kalerkantho

রবিবার। ২২ জানুয়ারি ২০১৭ । ৯ মাঘ ১৪২৩। ২৩ রবিউস সানি ১৪৩৮।


শেষ থাবা সদস্য প্রার্থীদের ওপর!

তৌফিক মারুফ, রফিকুল ইসলাম ও এস এম মঈনুল, বরিশাল থেকে   

২২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



শেষ থাবা সদস্য প্রার্থীদের ওপর!

‘শ্যাষ থাবাডা মারছে আমাগো ওপরে; এহন আমাগো হিসাব পাল্ডাইয়া যাইবে। আমাগো অনেক ভোটার উল্টাপাল্ডা অইয়া যাইবে। ’ বরিশাল সদরের চরবাড়িয়া ইউনিয়নের লামচড়ি এলাকার মেম্বার বা সদস্য পদে এক প্রার্থী এভাবেই জানালেন আজ মঙ্গলবারের ভোট নিয়ে নিজের আশঙ্কার কথা।

এত দিন প্রভাবশালী চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের নজর ছিল মূলত নিরীহ ভোটার কিংবা প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থীদের ওপর। ভোট চাওয়া থেকে শুরু করে প্রয়োজনমতো ভয়ভীতি দেখানো কিংবা হামলা—সব কিছুই চলত তাঁদের ঘিরে। তবে ভোটের ঠিক আগের দিন ওই নজর আরো সম্প্রসারিত হয়ে গিয়ে পড়েছে ওয়ার্ড সদস্য পদপ্রার্থীদের ওপরও। বিশেষ করে ভোটকেন্দ্রের আশপাশে সদস্য পদপ্রার্থীদের বিশেষ সহায়তা ক্যাম্প অভিনব কৌশলে দখলে নেওয়ার চেস্টা শুরু হয়। একই সঙ্গে ভোটকেন্দ্রের ভেতর সদস্য পদপ্রার্থীর এজেন্টরাও যাতে নির্দিষ্ট চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর পক্ষে থাকেন তা নিশ্চিত করতে কাজে লেগে গেছে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীর লোকেরা। আর বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই নৌকা প্রতীকের পক্ষের লোকজন এমন তত্পরতা চালাচ্ছে বলে গতকাল সোমবার দিনভর অভিযোগ করেন বিভিন্ন নির্বাচনী এলাকার মেম্বর পদপ্রার্থী।

পরিস্থিতি আরো খোলামেলাভাবে ব্যাখ্যা করে বরিশালের মেহেন্দিগঞ্জ উপজেলার একটি ওয়ার্ডের এক সদস্য পদপ্রার্থী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সকালে আমার কর্মীরা ক্যাম্প বানাইতে গ্যালে নৌকা মার্কার কর্মীরা আইয়া অর্ডার দেয়, আমাগো ক্যাম্পে নৌকা মার্কার পোস্টার লাগাইতে অইবো, নাইলে ক্যাম্প বওয়ান যাইবো না। আবার আমার এজেন্টরাও বুথের মধ্যে যাতে নৌকার পক্ষে কাম করে হেইডাও কইয়া গেছে। ’

বাউফলের নওমালা ইউনিয়নের সদস্য পদে একাধিক প্রার্থীও একই রকম পরিস্থিতির কথা জানান। এক প্রার্থী বলেন, ‘নৌকার কর্মীরা নির্দেশ দিয়া গেছে, মেম্বররা যেন বুথের ভেতরে বিএনপির বা বিদ্রোহী প্রার্থীর কোনো সমর্থককে এজেন্ট হিসেবে না বসায়। আর বাইরের ক্যাম্পে মেম্বর প্রার্থীর নমুনা ব্যালটের বদলে যেন নৌকার প্রার্থীর নমুনা ব্যালট ধরিয়ে দেওয়া হয়। ’

একই রকম খবর পাওয়া যায় বরগুনার বেতাগী, বরিশালের সদর, মেহেন্দিগঞ্জ, বাবুগঞ্জ ও গৌরনদী উপজেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন থেকে। তবে কোথাও কোথাও আওয়ামী লীগের প্রভাবশালী বিদ্রোহী প্রার্থীদের পক্ষ থেকেও সদস্য পদপ্রার্থীদের প্রতি এমন নির্দেশনা দেওয়া হচ্ছে। ফলে অনেক এলাকায়ই সদস্য পদপ্রার্থীরা নিজেদের কোনো সহায়তা ক্যাম্প না সাজিয়ে বরং কেবল সাধারণ দু-একটি চেয়ার-টেবিল দিয়ে কাজ করার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন। আবার কেউ কেউ তাও সাজাবেন না ভয়ে।

বরিশাল সদর উপজেলার চরকাউয়া এলাকার একটি ওয়ার্ডের সদস্য পদে এক প্রার্থী বলেন, ‘আমি তো সব দলের মানুষেরই ভোট পামু, এহন যদি আমি প্রকাশ্যে নৌকার পোস্টার লাগাই বা নৌকার পক্ষে কাম করি তাইলে তো অন্য দলের সমর্থকরা আমারে ভোট দিব না। আবার নৌকার পক্ষে কাম না করলেও সমস্যা অইবো। এহন যে কী বিপদে পড়লাম কইয়া বুজাইন্যা যাইবো না!’

