kalerkantho

সোমবার । ১৬ জানুয়ারি ২০১৭ । ৩ মাঘ ১৪২৩। ১৭ রবিউস সানি ১৪৩৮।


আইনজীবীর আশাবাদ

লজ্জায় অর্থ ফেরত দেবে ফেডারেল রিজার্ভ

কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়ার দাবি সিআইডির

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৩০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



২২

 

রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্ক মামলা ছাড়াই লজ্জায় ফেরত দেবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন বাংলাদেশ ব্যাংকের পক্ষে নিযুক্ত আইনজীবী ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি। তিনি বলেছেন, ‘নিজেদের সুনামের ঝুঁকি বিবেচনা করে ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক মামলা ছাড়াই ৮১ মিলিয়ন ডলার ফেরত দেবে বলে বিশ্বাস করি। ’ খ্যাতিমান এ আইনজীবী সুপ্রিম কোর্ট আইনজীবী সমিতি ভবনে নিজ কক্ষে গতকাল মঙ্গলবার সাংবাদিকদের বলেন, ‘সেখানে অনেকেই টাকা রাখেন। যদি টাকা এভাবে চুরি হয়ে যায়, তাদের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। এতে তাদের ব্যবসায়িক ক্ষতি হতে পারে। সবাই যদি টাকা ফেরত নিয়ে যান তবে তারা ব্যবসা করতে পারবে না। ’

টাকা উদ্ধারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংক মামলা করবে কি না—এমন প্রশ্নের জবাবে ব্যারিস্টার আজমালুল হোসেন কিউসি বলেন, ‘মামলা তো করাই যায়। আমি তো চুরির ভিকটিম। ’ তিনি বলেন, ‘আমি টাকা রেখেছি। আমার টাকা কাউকে দিতে হলে আমার ইন্সট্রাকশন লাগবে। কিন্তু এ ক্ষেত্রে আমার (বাংলাদেশ ব্যাংক) ইন্সট্রাকশন ছাড়াই টাকা দেওয়া হয়েছে। যে টাকা দিয়েছে সেটা তো চোরের ইন্সট্রাকশনে হয়েছে। এ কারণেই ফেডারেল ব্যাংককে বলতেই পারি, তুমি আমার ইনস্ট্রাকশন অনুসারে কাজ করোনি। আমার টাকা ফেরত দাও। এটা সহজ। মামলা করা লাগবে না, ওরা লজ্জায় এমনি টাকা দিয়ে দেবে। ’

এদিকে রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনা তদন্তে কিছুটা অগ্রগতি হয়ছে বলে দাবি করেছে পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)। স্পর্শকাতর এ ঘটনায় দায়ের করা মমলা তদন্তে টানা ১৫ দিন কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গিয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ করছেন সিআইডি কর্মকর্তারা। কেন্দ্রীয় ব্যাংকে গিয়ে গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পেয়েছেন বলে গতকাল দাবি করেছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট এক গোয়েন্দা কর্মকর্তা।

রিজার্ভের চুরি হওয়া অর্থ উদ্ধারে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ব্যবহূত ডেস্কটপ কম্পিউটারের পাশাপাশি এবার সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের ল্যাপটপও তদন্তের আওতায় আনা হয়েছে।

সিআইডির বিশেষ সুপার (সংঘবদ্ধ অপরাধ) মীর্জা আবদুল্লাহেল বাকী গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, অর্থ চুরির ঘটনায় দায়ের করা মামলার তদন্ত অব্যাহত রয়েছে। এরই মধ্যে তদন্তে কিছু গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। প্রতিদিনই কেন্দ্রীয় ব্যাংক থেকে নতুন নতুন তথ্য পাওয়া যাচ্ছে। এরপর প্রাপ্ত তথ্য নিয়ে বাংলাদেশ ব্যাংকের ঊর্ধ্বতনদের সঙ্গে আলাপ করছেন তাঁরা। তবে তদন্তে দুই শতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হলেও এখনো ঘটনায় জড়িত একজনও শনাক্ত হয়নি।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের মুখপাত্র ও নির্বাহী পরিচালক শুভংকর সাহা বলেন, বাংলাদেশ ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ চুরির ঘটনায় তিনটি আলাদা তদন্ত কমিটি কাজ করছে। বাংলাদেশ ব্যাংকের সাবেক গভর্নর ড. ফরাসউদ্দিনের নেতৃতে সরকার গঠিত একটি কমিটি, সিআইডি এবং কেন্দ্রীয় ব্যাংকের ফরেনসিক টিম এ তদন্ত করছে।

