kalerkantho


এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান

জাল সনদেই চাকরি

শরীফুল আলম সুমন   

২৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জাল সনদ দিয়ে দিব্যি চাকরি করে যাচ্ছেন এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের অসংখ্য শিক্ষক। বছরের পর বছর তাঁরা চাকরি করছেন আর সরকারের কাছ থেকে বেতন নিচ্ছেন। এমনকি বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদও জাল করেছেন কিছু শিক্ষক। তবে সবচেয়ে বেশি জাল সনদ ধরা পড়ছে শিক্ষক নিবন্ধনের, এর পরের অবস্থানেই রয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণ সনদ। এ ছাড়া জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএড, এমএড, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের ডিপ্লোমা ও লাইব্রেরিয়ান সনদও জাল করে সেই সনদে চাকরি করছেন শিক্ষকরা।

প্রায় চার লাখ এমপিওভুক্ত শিক্ষকের মধ্যে ৪০ হাজার শিক্ষকের কোনো না কোনো সনদ জাল থাকার আশঙ্কা প্রকাশ করেছে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ের অধীন পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর। ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত তারা প্রায় তিন হাজারের বেশি শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে সনদ যাচাই করেছে। এর মধ্যে স্কুল, কলেজ ও মাদ্রাসা রয়েছে। সেখানে ৩৭৬ জন শিক্ষকের জাল সনদ ধরা পড়েছে। আরো প্রায় এক হাজার সনদ তাদের সন্দেহের তালিকায় রয়েছে। এসব সনদ সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের কাছে যাচাইয়ের জন্য পাঠানো হয়েছে বলে জানা গেছে।

নাম প্রকাশ না করে ওই দপ্তরের একজন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তা কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এমপিওভুক্ত শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের সংখ্যা ২৬ হাজারের ওপরে। তবে আমাদের যে জনবল তাতে বছরে এক হাজারের বেশি প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করা সম্ভব নয়। তবে আমরা যেই প্রতিষ্ঠানে গেছি সেখানেই  কোনো না কোনো শিক্ষকের সনদ জাল পেয়েছি। তিন হাজার প্রতিষ্ঠান পরিদর্শন করে ৩৭৬ জন শিক্ষকের সনদ জাল পেয়েছি। আমাদের আশঙ্কা বর্তমানে কর্মরত ১০ শতাংশ শিক্ষকই তাঁর কোনো না কোনো সনদ জাল করে চাকরি করে যাচ্ছেন। সেই হিসাবে জাল সনদধারী শিক্ষকের সংখ্যা ৪০ হাজারের কম হবে না। ’

তবে জাল সনদ ধরা পড়ার পরও ঠিকমতো ব্যবস্থা না নেওয়ার অভিযোগ রয়েছে। আবার যাদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে তাতেও রয়েছে নানা দীর্ঘসূত্রতা। জানা যায়, শিক্ষা মন্ত্রণালয় থেকে জাল সনদধারী এসব শিক্ষকের তালিকা মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা (মাউশি) অধিদপ্তরে পাঠানো হয়। ওই অধিদপ্তর প্রথমে ওই শিক্ষকদের কারণ দর্শানো নোটিশ পাঠানোর কথা। এরপর এই নোটিশের জবাব পেলে তা নিয়ে আলোচনা করে সিদ্ধান্ত নেওয়ার কথা। প্রয়োজনে তারা মন্ত্রণালয়ের সহায়তা নেবে। কিন্তু মাউশির এ ব্যাপারে জোরদার তত্পরতা নেই। গত তিন বছরে ৩৭৬ জন শিক্ষকের জাল সনদ ধরা পড়লেও কতজন শিক্ষকের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে এর হিসাব দিতে পারেনি মাউশি অধিদপ্তর।

এসব ব্যাপারে মাউশির পরিচালক (কলেজ ও প্রশাসন) অধ্যাপক ড. এস এম ওয়াহিদুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জাল সনদের ব্যাপারে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ও ব্যবস্থা নেয়, আমরাও নিই। শিক্ষকদের প্রথমে কারণ দর্শানো নোটিশ দেওয়া হয়। তিনি তাঁর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগের সুনির্দিষ্ট জবাব ও প্রমাণ দিতে না পারলে আমরা এমপিও বাতিল করে দিই এবং অবৈধভাবে নেওয়া টাকা ফেরত আনার জন্য আইনি প্রক্রিয়া গ্রহণ করি। ’

