kalerkantho


সাপের বিষ পাচারে সক্রিয় ১২৭ গ্রুপ

♦ বছরে অন্তত ৭০০ কোটি টাকার বিষ পাচার ♦ বেশির ভাগ যাচ্ছে ইউরোপে কার্যকর ভূমিকা নেই ইপিবির

সরোয়ার আলম   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



সাপের বিষ পাচার ঠেকানোই যাচ্ছে না। প্রতিবছর দেশ থেকে অন্তত ৭০০ কোটি টাকা মূল্যের সাপের বিষ পাচার হচ্ছে বলে র‌্যাব ও পুলিশের কাছে তথ্য রয়েছে। দেশি-বিদেশি চক্র এ বিষ পাচার করছে। পুলিশ-র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থার তালিকা অনুযায়ী ১২৭টি গ্রুপ এর সঙ্গে জড়িত। মূল্যবান ওষুধ তৈরির জন্য ভারত ও ইউরোপের একাধিক দেশে বিষ পাচার করছে তারা। বাণিজ্যিকভাবে সাপের বিষ উৎপাদন ও তা রপ্তানির ব্যাপক সম্ভাবনা থাকলেও সরকার তা কাজেই লাগাতে পারছে না। রপ্তানি উন্নয়ন ব্যুরোর (ইপিবি) রপ্তানি তালিকায় সাপের বিষের নাম থাকলেও নানা জটিলতায় কার্যকর ভূমিকা রাখতে পারছে না ব্যুরো। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, এ ক্ষেত্রে কর্তৃপক্ষের উদাসীনতাই বড় কারণ।

ইতিমধ্যে অবশ্য বেশ কয়েকজন পাচারকারীকে গ্রেপ্তার করা হয়েছে। তবে মদদদাতারা আড়ালেই রয়ে গেছে। সম্প্রতি সিলেটে ৪৬ কোটি টাকার বিষসহ সাতজনকে গ্রেপ্তার করেছে র‌্যাব।

গ্রেপ্তার ব্যক্তিরা জানিয়েছেন, সাপুড়েদের দিয়ে বিষ সংগ্রহ করা হয়। মাঝেমধ্যে ভারত থেকেও সাপের বিষ এনে উন্নত দেশে পাচার করা হয়। এক পাউন্ড বিষ পাচার করতে পারলে অন্তত কোটি টাকা পাওয়া যায়।

এ বিষয়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী আসাদুজ্জামান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সাপের বিষ পাচার রোধ করতে নানা পদক্ষেপ নেওয়া হয়েছে। যেসব পাচারকারী সক্রিয় আছে তাদের অচিরেই ধরা সম্ভব হবে। সাপের বিষ দেশীয় শিল্পেই কাজে লাগানো হবে। আমাদের কাছে তথ্য রয়েছে, বিষ পাচারে দেশি অপরাধীদের উসকে দিচ্ছে বিদেশি চক্রগুলো। তাদের তত্পরতা ঠেকাতে ইতিমধ্যে সীমান্ত এলাকায় বিজিবিসহ গোয়েন্দাদের টহল বাড়ানো হয়েছে। ’

ঢাকা মহানগর পুলিশের (ডিএমপি) অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম জানিয়েছেন, দীর্ঘদিন ধরে বিদেশে সাপের বিষ পাচার করছে একাধিক চক্র। চক্রের সদস্যদের মধ্যে ঢাকায় আছে অনেকেই। তাদের ধরতে ডিবির কয়েকটি টিম কাজ করছে। ইতিমধ্যে তাদের তালিকাও করা হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, গত বছরের ২২ আগস্ট রাতে যশোরে একটি প্রাইভেট কার থেকে প্রায় ৬৮ কোটি টাকা মূল্যের ১২ পাউন্ড সাপের বিষ জব্দ করা হয়। এগুলো ভারত থেকে এনেছিল বাংলাদেশের একটি চক্র। বিষের চালানটি ফ্রান্সে পাঠানোর কথা ছিল। পাচারের সঙ্গে জড়িত প্রভাবশালীদের ধরতে না পারলেও গ্রুপের সদস্যদের শনাক্ত করা সম্ভব হয়েছে। এ চালানটি পাচারের মূল কাজ করছিলেন ফ্রান্সে অবস্থানরত এক বাংলাদেশি ব্যবসায়ী। তাঁর নাম মোরশেদ আলম, বাড়ি বেনাপোল। তিনি আওয়ামী লীগের এক নেতার ছোট ভাই। গোয়েন্দারা নিশ্চিত হয়েছেন, মোরশেদের নিয়ন্ত্রণে কাজ করছে অন্তত ২৫ জন। বিষের চালানটি শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দর দিয়ে ফ্রান্সে নেওয়ার কথা ছিল।

মাসখানেক আগে জয়পুরহাটের ক্ষেতলাল উপজেলার বাঘোপাড়া গ্রামের আবু দাউদের ছেলে ফারুক হোসেনের বাড়িতে অভিযান চালিয়ে ১২ পাউন্ড সাপের বিষ জব্দ করে র‌্যাব। গ্রেপ্তার করা হয় পাঁচজনকে। তাঁরা হলেন এনামুল, তোজাম্মেল হোসেন, মোত্তাসিন বিল্লাহ সোহাগ, মোতালেব হোসেন ও এ কে এম মনসুর। রিমান্ডে তাঁরা র‌্যাবকে জানান, ওই বিষ বিদেশে পাচারের কথা ছিল। র‌্যাব-৫ রাজশাহী অঞ্চলের এক কর্মকর্তা জানান, শুল্ক ফাঁকি দিয়ে বিষের চালানটি দেশে মজুদ করা হয়। পরে অন্য দেশে পাচারের পরিকল্পনা ছিল আসামিদের।