আজমালুল হোসেন কিউসি জানান, ফেডারেল রিজার্ভকে বেশ কিছু চিঠি, ই-মেইল ও মেসেজ দিয়েছে বাংলাদেশ ব্যাংক। কোনোটিরই এখনো জবাব আসেনি। তিনি বলেন, ‘আমরা তাদের কাছে জানতে চেয়েছি, কবে আপনারা পেমেন্টগুলো করলেন? আপনাদের কাছে কবে ইনস্ট্রাকশন এসেছে? আপনি কবে দিয়েছেন? বিস্তারিত তথ্য জানতে চাওয়া হয়েছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অনেক অভিযোগ করেছে। ই-মেইল করেছে, চিঠি দিয়েছে, সুইফট মেসেজ দিয়েছে। সেগুলোর কোনো উত্তর আসেনি। ২৪ োর্চ বাংলাদেশ সব তথ্য নিয়ে একটি চিঠি দেয়। সে চিঠির এখনো উত্তর আসেনি। ’

ওই আইনজীবী বলেন, ‘ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংকের সঙ্গে বাংলাদেশ ব্যাংকের একটা চুক্তি আছে। সেটা সেন্ট্রাল ব্যাংকদের ব্যাংক। এখানে ২৫০টা সেন্ট্রাল ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট আছে। সেখানে আমাদের টাকা রাখার উদ্দেশ্য হলো টাকাটা যেন নিরাপদ থাকে। টাকা স্থানান্তরের ক্ষেত্রে বাংলাদেশ ব্যাংক কোনো পেমেন্ট ইনস্ট্রাকশন দেয়নি। তা সত্ত্বেও অর্থ চলে গেছে। উনারা কি বুঝতে পারেননি ফেইকভাবে (ভুয়া) টাকা চলে গেছে। সে জন্য উনারা চুক্তি ভঙ্গ করেছেন কি না তা দেখছি। এ ছাড়া বাংলাদেশ ব্যাংকের নিজেদের ব্যবস্থাপনায় কোনো দুর্বলতা আছে কি না তাও খতিয়ে দেখা হচ্ছে। চুক্তি অনুসারে ফেডারেল রিজার্ভ কেবল কেন্দ্রীয় ব্যাংকের নির্দেশনা অনুসারে বাংলাদেশের সঞ্চিত অর্থ স্থানান্তর করতে পারে। এ ক্ষেত্রে যেহেতু তা হয়নি, সেহেতু মামলা করাই যায়। ’

সিআইডির তদন্তসংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা যায়, কেন্দ্রীয় ব্যাংকের রিজার্ভের অর্থ লুটের ঘটনায় এ পর্যন্ত দুই শতাধিক ব্যক্তিকে জিজ্ঞাসাবাদের পাশাপাশি বিভিন্ন সূত্র থেকে অনেক গুরুত্বপূর্ণ তথ্য পাওয়া গেছে। এ পর্যন্ত পাওয়া তথ্য-উপাত্ত যাচাই-বাছাইয়ের পর ঘটনার অনেক বিষয় পরিষ্কার হয়ে আসছে। ঘটনায় বাংলাদেশ ব্যাংকের অ্যাকাউন্ট অ্যান্ড বাজেটিং ডিপার্টমেন্টের ব্যাক অফিস অব দ্য ডিলিং রুম, ফরেন এক্সচেঞ্জ ডিপার্টমেন্ট ও সিকিউরিটি সার্ভিল্যান্স ও তথ্যপ্রযুক্তি শাখার ৫০টি কম্পিউটারকে টার্গেট করে তদন্ত চলছে। এরই মধ্যে ২৫টি কম্পিউটারের ফরেনসিক ইমেজ নিয়ে তা সিআইডির ফরেনসিক ল্যাবে পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হচ্ছে। বাকি ২৫টি কম্পিউটার থেকেও ফরেনসিক ইমেজ নেওয়ার প্রক্রিয়া চলছে। তদন্তসংশ্লিষ্ট সিআইডির ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের ধারণা, সন্দেহভাজন ৫০টি কম্পিউটার থেকেই আলোচিত ব্যাংক কেলেঙ্কারির উল্লেখযোগ্য তথ্য মিলতে পারে। এর ফলে বেরিয়ে আসতে পারে থলের বিড়াল।

চুরি হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত আসবে কি না জানতে চাইলে বাংলাদেশ ব্যাংকের মুখপাত্র বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংকের অনুরোধে ফিলিপাইনের কেন্দ্রীয় ব্যাংক, অ্যান্টি মানি লন্ডারিং কাউন্সিল বাংলাদেশের চুরি হয়ে যাওয়া অর্থ ফেরত পেতে সহযোগিতা করছে। এরই মধ্যে দেশটির স্থানীয় যে ব্যাংকের মাধ্যমে অর্থ উঠিয়ে নেওয়া হয় সেই ব্যাংক এবং টাকা উত্তোলনকারীকে চিহ্নিত করতে শুনানি হয়েছে। আমাদের বিশ্বাস দুই দেশের মধ্যে যে আস্থার সম্পর্ক রয়েছে, সেই হিসেবে পুরো বিষয়টিকে চিহ্নিত করে ফিলিপাইন তার দেশের দায়ী ব্যাংককে অভিযুক্ত করে বাংলাদেশ ব্যাংকের অর্থ ফেরত দেওয়ার উদ্যোগ নেবে। ’


মন্তব্য