kalerkantho


হামলা-হুমকি, আতঙ্কে প্রার্থী ও ভোটাররা

নিখিল ভদ্র ও কৌশিক দে, খুলনা থেকে   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হামলা-হুমকি, আতঙ্কে প্রার্থী ও ভোটাররা

‘আমরা বড় বিপদের মধ্যি আছি, পুরুষরা কেউ বাড়িতে নাই। কেউ এলাকায় থাকতি পারছে না। গত রাইতেও (রবিবার রাত) হুমকি-দমকি দিয়ে গ্যাছে, কয়েক জনরে মারছে। ওরা অশ্লীল ভাষায় গালিগালাজ করছে, বলছে চশমা মার্কার লোকজন ভোটকেন্দ্রে গেলে নিচিহ্ন কইরে দেবে। যে অবস্থা দাঁড়াইছে তাতে তো দেশ ছাড়তে হবে। ’ ক্ষোভ ও কষ্টের কথাগুলো খুলনার ডুমুরিয়ার উপজেলার শরাফপুর ইউনিয়নের ঝালতলা গ্রামের সমরেশ মণ্ডলের স্ত্রী অঞ্জলী রায়ের। তবে এ অবস্থা শুধু এ গ্রামেই নয়, ডুমুরিয়ার বিভিন্ন এলাকায় আজকের ভোটকে কেন্দ্র করে হিন্দু সম্প্রদায়সহ সাধারণ মানুষের মধ্যে আতঙ্ক বিরাজ করছে। তাদের অভিযোগ, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ও তাঁদের সমর্থকদের বিরুদ্ধে।

শরাফপুর ইউনিয়ন ঘুরে জানা গেছে, উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নূরউদ্দিন আল মাসুদ (নৌকা), জেলা ছাত্রলীগের সাবেক নেতা ও বর্তমান চেয়ারম্যান রবিউল ইসলাম রবি (চশমা), বিএনপি মনোনীত হেমায়েত রশিদ খানসহ (ধানের শীষ) এ ইউনিয়নের চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন পাঁচজন। তবে ভোটাররা বলছেন, মূল প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে রবিউল ইসলাম রবি ও নূরউদ্দিন আল মাসুদের মধ্যে।

অভিযোগ উঠেছে, নির্বাচনী প্রচারের শেষ মুহূর্তে সহিংস হয়ে উঠেছে এ ইউনিয়নের নির্বাচন। এরই ধারাবাহিকতায় রবিবার রাতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থীর সমর্থকরা বসুন্দিয়াডাঙ্গা, উত্তর ও দক্ষিণ কালিকাপুর, সেনপাড়া নতুন রাস্তা মোড়ে রবির ক্যাম্প ভাঙচুর ও তার সমর্থকদের মারধর করে। এ ঘটনায় বেশ কয়েকজন আহত হয়েছে। অনেকে এখন ভয়ে বাড়িতে ফিরতে পারছে না।

ঝালতলা গ্রামের তুষার মণ্ডল, বাসন্তী মণ্ডল, কৌশলা মণ্ডলসহ অন্যরা বলেন, ‘আমাদের ভোটকেন্দ্রে না যেতে হুমকি দেওয়া হচ্ছে। কিন্তু নির্বাচন এলেই কেন আমরা হামলা-হুমকির শিকার হব?’

তবে ডুমুরিয়া থানার ওসি তাজুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ঘটনা শুনে আমরা সেখানে গিয়েছিলাম। তবে এখনো (গতকাল সন্ধ্যা) পর্যন্ত কেউ কোনো অভিযোগ দেননি। অভিযোগ পেলে সে অনুযায়ী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, নির্বাচনে মনোনয়নপত্র জমার সময় পথে পথে যেভাবে বাধার সৃষ্টি হয়েছিল ঠিক একইভাবে শেষ মুহূর্তে খুলনা, সাতক্ষীরা ও বাগেরহাটে বিভিন্ন স্থানে সংঘাত ও সংঘর্ষ ছড়িয়ে পড়েছে। অভিযোগ রয়েছে, বিভিন্ন স্থানে সরকারদলীয় প্রার্থীরা প্রতিদ্বন্দ্বীদের অফিস ভাঙচুর করেছে ও নির্বাচনী অফিসে আগুন দিয়েছে। কোথাও টাকা দিয়ে ভোট কেনার চেষ্টাও হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিরা জানান, পাইকগাছা উপজেলার সোলাদানা ইউনিয়নে বাড়িতে হামলা চালিয়ে চেয়ারম্যান প্রার্থী ইয়ামিন আখতার সোমাকে কুপিয়ে জখম করেছে দুর্বৃত্তরা। তিনি ওই ইউনিয়নে বিএনপি নেতা এনামুল হকের স্ত্রী। এনামুল হকের অভিযোগ, তাঁকে হত্যার উদ্দেশ্যেই তাঁর বাড়িতে হামলা হয়েছিল।

