kalerkantho


ডিএমপিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের হার কমেছে

আশরাফ-উল-আলম   

২ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



ডিএমপিতে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের হার কমেছে

রাজধানীর রামপুরার হাজিপাড়ায় গত ১৩ মার্চ ছিনতাইকারীদের কবলে পড়েন স্যানিটারি সামগ্রী দোকানের ব্যবস্থাপক ইসমাইল হোসেন। তাঁকে গুলি করে প্রায় তিন লাখ টাকা ছিনিয়ে নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

হাসপাতালে নেওয়া হলে তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন চিকিৎসকরা।   গত ৫ মার্চ আগারগাঁও-তালতলায় বিকাশ এজেন্ট সাইদুল ইসলামের পায়ে গুলি করে ১৫ লাখ টাকা নিয়ে যায় ছিনতাইকারীরা। একই দিন লালবাগের কাজী রিয়াজউদ্দিন রোডে ব্যবসায়ী তাসরিদের রিকশা থামিয়ে তাঁর পায়ে গুলি করে ২৫ লাখ টাকা নিয়ে যায় দুর্বৃত্তরা।

গত ২৮ ফেব্রুয়ারি বংশালের সুরিটোলায় ইউসুফ নামের এক ব্যবসায়ীকে গুলি করে ৮০ হাজার টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা। গত ১৩ ফেব্রুয়ারি কাফরুল থানা এলাকায় দুজন বিকাশ এজেন্টকে গুলি করে প্রায় ১৩ লাখ টাকা ছিনিয়ে নেয় দুর্বৃত্তরা।

সব ঘটনাই ঘটেছে দিনের বেলায়, প্রকাশ্যে। রাজধানীতে এমন ছিনতাইয়ের ঘটনা প্রায়ই ঘটছে; ব্যবহৃত হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র। খুন, ডাকাতি, চাঁদাবাজিতেও ব্যবহার করা হচ্ছে অবৈধ অস্ত্র।

অপরাধমূলক বিভিন্ন কাজে ব্যবহৃত অবৈধ অস্ত্রের বেশির ভাগই উদ্ধার করা সম্ভব হচ্ছে না।

গত বছর ইতালির নাগরিক তাভেল্লাকে খুন করার ঘটনায় ব্যবহৃত অস্ত্রটিও উদ্ধার করা যায়নি এখনো। দুইজন বিদেশিকে হত্যার ঘটনার পর আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী তত্পর হয়; কিছু অবৈধ অস্ত্রও উদ্ধার করা হয়। তবে সার্বিক অগ্রগতি নেই।

মাঝেমধ্যেই আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ীদের তালিকা প্রণয়ন করে। কিন্তু তাদের গ্রেপ্তার করায় এবং অস্ত্র উদ্ধার করায় সাফল্য তেমন চোখে পড়ে না।

অবৈধ অস্ত্র অনেক, এ কথা জানা থাকলেও অস্ত্র ও কারবারিদের বিষয়ে যথাযথ তথ্য গোয়েন্দা সংস্থাগুলোর কাছে নেই।

ঢাকায় অস্ত্র উদ্ধারের হার কমেছে : ঢাকা মহানগরের বিভিন্ন থানায় দায়ের হওয়া মামলার হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০০১ থেকে ২০১৫ সাল পর্যন্ত অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় দায়ের করা মামলার সংখ্যা কমেছে। বিভিন্ন থানা থেকে ঢাকার চিফ মেট্রোপলিটন ম্যাজিস্ট্রেট আদালতে আসা মামলার হিসাব অনুযায়ী, ২০০১ সালে মামলা হয়েছে ৯০৯, ২০০২ সালে ৭৮৬ এবং ২০১৫ সালে ২৫৫টি। আরেক হিসাব থেকে দেখা যায়, ২০০৩ সালে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় মামলা হয়েছে ৪৯২, ২০০৪ সালে ৫১৪, ২০০৫ সালে ৩৯৭, ২০০৬ সালে ৩৬৮, ২০০৭ সালে ৩৫৬, ২০০৮ সালে ৩৯৫, ২০০৯ সালে ৫৮২, ২০১০ সালে ৫১৩, ২০১১ সালে ৩৬৫, ২০১২ সালে ২৮৫, ২০১৩ সালে ২২৩, ২০১৪ সালে ২১৮ ও ২০১৫ সালে ২৫৫টি। এ হিসাব অনুযায়ী, গত পাঁচ বছরে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনা অনেক কমে গেছে।

অবশ্য অস্ত্র উদ্ধারের হার কমে যাওয়ার কথা মানতে রাজি নন পুলিশের মহাপরিদর্শক (আইজিপি) এ কে এম শহীদুল হক। তিনি বলেন, অস্ত্র উদ্ধার অভিযান সব সময়ই চলছে। প্রতিদিন ঢাকাসহ সারা দেশে অবৈধ অস্ত্র উদ্ধার করা হচ্ছে। ব্যবহারকারী এবং কারবারিদেরও গ্রেপ্তার করা হচ্ছে।

