kalerkantho


ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন ২০১৬ : সরেজমিন প্রতিবেদন

বিদ্রোহী ও বিএনপি প্রার্থীদের শঙ্কা ফল পাল্টে যাওয়ার

সিরাজগঞ্জ

তৈমুর ফারুক তুষার ও অসীম মণ্ডল সিরাজগঞ্জ থেকে   

৩১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ভোটারদের মধ্যে রয়েছে ব্যাপক উৎসাহ-উদ্দীপনা। প্রার্থীরা ভোটারদের এ উৎসাহে নানাভাবে প্রণোদনা দিচ্ছেন, ভোটকেন্দ্রে নিজের কর্মী-সমর্থকের ব্যাপক উপস্থিতি নিশ্চিত করতে যথাসম্ভব চেষ্টা করছেন। কিন্তু বেশির ভাগ প্রার্থী ও ভোটারদের মনে একটাই শঙ্কা—ভোটের ফল বদলে যাবে না তো! দ্বিতীয় ধাপে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের আগের দিন গতকাল সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়ন ঘুরে এমন শঙ্কার চিত্রই পাওয়া গেল।

সকাল ১১টায় সিরাজগঞ্জ শহর লাগোয়া খোকশাবাড়ি ইউনিয়নের স্বতন্ত্র চেয়ারম্যান প্রার্থী মনজুর রহমান বকুলকে খলিশাকুড়া গ্রামে নিজ বাড়িতে বসে থাকতে দেখা গেল। সেখানে বিভিন্ন গ্রাম থেকে কয়েক শ মানুষ জমায়েত হয়েছেন। তাঁদের অনেকেই ইউনিয়নের ১১টি ভোটকেন্দ্রে নিজেদের সার্বিক প্রস্তুতি বকুলকে অবহিত করছিলেন। কর্মী-সমর্থকদের প্রায় সবাই জানালেন, প্রস্তুতি নিয়ে তাঁরা সন্তুষ্ট। কিন্তু ভোটারদের শঙ্কা হলো, ভোটকেন্দ্রে গিয়ে দেখবেন তাঁদের ভোট দেওয়া হয়ে গেছে। শঙ্কার কারণ ব্যাখ্যা দিয়ে তাঁরা বলেন, কয়েক দিন ধরে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর লোকজন গ্রামে গ্রামে গিয়ে ভোটারদের হুমকি-ধমকি দিয়েছে। মনজুর রহমান বকুল বলেন, ‘যেখানেই যাচ্ছি ভোটারদের সাড়া পাচ্ছি। ভোটাররা ভোট দেবেন বলে প্রতিশ্রুতিও দিচ্ছেন। কিন্তু তাঁদের মনে একটাই শঙ্কা—ক্ষমতাসীন দলের প্রার্থী প্রভাব খাটিয়ে শেষে ভোটের ফল না বদলে দেয়। বিভিন্ন সময়ে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীরা আমার কর্মী-সমর্থকদের হুমকি দিয়েছে। ’

তবে এমন অভিযোগ অস্বীকার করে আওয়ামী লীগের প্রার্থী রাশেদুল হাসান বলেন, ‘আমরা ভোট জালিয়াতিতে বিশ্বাসী নই। আমাদের দিক থেকে স্বচ্ছ ও সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে সব ধরনের সহযোগিতা করা হবে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা যায়, শুধু খোকশাবাড়ি ইউনিয়নে নয়, সিরাজগঞ্জের অন্য ইউনিয়নগুলোর পরিস্থিতিও কমবেশি একই রকম। ইতিমধ্যে দুটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মারধরের ঘটনা ঘটেছে। বিএনপি ও জামায়াতের কয়েকজন প্রার্থী ও তাঁদের কর্মী-সমর্থকদের মাঠেই নামতে দেওয়া হয়নি। আর যেসব এলাকায় বিএনপি বা স্বতন্ত্র প্রার্থীদের খুব বেশি জনসমর্থন রয়েছে সেখানে ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা করছেন প্রার্থী ও ভোটাররা।

দ্বিতীয় দফার ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনে আজ সিরাজগঞ্জ সদর উপজেলার ৯টি ইউনিয়নে ভোটগ্রহণ হবে। এর মধ্যে একটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হওয়ার পথে রয়েছেন। বাকি আটটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে ৪৪ জন, সংরক্ষিত সদস্য পদে ১২৩ জন, সদস্য পদে ৩৯৩ জন প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন। কালিয়া হরিপুর ও বহুলী—এ দুই ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। কালিয়া হরিপুরে বর্তমান চেয়ারম্যান মিজানুর রহমান ও বহুলীতে সাবেক চেয়ারম্যান ও বিশিষ্ট মুক্তিযোদ্ধা আব্দুল বারী তালুকদার দলীয় সিদ্ধান্তের বাইরে গিয়ে নির্বাচন করছেন।