 

এর আগে দাকোপ উপজেলার কৈলাশগঞ্জ ইউনিয়নে ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থীর ওপর হামলা হয়েছে। ডুমুরিয়া উপজেলার ধামালিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের চেয়ারম্যান প্রার্থীর নির্বাচনী কার্যালয়ে অগ্নিসংযোগ করে দুর্বৃত্তরা। উপজেলার রুদাঘরা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিদ্রোহী প্রার্থীর সমর্থকদের মধ্যে হাতাহাতি ও মারামারির ঘটনা ঘটেছে। হুমকি দেওয়া হয়েছে ডুমুরিয়ার গুটুদিয়া ইউনিয়নের চেয়ারম্যান প্রার্থী সিপিবি নেতা শিশির ফৌজদারকে।

প্রথম দফা ভোটের আগের দিন গতকাল সাতক্ষীরার বিভিন্ন ইউনিয়নে সংঘর্ষ ও হুমকির ঘটনা ঘটেছে। বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অভিযোগ আওয়ামী লীগ প্রার্থীর সমর্থকদের বিরুদ্ধে। আশাশুনির প্রতাপনগর ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী খালিদুর রহমান বাবু জানান, তাঁর এলাকার ৯টি নির্বাচনী অফিসে ভাঙচুর চালিয়ে আগুন দিয়েছে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শেখ জাকির হোসেন ও তাঁর সহযোগীরা। চাকলা, শুভদ্রাকাটি, রুইয়ের বিল, প্রতাপনগর, তালতলা, দীঘলারাইটসহ বিভিন্ন স্থানে বোমাবাজি করে আতঙ্ক সৃষ্টি করেছে জাকিরের লোকজন। প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের পোস্টার ও ব্যানার ছিঁড়ে ফেলা হয়েছে। আশাশুনির খাজরা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা রুহুল কুদ্দুসের বাড়িতে ভাঙচুর চালানো হয়েছে।  

কালীগঞ্জের কৃষ্ণনগর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী মোস্তফা কবিরুজ্জামান মন্টু জানান, তাঁর নির্বাচনী অফিসের পেছনে মুখোশধারী লোকজন এসে পর পর কয়েকটি বোমার বিস্ফোরণ ঘটিয়েছে। শ্যামনগরের বৈকারী ইউনিয়নের আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের যুগ্ম সাধারণ সম্পাদক আব্দুর রউফ জানান, আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আসাদুজ্জামানের ছেলে ইনজামামুল হকের নেতৃত্বে তাঁর বাড়িতে কয়েকটি ককটেল বিস্ফোরণ ঘটানো হয়েছে। কলারোয়ার দিয়াড়া ইউনিয়ন বিএনপির সভাপতি ইব্রাহীম হোসেন জানান, আওয়ামী লীগের নেতাকর্মীরা তাঁর প্রচার মাইক বের করতে দেয়নি। দুই দফা ভাঙচুর করা হয়েছে। টাকা দিয়ে ভোট কিনতে গিয়ে তালা উপজেলার খলিলনগর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী আজিজুর রহমান রাজুর পাঁচ কর্মী জনরোষের শিকার হয়েছে।

বাগেরহাটের শরণখোলায় বিএনপি, আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীসহ পাঁচ প্রার্থী অভিযোগ করেছেন, নৌকা প্রতীকের প্রার্থীরা তাঁদের ভয়ভীতি প্রদর্শন ও হুমকি দিচ্ছেন।

তবে অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে বলে দাবি করেছেন বাগেরহাট জেলা প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর আলম।


মন্তব্য