অস্ত্র সহজলভ্য : ২১টি সীমান্ত এলাকা দিয়ে অবৈধ অস্ত্র দেশে আসছে। ওই সব এলাকায় অনেকটা প্রকাশ্যেই এসব অস্ত্রের বেচাকেনা হয়। দেশেও তৈরি হয় প্রচুর আগ্নেয়াস্ত্র।

নেত্রকোনা, কুমিল্লা, ব্রাহ্মণবাড়িয়া, ফেনী, রাজশাহী, নওগাঁ, চাঁপাইনবাবগঞ্জ, জয়পুরহাট, যশোর, ঝিনাইদহ, কুষ্টিয়া, চুয়াডাঙ্গা, মেহেরপুর, সাতক্ষীরা, দিনাজপুর, সিলেট, সুনামগঞ্জ, হবিগঞ্জ, রাঙামাটি, খাগড়াছড়ি ও বান্দরবান জেলার সীমান্ত দিয়ে প্রতিদিন অবৈধ অস্ত্র ঢুকছে দেশে। অস্ত্র চোরাকারবারিরা রাজনৈতিক নেতাদের কাছে আশ্রয়-প্রশ্রয় পায়। অনেক সময় গডফাদারদের কারণে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর সদস্যরা অবৈধ অস্ত্রের কারবারিদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে পারে না। ভারত ও মিয়ানমার থেকে আসা অবৈধ অস্ত্র অপরাধীচক্রের হাতে চলে যায় সহজেই।

গত ডিসেম্বরে রাজধানীর হাজারীবাগের ময়না মার্কেট এলাকায় অভিযান চালিয়ে অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী সিন্ডিকেটের সদস্য জুয়েল রানা ও আল আমিনকে গ্রেপ্তার করে ডিবি। তাদের কাছ থেকে দুটি বিদেশি পিস্তল, ১৬ রাউন্ড গুলি ও চারটি ম্যাগাজিন উদ্ধার করা হয়। পরে জিজ্ঞাসাবাদে তারা জানায়, তারা চাঁপাইনবাবগঞ্জ ও রাজশাহীর অস্ত্র ব্যবসায়ীদের কাছ থেকে অস্ত্র জোগাড় করত।

গ্রেপ্তারের কিছু ঘটনা : ২০১৪ সালের ১৮ অক্টোবর ঢাকা থেকে দুটি অত্যাধুনিক স্বয়ংক্রিয় বিদেশি পিস্তল, চারটি ম্যাগাজিন ও সাত রাউন্ড গুলিসহ অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী জুলহাস আকন ওরফে জুলহাস, আবদুস সাত্তার, আবদুস সাত্তার ঢালী ওরফে রকি হোসেন ওরফে সাত্তার ও এমদাদ হোসেন ওরফে ইমদাদকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরদিন পাঁচটি অত্যাধুনিক বিদেশি পিস্তল, আটটি ম্যাগাজিন ও ২৪টি বুলেটসহ রাজধানীর কল্যাণপুর থেকে গ্রেপ্তার করা হয় অবৈধ অস্ত্র ব্যবসায়ী মনিরুজ্জামান ওরফে শিমুল, কামাল হোসেন ও রুহুল আমিনকে। ওই বছরের ১৫ নভেম্বর র‌্যাব পাঁচ অস্ত্র ব্যবসায়ীকে তিনটি পিস্তল, তিনটি ম্যাগাজিন ও ৮৩ রাউন্ড গুলিসহ গ্রেপ্তার করে। ২৫ ডিসেম্বর রাজধানীর খিলগাঁও থেকে জসিম ও আল আমিন নামের দুজনকে একটি পিস্তল, একটি ম্যাগাজিন ও দুটি গুলিসহ গ্রেপ্তার করা হয়। ৩১ ডিসেম্বর গভীর রাতে রাজধানীর পূর্ব বাসাবো থেকে এক হাজার রাউন্ড বিভিন্ন বোরের গুলি, স্বয়ংক্রিয় দুটি বিদেশি রিভলবার, একটি পিস্তলসহ অস্ত্র ব্যবসায়ী সাইফুল্লাহ খানকে গ্রেপ্তার করে ডিবি।

অবৈধ অস্ত্রের কারবারিরা অধরা : একটি গোয়েন্দা সংস্থা অবৈধ অস্ত্রের কারবারি ও তাদের গডফাদারদের নামের তালিকাসহ একটি প্রতিবেদন প্রধানমন্ত্রীর দপ্তরে জমা দেয় গত বছর। এর অনুলিপি পুলিশের মহাপরিদর্শক এবং বিজিবির মহাপরিচালককেও দেওয়া হয়। ওই গোপন প্রতিবেদনের ভিত্তিতে তালিকাভুক্তদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নিতে পুলিশ ও র‌্যাবকে নির্দেশ দেওয়া হয়। কিন্তু কারবারিরা এবং তাদের গডফাদাররা ধরাছোঁয়ার বাইরেই রয়ে গেছে। গডফাদারের অনেকেই ক্ষমতাসীন রাজনৈতিক দলের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট বলে সূত্র জানায়।


মন্তব্য