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ২০১৩ সালের জানুয়ারি থেকে গত বছরের ডিসেম্বর পর্যন্ত ঢাকা বিভাগে ১৩০ জন শিক্ষকের জাল সনদ ধরা পড়েছে, আর তাঁরা অবৈধভাবে সরকারের কাছ থেকে উত্তোলন করেছেন প্রায় তিন কোটি ১৮ লাখ টাকা। চট্টগ্রাম ও সিলেট বিভাগে ১৪ জন ধরা পড়েছেন, তাঁরা উত্তোলন করেছেন ৬৩ লাখ ২৯ হাজার টাকা। রাজশাহী ও রংপুর বিভাগে ১৪২ জন ধরা পড়েছেন, তাঁরা উত্তোলন করেছেন চার কোটি ৫৯ লাখ টাকা। খুলনা ও বরিশাল বিভাগে ৯০ জন শিক্ষকের জাল সনদ ধরা পড়েছে, তাঁরা উত্তোলন করেছেন তিন কোটি তিন লাখ টাকা। সব মিলিয়ে এসব শিক্ষকের কাছ থেকে ১১ কোটি ৪৪ লাখ ২৪ হাজার ৭৬০ টাকা আদায়যোগ্য বলে শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে প্রতিবেদন জমা দেওয়া হয়েছে।

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তরের পরিচালক প্রফেসর মো. মফিজ উদ্দিন আহমদ ভূঁইয়া কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘যেভাবে জাল সনদ ধরা পড়ছে তা উদ্বেগজনক। বিশেষ করে যাঁরা জাতিকে শিক্ষিত করবেন তাঁরাই যদি জাল সনদ দিয়ে চাকরি করেন তা আরো ভয়াবহ। ইতিমধ্যে আমরা প্রায় ৪০০ শিক্ষকের জাল সনদ চিহ্নিত করেছি। সনদ ইস্যুকারী প্রতিষ্ঠানই এসব সনদকে জাল বলে শনাক্ত করেছে। আমরা এসব শিক্ষকের জাল সনদের প্রমাণসহ তালিকা শিক্ষা মন্ত্রণালয়ে পাঠিয়েছে। তাঁদের  চাকরিচ্যুতি করে মামলা করা ও টাকা ফেরত নেওয়ার সুপারিশ আমরা করেছি। ’

পরিদর্শন ও নিরীক্ষা অধিদপ্তর সূত্র জানায়, শরীয়তপুর জেলার সখিপুর ইসলামিয়া উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মো. সালাউদ্দিন (ইনডেক্স নম্বর ১৬৬২৮৬) প্রায় ১০ বছর আগে এমপিওভুক্ত হলেও সম্প্রতি তাঁর জাল সনদ ধরা পড়েছে। তিনি ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের বিএ পাসের সনদ জাল করেছেন। এখন পর্যন্ত তিনি সরকারের কাছ থেকে বেতন-ভাতা বাবদ প্রায় ৯ লাখ ৭৫ হাজার টাকা নিয়েছেন। রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়ের সনদ জাল করেছেন নাটোরের লালপুরের মাজার শরিফ টেকনিক্যাল অ্যান্ড বিজনেস কলেজের শিক্ষক মো. আবুল কালাম আজাদ। ফরিদপুরের শিয়ালদী আদর্শ আলিম মাদ্রাসার শিক্ষক মো. হাসান মৃধার বেসরকারি শিক্ষক নিবন্ধন ও প্রত্যয়ন কর্তৃপক্ষের (এনটিআরসিএ) জাল সনদ দিয়ে চাকরি করেছেন। নেত্রোকোনার জনতা আদর্শ উচ্চ বিদ্যালয়ের সহকারী শিক্ষক মোহাম্মদ জাকারিয়ার এনটিআরসিএর সনদও জাল। যাচাই করা শিক্ষকের মধ্যে প্রায় ২০০ শিক্ষকেরই নিবন্ধনের সনদ জাল। এর পরের অবস্থানেই রয়েছে কম্পিউটার প্রশিক্ষণের সনদ। এর সংখ্যাও এক শর ওপরে। বগুড়ার জাতীয় কম্পিউটার প্রশিক্ষণ ও গবেষণা একাডেমিরই বেশি জাল সনদ ধরা পড়েছে। জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়ের জাল সনদধারীর সংখ্যাও কম নয়।


মন্তব্য