kalerkantho


স্থায়ী গ্যালারি

প্রদর্শনীর আলোয় ধ্রুপদ চিত্রকলা

আজিজুল পারভেজ   

১ এপ্রিল, ২০১৬ ০০:০০



প্রদর্শনীর আলোয় ধ্রুপদ চিত্রকলা

সদ্য স্বাধীন বাংলাদেশে শিল্পকলা একাডেমি প্রতিষ্ঠার পরপরই শুরু হয়েছিল চিত্রকলা সংগ্রহ। চিত্রকলার প্রায় সব মাধ্যমের শিল্পকর্ম ও এ দেশের প্রায় সব গুণী চিত্রশিল্পীর চিত্রকর্ম এই সংগ্রহভাণ্ডারকে করেছে সমৃদ্ধ।

কিন্তু এত বছর এই ধ্রুপদ শিল্পকর্মগুলো দেখার কোনো সুযোগ ছিল না। গুদামজাত অবস্থায়ই পড়ে ছিল। অবশেষে সেসব শিল্পকর্ম এলো প্রদর্শনীর আলোয়।

শিল্পকলা একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার দোতলার একাংশজুড়ে ১ নম্বর গ্যালারিটিকে স্থায়ী গ্যালারির রূপ দেওয়া হয়েছে। শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিন থেকে শুরু করে দেশের প্রায় সব বিখ্যাত শিল্পীর ছবি দিয়ে এটি সাজানো হয়েছে। আছে অপেক্ষাকৃত নবীন ও প্রতিশ্রুতিশীল শিল্পীদের কাজও।

গ্যালারিতে প্রবেশ করতেই চোখ আটকে যায় শিল্পাচার্য জয়নুল আবেদিনের আঁকা ছবিতে। ১৯৭০ সালের প্রলয়ংকরী ঘূর্ণিঝড় সিরিজের চারটি ছবি। মা-শিশু-পশু-পাখির মৃতদেহ বালুচরে একাকার।

কাগজের কালি মাধ্যমের সাদা-কালো ছবি। এর পরই রয়েছে কামরুল হাসানের বিখ্যাত চিত্রকর্ম তিন কন্যা ও নায়রসহ তেলরঙের চারটি চিত্রকর্ম। ছবিগুলো ১৯৭৪ থেকে ১৯৮১ সালের। এ দেশের ছাপচিত্র মাধ্যমের পথিকৃৎ শিল্পী শফিউদ্দিন আহমেদের চিত্রকর্ম রয়েছে চারটি। দুটি ছাপচিত্র ও দুটি তেলরঙের। এগুলো ১৯৬৮, ১৯৭৩ ও ১৯৮২ সালের আঁকা। এ দেশের বিমূর্তধারার অন্যতম পুরোধা শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার তেলরঙে আঁকা চিত্রকর্ম রয়েছে চারটি। সেগুলো ১৯৬৬ সাল থেকে শুরু করে ১৯৮৩ সালের আঁকা। আমিনুল ইসলামের দুটি বিখ্যাত চিত্রকর্ম রয়েছে, যা শিল্পবোদ্ধাদের অদেখা না হলেও সাধারণ শিল্পরসিকরা এবার সরাসরি দেখার সুযোগ পাবেন। এগুলো হচ্ছে ‘সময় এবং অসময়ের অতীত’ ও ‘গণহত্যা’। কিংবদন্তি শিল্পী এস এম সুলতানের অনেক ছবি শিল্পকলার সংগ্রহে রয়েছে। সেখান থেকে ‘প্রথম বৃক্ষ রোপণ’ ও ‘বাংলাদেশের গ্রামীণ চিত্র’ সিরিজের ছবি তিনটি এসেছে গ্যালারিতে। রশীদ চৌধুরীর ট্যাপেস্ট্রি মাধ্যমের অনেক শিল্পকর্ম রয়েছে একাডেমির সংগ্রহে। প্রদর্শনীতে এসেছে ‘আদম’। এ রকম কিংবদন্তি শিল্পীদের অসাধারণ সব কাজ প্রদর্শনীর আলোয় এসেছে, যেগুলো সমৃদ্ধ করেছে এ দেশের শিল্পকলার ধারাকে।

এ ছাড়া গ্যালারিতে স্থান পেয়েছে শিল্পী আনোয়ারুল হকের দুটি এবং আব্দুর রাজ্জাকের তিনটি চিত্রকর্ম। এ ছাড়া মুর্তজা বশীরের তিনটি ও কাজী আব্দুল বাসেদের তিনটি ছবিও রয়েছে। সদ্য প্রয়াত বরেণ্য শিল্পী কাইয়ুম চৌধুরীর আঁকা ছবি রয়েছে তিনটি। শিল্পী দেলোয়ারের একটি, দেবদাস চক্রবর্তীর তিনটি, আবু তাহেরের দুটি, নিতুন কুণ্ডুর একটি শিল্পকর্মও রয়েছে সেখানে। গ্যালারিতে হামিদুর রহমানের একটি, রফিকুন নবীর দুটি ও সৈয়দ জাহাঙ্গীরের ছবি থেকে নেওয়া হয়েছে তিনটি শিল্পকর্ম। সমরজিৎ রায় চৌধুরী, মুস্তাফা মনোয়ার, শিল্পী হাশেম খানের ছবি রাখা হয়েছে দুটি করে। জনপ্রিয় শিল্পী শাহাবুদ্দীন আহামদ, শিশির ভট্টাচার্য্য, হামিদুজ্জামান খান, মাহমুদুল হক, আবদুস শাকুর শাহ প্রমুখের চিত্রকর্মও রয়েছে। রয়েছে কয়েকটি ভাস্কর্য। এভাবে ৯৫ জন শিল্পীর ১৩৮টি শিল্পকর্ম নিয়ে যাত্রা করল স্থায়ী গ্যালারি।

