ে জানান, ‘শহীদ কারারক্ষীদের কোনো তথ্যপ্রমাণ না থাকায় প্রতিবেদন শূন্য বলে গণ্য হলো। ’

এ ব্যাপারে কালের কণ্ঠ’র অনুসন্ধানে জানা যায়, ১৯৭১ সালে কারাগারে কর্মরত ছিলেন কারারক্ষী ছবেদ আলী। বর্তমানে তিনি যশোর সদরের বিরামপুর গ্রামে বসবাস করছেন। ছবেদ আলীর সঙ্গে যোগাযোগ করলে তিনি বলেন, ‘একাত্তরে পাকিস্তান থেকে ফিরে কারাগারে চাকরিতে যোগদান করি। জানতে পারি, মার্চের শেষের দিকে (২৫ মার্চের পর) পাকিস্তানি আর্মি দুজন কারারক্ষীকে গুলি করে মেরে ফেলেছে। এদের একজন মনসুর। ’

মুক্তিযুদ্ধ চলাকালে যশোর জেলখানার সামনে খালেকের দর্জির দোকানে কাজ করতেন রফিকুর রহমান। ৭০ বছরের এই বৃদ্ধ বর্তমানে ঘোপ এলাকায় দর্জির কাজ করছেন। রফিকুর বলেন, ‘সকালে আমি ভৈরব নদের বাঁশের সাঁকো পার হয়ে দর্জির দোকানে যাচ্ছিলাম। তখন গুলির শব্দ শুনে পালিয়ে যাই। পরে জানতে পারি পাকিস্তানি আর্মিরা মনসুরসহ তিনজনকে মেরে ফেলেছে। ’

সাবেক কারারক্ষী আব্দুল আজিজ মোল্লার (৮০) বাড়ি কারাগারের সামনেই। তিনি বলেন, ‘একাত্তর সালের ২৫ কিংবা ২৬ মার্চ সকাল ১০টার দিকে পাকিস্তানি সেনারা জেলখানায় হামলা চালায়। তখন আমার ডিউটি ছিল জেলখানার পেছনে। গুলির শব্দ শুনে আমি পালিয়ে যাই। পরে জানতে পারি কারারক্ষী মনসুর, মুনির আর ডিসি অফিসের একজন ড্রাইভারকে ওরা মেরে ফেলেছে। ’

সে সময় একটি হত্যা মামলায় কারাগারে বন্দি ছিলেন আব্দুস সালাম মোল্লা। তাঁর বাড়ি নড়াইল সদরের সীমাখালী গ্রামে। তিনি বলেন, ‘মার্চ মাসের শেষের দিকে পাঞ্জাবিরা এসে গোলাগুলি শুরু করে। আমি পালিয়ে মহিলা ওয়ার্ডে আশ্রয় নিই। পরে মেইন গেট দিয়ে কারাগার থেকে পালিয়ে যাওয়ার সময় দেখতে পাই গেটের কাছে দুজন কারারক্ষী মরে পড়ে আছে। ’

এ ব্যাপারে যোগাযোগ করা হলে সিনিয়র জেল সুপার শাহাজাহান আহমেদ বলেন, ‘আমরা খোঁজখবর নিচ্ছি। তবে শহীদ কারারক্ষীদের সম্পর্কে এখনো পর্যন্ত আমরা কোনো তথ্যপ্রমাণ পাইনি। সুনির্দিষ্ট তথ্যপ্রমাণ পেলে যথাযথ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’


মন্তব্য