kalerkantho


অনিরাপদ শহর ঢাকা

সাধারণ মানুষের ডাকে সাড়া দেয় না তিতাস

আরিফুজ্জামান তুহিন   

২৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



তিতাস গ্যাস ডিস্ট্রিবিউশন অ্যান্ড ট্রান্সমিশন এলাকায় গত ১৫ মাসে পাইপলাইনে ও চুলা থেকে গ্যাস লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণে ২৬ জন নিহত হয়েছে। সর্বশেষ বনানীতে স্বামী, স্ত্রী ও তাদের দুই সন্তানসহ চারজন পাইপলাইনে গ্যাস লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণে নিহত হয়। রাজধানীতে ব্যাপকহারে এ ধরনের ঘটনা ঘটলেও নির্বিকার তিতাস কর্তৃপক্ষ। মাঝে মধ্যে তিতাস মিডিয়ায় জনসাধারণের সচেতনার জন্য বিজ্ঞাপন দিয়ে তাদের দায় সারে। তারা বলছে, ওই ধরনের দুর্ঘটনা সামাল দিতে পাঁচটি জরুরি টিম রয়েছে। প্রায় ১৭ লাখ গ্রাহকের প্রতিদিনকার সমস্যা সামাল দেওয়ার জন্য এই জনবল নিয়ে তারা হিমশিম খাচ্ছে।

জানা গেছে, ৫০ বছর আগে গ্যাস সংযোগের জন্য ঢাকায় পাইপলাইন স্থাপন করা হয়। এসব পাইপলাইনের বর্তমান পরিস্থিতি কী তা পরীক্ষা করে দেখা হচ্ছে না। ফলে বিভিন্ন স্থানে পুরনো পাইপলাইনে গ্যাস লিকেজ হচ্ছে, ঘটছে দুর্ঘটনা। সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা বলছেন, তিতাসের পাইপলাইন পুরো রাজধানীকে একটি অনিরাপদ শহরে পরিণত করেছে। সর্বশেষ বনানীতে গ্যাসের পাইপলাইন লিকেজ হয়ে বিস্ফোরণ হলে একটি বাড়ি ভয়াবহ ক্ষতিগ্রস্ত হয়। এখানেও তিতাসের অবহেলা ছিল। তিতাসের সাবেক এমডি নওশাদুল ইসলামের বিরুদ্ধে গুরুতর দুর্নীতির অভিযোগ ছিল। সর্বশেষ বনানীতে গ্যাস দুর্ঘটনায় নওশাদের বিরুদ্ধে দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগ ওঠে। এ কারণে গত রবিবার সন্ধ্যায় দুর্নীতি ও দায়িত্বে অবহেলার অভিযোগে তাঁকে তিতাসের এমডি পদ থেকে অপসারণ করা হয়।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজ সম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘তিতাসে কোনো গ্রাহকসেবা নেই। যেদিন বনানীতে গ্যাসের পাইপলাইন লিকেজ হয় ওই দিন রাত ৩টায় আমি নিজে তখনকার ব্যবস্থাপনা পরিচালক (এমডি) প্রকৌশলী নওশাদুল ইসলামকে ফোন করেছি। তখনই বলেছিলাম পাইপলাইনের গ্যাস বন্ধ করতে। অথচ ঘটনার তিন দিন পরও সেখানকার গ্যাস বন্ধ করা হয়নি। ’

নসরুল হামিদ বলেন, ‘৫০ বছরের পুরনো পাইপলাইন তিতাসের। সংস্কার করা হয়নি, কোনো গবেষণাও করা হয়নি। কী পরিস্থিতিতে এসব পাইপলাইন আছে তা সবার আগে জানা দরকার। ’

গত বছরের মাঝামাঝিতে রাজধানীর মালিবাগ এলাকার একটি বাসার গ্যাসের পাইপলাইনে লিকেজ হয়। বাড়ির সদস্যরা আতঙ্কিত হয়ে জরুরি নম্বরে ফোন করে সহায়তা চায়। এভাবে কেটে যায় সারা দিন। লিকেজ সারতে তিতাস থেকে কেউ এ সময় আসেনি। এর মধ্যে দফায় দফায় তিতাসকে অবহিত করা হয় পরিস্থিতি সম্পর্কে। সন্ধ্যা ৬টার দিকে তিতাসের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের জানানো হয় এই বাড়ির বাসিন্দা একটি পত্রিকার সম্পাদক। তাঁর নাম পরিচয় পেয়ে ৩০ মিনিটের মধ্যে এসে পাইপলাইনের লিকেজ ঠিক করে দেয় তিতাসের কর্মীরা।

জানা গেছে, তিতাসের রাজধানী এলাকায় গ্রাহক আছে ১৭ লাখ। এই বিপুল পরিমাণ গ্রাহকের জন্য জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলা ও গ্রাহকের সমস্যা সমাধানে আছে মাত্র পাঁচটি টিম। তিতাসের জরুরি টিম ব্যস্ত থাকে ভিআইপিদের সেবা দিতে, ভিআইপিদের সেবা শেষ হলে তবেই সাধারণ মানুষ সেবা পায়।

এ বিষয়ে প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ বলেন, ‘তিতাসে কোনো গ্রাহকসেবা নেই। তাদের যদি লোকবল না থাকে তাহলে আউটসোর্সিং করতে পারে। তারা সেসব করে না। শুধু তিতাসই নয়, এটি বিদ্যুৎ খাতের বিতরণ সংস্থার ক্ষেত্রেও সত্যি। আমি নিজে ঢাকা ইলেকট্রিক সাপ্লাই কম্পানির (ডেসকো) জরুরি নম্বরে ফোন করে নির্দিষ্ট লোককে পাইনি। আমাদের সেবাদানকারী প্রতিষ্ঠানগুলো জনগণের কথা মাথায় রেখে পরিচালিত হয় না। দরকার এসব প্রতিষ্ঠানকে ঢেলে সাজিয়ে জনগণের সেবা নিশ্চিত করা। ’

