kalerkantho


‘তিন সরকারের’ লিবিয়ায় কমেনি জীবনের শঙ্কা

♦ প্রতিপক্ষের সহযোগী ভেবে চার বাংলাদেশিকে গুলি করে হত্যা ♦ আইএস নয়, মিলিশিয়ারা তুলে নিয়ে গিয়েছিল দুই বাংলাদেশিকে

মেহেদী হাসান   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



লিবিয়ার বেনগাজি থেকে গত রবিবার যে চার বাংলাদেশির নিহত হওয়ার খবর এসেছে তাঁরা সবাই মারা গেছেন মিলিশিয়া গোষ্ঠীর ভুলে। জীবিকার তাগিদে ঝুঁকি নিয়ে লিবিয়ায় অবস্থান করা ওই বাংলাদেশিরা কোনো গোষ্ঠীর পক্ষে বা বিপক্ষে ছিলেন না।

নিরাপদ আশ্রয়ের খোঁজে গত ২৫ মার্চ রাতে ঘর থেকে বের হওয়াটাই কাল হয়েছিল তাঁদের জন্য। পথে তাঁরা একটি মিলিশিয়া ক্যাম্পের সামনে চলে এলে মিলিশিয়া সদস্যরা তাঁদের থামতে বলেছিলেন। কিন্তু তাঁরা না থেমে প্রাণভয়ে দৌড় দেওয়াতেই মিলিশিয়ারা তাঁদের প্রতিপক্ষের সহযোগী ভেবে গুলি চালিয়ে হত্যা করে।

সংঘাতময় লিবিয়ায় এ ধরনের ঘটনা নতুন নয়। ২৫ মার্চ রাতেই লিবিয়ার মিসরাতায় দুই বাংলাদেশি অপহৃত হন। প্রাথমিকভাবে অপহরণকারীদের ইসলামিক জঙ্গিগোষ্ঠী আইএস বলে মনে করা হলেও পরে জানা গেছে, তারা মিলিশিয়া গোষ্ঠী। লিবিয়া থেকে পাওয়া খবরে জানা গেছে, মুক্তিপণ আদায়ের লক্ষ্যেই তাঁদের অপহরণ করা হয়েছিল। পরে তাঁরা মুক্তি পান।

অপহরণ করে মুক্তিপণ আদায়ের ঘটনা এখন লিবিয়ায় স্বাভাবিক ঘটনা হয়ে উঠেছে।

লিবিয়ায় এখন একই সময়ে তিনটি সরকার দেশের বিভিন্ন এলাকা নিয়ন্ত্রণ করছে। বিবদমান গোষ্ঠীগুলোর মধ্যে যুদ্ধ পরিস্থিতি, সংঘাত ও উত্তেজনায় স্থানীয় বাসিন্দাদের মতো ঝুঁকির মধ্যে রয়েছেন বাংলাদেশিরাও। একেকটি গোষ্ঠী নিজেদের মতো করে এলাকা নিয়ন্ত্রণ করে। রাস্তায় রাস্তায় চৌকি বসিয়ে তল্লাশি করে। কূটনৈতিক সূত্রগুলো জানায়, দু-তিন বছর আগেও লিবিয়ায় বাংলাদেশির সংখ্যা ছিল প্রায় ৪০ হাজার। এখন তা প্রায় ২০ হাজারে নেমে এসেছে। বিদেশি ব্যাংকগুলোর কার্যক্রম বন্ধ হয়ে যাওয়ায় ওই বাংলাদেশিরা জীবনের ঝুঁকি নিয়ে উপার্জিত টাকাও বৈধভাবে দেশে পাঠাতে পারছেন না।

বাকি ২০ হাজার বাংলাদেশি কোথায় গেলেন তার খোঁজ করে জানা গেছে, ইতালির স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তথ্য অনুযায়ী প্রায় ১০ হাজার বাংলাদেশি লিবিয়া থেকে ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে ইতালিতে পৌঁছেছেন। সংশ্লিষ্ট সূত্রগুলোর ধারণা, এর বাইরে অনেক বাংলাদেশি দেশে ফিরে এসেছেন। আবার অনেকে লিবিয়া থেকে ইউরোপের উদ্দেশে সমুদ্রপথে ভয়ংকর যাত্রা করেও সফল হননি। তাঁদের অনেকেই সাগরে নৌকা ডুবে মারা গেছেন।