ওই কর্মকর্তা জানান, প্রতিবছর হাজার কোটি টাকারও বেশি মূল্যের বিষ পাচার হচ্ছে। ইপিবি আরো সক্রিয় হলে পাচার ঠেকানো যেত।

গত ২৪ জুলাই সিলেটের সীমান্তবর্তী কানাইঘাট উপজেলা থেকে ৪৬ কোটি টাকা মূল্যের ১২ পাউন্ড গোখরা সাপের বিষ জব্দ করে র‌্যাব। এ ঘটনায় সাতজনকে গ্রেপ্তার করা হয়। র‌্যাবের গোয়েন্দা শাখার প্রধান লে. কর্নেল আবুল কালাম আজাদ জানান, চক্রের সদস্য সিফাতুর রহমান, নজরুল আলম নান্নু, আবু হাছান, আব্দুল মালিক, শহীদুল ইসলাম অনুজ, আব্দুল ওয়াহিদ ও মতিলাল আচার্য দীর্ঘদিন ধরে সাপের বিষ পাচার করছেন। তাঁদের সঙ্গে বিদেশি গ্রুপও জড়িত আছে।

গত ৭ মার্চ রাজধানীর লালবাগের ইরাকি কবরস্থান এলাকা থেকে ১২ পাউন্ড সাপের বিষসহ তিনজনকে গ্রেপ্তার করে র‌্যাব। তাঁরা হলেন আবুল হোসেন, কাজী নাসির উদ্দিন ও আবু মুহিত আহমেদ।

সূত্র জানায়, বাণিজ্যিকভাবে সাপের বিষ রপ্তানি করে বছরে প্রায় ১৫০ কোটি টাকা আয় করা সম্ভব। বছর চারেক আগে ইপিবি বিদেশে সাপের বিষ রপ্তানির বিষয়ে একটি কমিটি গঠন করে। কিন্তু পরে নানা জটিলতায় এর কার্যক্রম বেশি দূর এগোতে পারেনি। বিষ পাচারের ঘটনা বেড়ে যাওয়ায় ইতিমধ্যে পুলিশ-র‌্যাব ও গোয়েন্দা সংস্থাগুলো পাচারকারীচক্রের তালিকা তৈরি করেছে। তালিকা অনুযায়ী ঢাকাসহ দেশের বিভিন্ন স্থানে অনেকগুলো চক্র পাচারের সঙ্গে জড়িত। বিদেশি চক্রও আছে। তালিকাভুক্ত চক্রের মধ্যে যশোরের রহিম ব্যাপারী গ্রুপ, বেনাপোলের মোরশেদ গ্রুপ, বাদশা গ্রুপ, সাতক্ষীরার ফেন্সি বজলু গ্রুপ, ফেনীর বিলোনিয়ায় আজিজুল গ্রুপ, কুমিল্লায় জুলহাস গ্রুপ, মতিন গ্রুপ, দিনাজপুরের হিলির আবদুর রাজ্জাক গ্রুপ, ড্যানি গ্রুপ এবং ঢাকার মহাখালীর রসুল গ্রুপ অন্যতম। বিদেশিদের মধ্যে ভারত, পাকিস্তান, ফ্রান্স, থাইল্যান্ড ও মিয়ানমারের একাধিক গ্রুপ সক্রিয় রয়েছে।

স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের এক কর্মকর্তা বলেন, ২০০৮ সালের জুনে ইপিবি দেশের এ নতুন সম্ভাবনাময় খাতকে কাজে লাগানোর উদ্যোগ নেয়। এ লক্ষ্যে ইপিবি কোরিয়া, জাপান, চীন, কম্বোডিয়া, থাইল্যান্ডসহ বিভিন্ন দেশের সঙ্গে যোগাযোগ শুরু করে। এ জন্য বিশেষজ্ঞদের নিয়ে কমিটিও গঠন করা হয়। সাপের বিষ সংগ্রহ করার আধুনিক পদ্ধতি এবং যেসব দেশে সাপ খাদ্য হিসেবে জনপ্রিয়, সেসব দেশের সাপ লালন-পালনকারী খামারের মালিকদের বাংলাদেশে এনে বেসরকারি খাতে যৌথভাবে সাপের খামার প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নেওয়া হয়। কিন্তু নানা জটিলতায় সেই প্রক্রিয়া থেমে যায়। আর এ সুযোগ কাজে লাগাচ্ছে পাচারকারীরা। গোখরা সাপের বিষ মূল্যবান রাসায়নিক উপাদান। এ সাপের বিষে পটাশিয়াম সায়ানাইডের পরিমাণ বেশি আছে। ফ্রান্স, বেলজিয়াম, জার্মানি, অস্ট্রিয়াসহ যেসব দেশ রাসায়নিক মৌল বা যৌগ উপাদান তৈরি করে তাদের কাছে গোখরার বিষ খুবই মূল্যবান।

সূত্র মতে, পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে ওষুধ উৎপাদনকারী কম্পানিগুলোতে সাপের বিষ মূল্যবান কাঁচামাল হিসেবে ব্যবহৃত হয়। এ দেশে সাপের বিষ উৎপাদন করে তা বিভিন্ন দেশের ওষুধ উৎপাদনকারী কম্পানিগুলোর কাছে রপ্তানি করে কোটি কোটি টাকার বৈদেশিক মুদ্রা আয় করা সম্ভব।


মন্তব্য