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাসের ভারপ্রাপ্ত এমডি মীর মশিউর রহমান গতকাল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ইতিমধ্যে মন্ত্রণালয় আমাদের নির্দেশ দিয়েছে কিভাবে গ্রাহককে আরো বেশি সেবা দেওয়া যায় তার একটি পূর্ণাঙ্গ প্রস্তাব আগামী সাত দিনের মধ্যে জমা দিতে। আমরা গ্রাহককে সর্বোচ্চ নিরাপত্তা ও সেবা দিতে চাই। এ জন্য তিতাসের জরুরি টিম বাড়ানো হবে। বাড়ানো হবে লোকবলও। ’

জানা গেছে, গ্যাস সরবরাহের জন্য যে পাইপলাইন স্থাপন করা হয় সেটিকে রক্ষার জন্য ক্যাথডিক প্রটেকশন (Cathodic protection) ব্যবহার করা হয়। ক্যাথডিক প্রটেকশন পাইপের বাইরের অংশকে ছিদ্র ও ক্ষয় হওয়া থেকে রক্ষা করে। কিন্তু সম্প্রতি নিম্নমানের ক্যাথডিক প্রটেকশন ব্যবহারের অভিযোগ পাওয়া গেছে। তিতাসের কিছু অসাধু কর্মকর্তার যোগসাজশে তিতাসের ঠিকাদাররা কমদামের এসব ক্যাথডিক প্রটেকশন ব্যবহার করছেন। আর গ্যাস সম্প্রসারণের এসব নতুন এলাকায় সম্প্রতি বড় বড় দুর্ঘটনা ঘটেছে। গত মাসে বনানীতে দম্পত্তিসহ একই পরিবারের চারজন গ্যাস বিস্ফোরণে দ্বগ্ধ হয়ে মারা গেছেন। এ অঞ্চলে নিম্নমানের পাইপলাইন স্থাপনের অভিযোগ থাকার পরও সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারের কোনো শাস্তি হয়নি।

শুধু নিম্নমানের পাইপলাইন নয়—মানহীন চুলার কারণেও ঘটছে বড় বড় দুর্ঘটনা। বাজারে ৭০০ টাকা থেকে শুরু করে সাত হাজার টাকার চুলা রয়েছে। এসব চুলার প্রস্তুতকারী অধিকাংশ প্রতিষ্ঠানের অনুমোদন নেই। এসব চুলা গ্যাস অপচয় করে আবার চুলা থেকে গ্যাস বের হয়ে যাওয়ারও উদাহরণ আছে। যখন কেউ ঘরে আগুন জ্বালায় তখনই পাইপ থেকে বের হওয়া গ্যাসে বিস্ফোরণ ঘটে। চুলার মান নিয়ন্ত্রণে তিতাসের নজরদারি থাকার কথা থাকলেও বাস্তবে তিতাস এসব নজরদারি করে না।

নিম্নমানের চুলা ও পাইপলাইনের কারণে তিতাস এলাকায় গ্যাস-সংক্রান্ত দুর্ঘটনা বেড়েছে। গত ১৫ মাসে শুধু রাজধানীতে গ্যাস সংযোগ থেকে সৃষ্ট দুর্ঘটনা থেকে আগুনে দগ্ধ হয়ে নারী, শিশুসহ ২৬ জন নিহত হয়েছে। এ সময় দেড় শতাধিক মানুষ আহত হয়।

নিম্নমানের পাইপলাইনের বিষয়ে তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী আলী আশরাফ বলেন, ‘নিম্নমানের পাইপলাইন স্থাপন হয়েছে কোথাও কোথাও। আমরা এসব এলাকায় আবার পাইপলাইন স্থাপনের উদ্যোগ নিয়েছি। ’

এক প্রশ্নের জবাবে আলী আশরাফ বলেন, ‘চুলার মানের বিষয়টি আসলে আমাদের দেখার কথা। কিন্তু আমরা সেটি দেখতে পারি না। ফলে বাজারে নানা ধরনের চুলা পাওয়া যায়।

নিরাপত্তার জন্য এলপি গ্যাসের ওপর জোর দেওয়ার আহ্বান : সরকার বাসাবাড়িতে নতুন করে গ্যাস সংযোগ না দেওয়ার পক্ষে। গ্যাসের মজুদ দ্রুত ফুরিয়ে আসার কারণে শুধু শিল্পকারখানায় ব্যবহারের জন্য গ্যাস সংরক্ষিত রাখতে চায় সরকার। পাইপলাইনে গ্যাসের ব্যবহার বন্ধ করে সরকার এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়াতে চায়। এলপি গ্যাসের ব্যবহার বাড়ানো গেলে এ রকম দুর্ঘটনারও শিকার হবে না জনগণ এমনটি মনে করেন সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা।

ব্যাপকহারে এলপি গ্যাস ব্যবহারে উদ্বুদ্ধ করতে এ গ্যাসের দাম আরো কিভাবে কমানো যায় তা নিয়ে ভাবছে সরকার। সরকারি ব্যবস্থাপনার পাশাপাশি বেসরকারি প্রতিষ্ঠানগুলোর এলপি গ্যাসে কিভাবে ভর্তুকি দেওয়া যায় তা নিয়ে সরকার কাজ করছে।


মন্তব্য