জানা গেছে, ইউরোপীয়, পশ্চিমা, এমনকি উপসাগরীয় সব দেশ লিবিয়ায় তাদের দূতাবাস বন্ধ করে দিয়েছে। ঝুঁকি সত্ত্বেও একমাত্র বাংলাদেশ ওই দেশটিতে দূতাবাস পুরোপুরি চালু রেখেছে। ভারত ও পাকিস্তানের দূতাবাস কার্যক্রম চলছে সীমিত জনবল দিয়ে। ওই দূতাবাস দুটির কূটনৈতিক শাখার কর্মকর্তারা মাসে একবার তিউনিসিয়া থেকে ত্রিপোলিতে যান।

রাতে বাইরে বের না হওয়ার পরামর্শ : লিবিয়ার বেনগাজিতে ২৫ মার্চ রাতে মিলিশিয়াদের নির্দেশমতো চার বাংলাদেশি যদি থেমে তাঁদের পরিচয়পত্র দেখাতেন, তাহলে প্রাণহানির ঘটনা এড়ানো যেত বলেই মনে করছেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা। মিলিশিয়াদের নির্দেশ অমান্য করে চার বাংলাদেশি নিহত হওয়ার পরিপ্রেক্ষিতে লিবিয়ায় বাংলাদেশ দূতাবাস বাংলাদেশিদের রাস্তাঘাটে চলাফেরার সময় কোনো চেক পয়েন্ট বা নিরাপত্তা বাহিনীর সদস্যরা কোথাও থামতে বললে নিজেদের পরিচয়, পাসপোর্ট, মেডিক্যাল ফিটনেস কার্ড ও নিয়োগকর্তার দেওয়া পরিচয়পত্র (বিতাকা) দেখাতে এবং বিশেষ করে কোনো অবস্থাতেই ভয় পেয়ে না পালানোর পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া নিজ নিজ নিরাপত্তা নিশ্চিত করার স্বার্থে এবং যেকোনো অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি এড়াতে লিবিয়ায় সব বাংলাদেশিকে রাস্তাঘাটে চলাফেরা সীমিত করতে এবং রাতে বাইরে বের না হয়ে যথাসম্ভব সাবধানতা অবলম্বন করার পরামর্শ দিয়েছে। এ ছাড়া বেনগাজিসহ যুদ্ধরত অন্য এলাকাগুলো থেকে বাংলাদেশিদের নিজ নিজ অবস্থান ও প্রতিবন্ধকতা সম্পর্কে বাংলাদেশ দূতাবাসকে হটলাইনের (+২১৮৯১৬৯৯৪২০৭) মাধ্যমে জানানোরও অনুরোধ করা হয়েছে।

জনশক্তি গ্রহণে নিষেধাজ্ঞা লিবিয়ায়ও : প্রবল নিরাপত্তা ঝুঁকি ও চরম অনিশ্চয়তার মধ্যে বাংলাদেশ সরকার গত বছর লিবিয়ায় জনশক্তি রপ্তানি বন্ধ ঘোষণা করে। লিবিয়ায় গৃহযুদ্ধ ও সংঘাত শুরুর পর দেশটির অনেক নাগরিকের পাশাপাশি অভিবাসী কর্মীরাও ভূমধ্যসাগর পাড়ি দিয়ে অবৈধভাবে ইউরোপের পথে পাড়ি জমানোর চেষ্টা করেন। এ ছাড়া ইউরোপে পাঠানোর জন্য লিবিয়াকে ব্যবহারের প্রবণতাও দেখা দেয় বাংলাদেশসহ বিভিন্ন দেশের কিছু অসাধু চক্রের মধ্যে। এরই পরিপ্রেক্ষিতে গত বছর লিবিয়ার ত্রিপোলিস্থ সরকার বাংলাদেশ থেকে কর্মী নেওয়া নিষিদ্ধ ঘোষণা করে। লিবিয়ার অন্য দুই সরকারেরও একই মনোভাব রয়েছে।


মন্তব্য