রবিবার দুপুরে ক্ষমতাসীন দলের নেতাকর্মীদের মারধরের শিকার হন কালিয়া হরিপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী চেয়ারম্যান প্রার্থী মিজানুর রহমান মিজানের কয়েকজন সমর্থক। এদিন সন্ধ্যায় বনবাড়িয়ায় নিজ বাসভবনে এক সংবাদ সম্মেলনে মিজান বলেন, ‘দুপুরে স্থানীয় সরকারপাড়ায় নির্বাচনী প্রচারণা চালানোর সময় আওয়ামী লীগ মনোনীত চেয়ারম্যান প্রার্থীর বেশ কয়েকজন সমর্থক কয়েকটি মোটরসাইকেলে এসে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এতে আমার কয়েকজন সমর্থক আহত হন। হামলাকারীরা অস্ত্র প্রদর্শন করে হুমকি-ধমকি দিয়ে চলে যায়। এতে এলাকায় ভীতিকর পরিস্থিতির সৃষ্টি হয়েছে। বিষয়টি নিয়ে স্থানীয় নির্বাচন কমিশন অফিসে লিখিত অভিযোগ দিলেও কোনো লাভ হয়নি। ’

এর আগে শুক্রবার বহুলী ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আব্দুল বারী তালুকদারের ওপর হামলা চালানো হয়। জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম সজল ও পৌর যুবলীগের আহ্বায়ক এমদাদুল হক এমদাদের নেতৃত্বে যুবলীগের ২০-২৫ জন নেতাকর্মী বারী তালুকদারকে শারীরিকভাবে লাঞ্ছিত করে। হামলায় নেতৃত্ব দেওয়া সজল ও এমদাদ স্থানীয় সংসদ সদস্য হাবিবে মিল্লাত মুন্নার ঘনিষ্ঠ বলে পরিচিত। মুন্নার নির্দেশেই এ হামলা চালানো হয়েছে বলে অভিযোগ বারী তালুকদারের সমর্থকদের।

জানতে চাইলে বারী তালুকদার বলেন, ‘বাগডুমুর এলাকার মাসুদ মাস্টারের বাড়িতে স্থানীয় গণ্যমান্য ব্যক্তিদের নিয়ে মিটিং করার সময় সজল ও এমদাদের নেতৃত্বে একটি গ্রুপ মোটরসাইকেল নিয়ে ঘটনাস্থলে পৌঁছে আমাদের ওপর হামলা চালায়। এ সময় তারা আমাকেসহ আরো কয়েকজনকে মারধর করে এবং ঘরের আসবাবপত্র ও একটি মোটরসাইকেল ভাঙচুর করে। নির্বাচন থেকে সরে না দাঁড়ালে পরে আরো হামলা চালানো হবে বলে হুমকি দেয়। ’

মারধরের ঘটনার বিষয়ে জেলা স্বেচ্ছাসেবক লীগের সভাপতি নুরুল ইসলাম সজল বলেন, ‘দলের সিদ্ধান্ত অমান্য করে নির্বাচনে অংশ নেওয়ায় জেলা আওয়ামী লীগের সদস্য আব্দুল বারী তালুকদারকে দল থেকে বহিষ্কার করা হয়। শুক্রবার দুপুরে বহুলী এলাকায় বহিষ্কারের বিষয়টি মাইকযোগে প্রচারের সময় তাঁর সমর্থকরা মাইক ভাঙচুর করে এবং আমরা মোটরসাইকেলে ওই এলাকা দিয়ে যাওয়ার সময় বারী তালুকদারের নেতৃত্বে রাস্তায় প্রতিবন্ধকতা তৈরি করা হয়। এ সময় তাঁরা জেলা নেতাদের নামে গালমন্দ করছিলেন। এতে আমাদের বিক্ষুব্ধ নেতাকর্মীরা মারপিট ও কিছু বিচ্ছিন্ন ঘটনা ঘটিয়েছে। ’

এ প্রসঙ্গে সিরাজগঞ্জ সদর থানার ওসি হাবিবুল ইসলাম বলেন, ‘ঘটনাটি দলের অভ্যন্তরীণ। আমরা নিয়ন্ত্রণের চেষ্টা করছি। বিষয়টি স্থানীয় সংসদ সদস্য অধ্যাপক হাবিবে মিল্লাত মুন্না ও স্বাস্থ্যমন্ত্রী মোহাম্মদ নাসিমকে অবহিত করা হয়েছে। বর্তমানে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রয়েছে। ’

সিরাজগঞ্জ সদরের যমুনার চর এলাকায় অবস্থিত কাওয়াকোলা ইউনিয়নেও ভোট জালিয়াতির আশঙ্কা করছেন বিএনপির প্রার্থী শাহাদাত হোসেন ঠাণ্ডুর কর্মীরা। তাঁদের দাবি সুষ্ঠু ভোট হলে জিততে পারবেন না বুঝতে পেরে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আব্দুল আলিম ভূঁইয়া প্রশাসনকে ব্যবহার করে ভোট কারচুপি করার চেষ্টা করছেন।

তবে নিজেদের প্রস্তুতি নিয়ে সন্তুষ্টির কথা জানিয়েছেন সদর উপজেলার নির্বাচন কর্মকর্তা জয়নাল আবেদীন। প্রার্থীদের মারধর ও হুমকির বিষয়ে জানতে চাইলে তিনি বলেন, ‘অভিযোগ তো সব দেখি আপনার কাছে। আমার কাছে এখনো কোনো অভিযোগ আসেনি। সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে আমাদের প্রস্তুতি নিয়ে আমরা সন্তুষ্ট। ’


মন্তব্য