এদিকে উজিরপুর উপজেলার জল্লা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী ও বিদায়ী চেয়ারম্যান উর্মিলা বাড়ৈ অভিযোগ করে বলেন, ‘স্থানীয় কাজিশা, দক্ষিণ মুন্সির তালুক ও বিলগাববাড়ী এলাকার কেন্দ্রগুলোতে আমার পক্ষে কোনো পোলিং এজেন্ট যাতে না থাকে সে জন্য নৌকার মার্কার প্রার্থীর পক্ষ থেকে ভয়ভীতি দেখানো হচ্ছে। ফলে আমার কর্মীরাই এজেন্ট হয়ে কেন্দ্রে যেতে চাচ্ছে না। ’ বরগুনার বেতাগী উপজেলার বিবিচিনি ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আনিসুর রহমান অভিযোগ করে বলেন, ‘তালগাছিয়া, দেশান্তরকাঠিসহ ৩ নম্বর ওয়ার্ডে আমার পূর্বনির্ধারিত এজেন্টরা হঠাৎ করেই গা ঢাকা দিয়েছেন। সরকারদলীয় প্রার্থীর লোকজন ভয়ভীতি দেখিয়ে এলাকাছাড়া করেছে তাদের। ’

বিদ্রোহী প্রার্থীর বাসায় হামলা : গতকাল সোমবার বিকেলে বরিশালের বানারীপাড়া সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী আবুল কালাম আজাদের বাসায় পোলিং এজেন্টদের তালিকা প্রস্তুত ও ফরম পূরণ করার সময় নৌকা মার্কার প্রার্থীর পক্ষের একদল কর্মী সেখানে হামলা চালিয়ে সব কাগজপত্র ছিনিয়ে নিয়ে গেছে এবং বাসা ভাঙচুর করেছে। প্রার্থী আবুল কালাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমি যাতে কেন্দ্রে কেন্দ্রে এজেন্ট দিতে না পারি সে জন্য এ ঘটনা ঘটানো হয়েছে বলে ধারণা। ’

বেতাগী সদরে চেয়ারম্যান পদে স্বতন্ত্র প্রার্থী তারিকুল আলম বাবু অভিযোগ করে বলেন, ‘গেল রাত থেকে পাঁচটি কেন্দ্রের জন্য দায়িত্ব দেওয়া আমার এজেন্টদের ভয়ভীতি দেখানো হয়েছে। এখন এসব কেন্দ্রে বিভিন্ন বুথে এজেন্ট যেতে রাজি হচ্ছে না। কেউ কেউ মোবাইল ফোন বন্ধ করে রেখেছে। কেউ বা এলাকার বাইরে চলে গেছে। ’

‘সরে না দাঁড়িয়ে উপায় পেলাম না’ : এদিকে চাখারে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সৈয়দ মজিবুল হক টুকু গতকাল সন্ধ্যায় হঠাৎ করেই বাসা থেকে বেরিয়ে বিভিন্ন এলাকা ঘুরে ঘুরে ভোট থেকে সরে দাঁড়ানোর ঘোষণা দেন। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এত দিন অনেক চাপ সহ্য করেই টিকে ছিলাম। কিন্তু শেষ দিনে এসে এমন অবস্থায় পড়েছি যাতে সরে না দাঁড়িয়ে আর কোনো উপায় পেলাম না। ’

এর আগে দুপুরে ওই প্রার্থী জানান, ভোরে পুলিশ চাখারের বিভিন্ন এলাকায় তাঁর সক্রিয় কর্মীদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে অভিযান চালিয়েছে। পরিস্থিতির মুখে কর্মীরা গা ঢাকা দিয়েছে। তিনি নিজেও আতঙ্কে নিজ বাসা ছেড়ে অন্যত্র আশ্রয় নিয়েছিলেন।

পুলিশের হাঁকডাক : গতকাল বরিশাল বিভাগের বিভিন্ন এলাকায় যখন এমন ঘটনা ঘটছিল আর সেসবের খবর আসছিল সংবাদকর্মীদের কাছে তখন পুলিশের বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. হুমায়ূন কবীর এক প্রেস ব্রিফিংয়ে জোর গলায় বলেন, ভোটারদের শঙ্কামুক্তভাবে ভোট দেওয়া নিশ্চিত করতে প্রয়োজনীয় সব ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। তবে যারা নির্বাচনী পরিবেশ নষ্ট করে ভোটারদের মনে শঙ্কা তৈরির মতো পরিস্থিতি করতে পারে তাদের ব্যাপারে যেকোনো তত্পরতাই হতে পারে।

ডিআইজি হুমায়ুন কবির জানান, রেঞ্জের ৪২টি থানার মধ্যে তালতলীতে নির্বাচন হচ্ছে না। অন্য ৪১টি থানার ২৫৮টি ইউনিয়ন পরিষদের দুই হাজার ৪৩৯টি কেন্দ্রে প্রথম ধাপে আজ নির্বাচন অনুষ্ঠিত হবে। অবাধ সুষ্ঠু ও নিরপেক্ষভাবে ভোটদানের জন্য আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীর ৫৩ হাজার ৩২০ জন দায়িত্ব পালন করবেন। এর মধ্যে বিজিবির এক হাজার ২১৩, র‌্যাবের ৪৩০, আনসারের ৩৮ হাজার ৬৪৪ এবং পুলিশের ১৩ হাজার ৩৬ সদস্য থাকছেন। প্রতিটি কেন্দ্রে ২০ জন নিরাপত্তাকর্মী থাকবেন, যাঁদের মধ্যে সাতজন অস্ত্রধারী।


মন্তব্য