শিল্পী রফিকুন নবী বলেন, এই গ্যালারি দেখলে যে কেউ এ দেশের চিত্রকলার ধারা এবং শিল্পীদের কাজ সম্পর্কে একটি ধারণা পেয়ে যাবে। তিনি বাংলাদেশের শিল্পকর্ম প্রদর্শনের জন্য একটি আলাদা জাতীয় প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার আহ্বান জানান।

জানা যায়, শিল্পকলা একাডেমি ১৯৭৫ সাল থেকে খ্যাতিমান ও সম্ভাবনাময় শিল্পীদের শিল্পকর্ম সংগ্রহ শুরু করে। এ পর্যন্ত সংগ্রহ হয়েছে ৫৭৮টি চিত্রকর্ম, যার মধ্যে অনেক কালজয়ী চিত্রকর্মও রয়েছে। আবার বর্তমানে খ্যাতিমান অনেক শিল্পী রয়েছেন, যাঁদের প্রথম দিককার শিল্পকর্ম সংরক্ষণ করছে শিল্পকলা একাডেমি। কিছু চিত্রকর্ম প্রায় বিনা মূল্যে, আবার কিছু ছবি নামমাত্র মূল্যে সংগ্রহ করা হয়েছে। মাত্র দুই থেকে পাঁচ হাজার টাকা দামে কেনা হয়েছে একেকটি চিত্রকর্ম, যেগুলো আজ অমূল্য হিসেবে বিবেচিত।

১৯৭৫ সালে শিল্পী সুলতানের ‘গাঁয়ের কৃষক’ মাত্র দুই হাজার টাকায় কিনে নেয় শিল্পকলা একাডেমি। এরপর এই শিল্পী ১৯৮৬ সালে শিল্পকলা একাডেমির বিশেষ আমন্ত্রণে এসে আঁকেন অনেক ছবি। অধিকাংশ ছবিতে গ্রামীণ জীবনের নানা চিত্র তুলে ধরেছেন সুলতান। শিল্পী শফিউদ্দিনের আঁকা বিখ্যাত ছবি ‘কম্পোজিশন’ কেনা হয় মাত্র পাঁচ হাজার টাকায়। তেলরঙে আঁকা ছবিটি ১৯৭৬ সালে কেনা। একই বছর কেনা হয় তেলরঙে আঁকা রশীদ চৌধুরীর ‘সম্রাজ্ঞীর স্বর্গ’, এখনো যা বিমোহিত করে রাখে শিল্পপ্রেমীদের। সেটিও মাত্র পাঁচ হাজার টাকায় কেনা। ১৯৭৫ সালে একই দামে কেনা হয় বিমূর্ত ধারার পথিকৃৎ শিল্পী মোহাম্মদ কিবরিয়ার তেলরঙে আঁকা ‘সাদা-কালো’ চিত্রকর্মটি। একাডেমির জাতীয় চিত্রশালার নিচতলায় অবস্থিত সংগ্রহশালায় এগুলো সংরক্ষণ করা হচ্ছিল। এই ছবিগুলো এখন প্রদর্শনীর আলোয় এলো।

যাঁর ছবি দিয়ে শুরু হয়েছে স্থায়ী গ্যালারির প্রদর্শনী, সেই শিল্পাচার্যের ছবি সংগ্রহ-ই হচ্ছে শিল্পকলা একাডেমির সর্বশেষ সংগ্রহ। সম্প্রতি একাডেমির মহাপরিচালক লিয়াকত আলী লাকী শিল্পাচার্যের পারিবারিক সংগ্রহ থেকে বাংলাদেশের শিল্প আন্দোলনের এই পুরোধা শিল্পীর চিত্রকর্ম সংগ্রহ করেছেন।  

জানা গেছে, স্থায়ী গ্যালারির চিত্রকর্ম তিন মাস বা ছয় মাস পর পর পরিবর্তন হবে। পর্যায়ক্রম সব ছবিই আসবে প্রদর্শনীর আলোয়।

গত মঙ্গলবার উদ্বোধন করা হয় এই স্থায়ী গ্যালারি। উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে সংস্কৃতিমন্ত্রী আসাদুজ্জামান নূর স্থায়ী গ্যালারির প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে বলেন, ‘অনেক বিদেশি অতিথি এসে বাংলাদেশের শিল্পীদের শিল্পকর্ম দেখার আগ্রহ প্রকাশ করেন। কিন্তু স্থায়ী কোনো গ্যালারি না থাকায় আমরা আমাদের চর্চা সম্পর্কে ভালো ধারণা দিতে পারিনি। আজ শুরুটা করলাম। ’

প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত খোলা থাকবে এই গ্যালারি।


মন্তব্য