kalerkantho


কার গাফিলতিতে নিঃস্ব হলাম?

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘অনেক কষ্ট করে কোটি টাকা দিয়ে ২০০৬ সালে বনানীর ২৩ নম্বর রোডের ৯ নম্বরে একটি ফ্ল্যাট কিনেছি। সেই ফ্ল্যাটের অর্থ জোগাড় করতে নিজের গয়নাও বিক্রি করতে হয়েছে। কিন্তু এক মুহূর্তের ধ্বংসলীলায় এখন নিঃস্ব হয়ে গেলাম। ভয়াবহ এ ঘটনা কেন ঘটল, কার গাফিলতি বা দোষে ঘটেছে জানি না। তবে আমরা ক্ষতিপূরণ চাই। ’ এভাবেই কথাগুলো বলছিলেন রাজধানীর বনানীতে ছয় তলা ভবনে গ্যাসের বিস্ফোরণে ধসে পড়া ভবনের সি-২ ফ্ল্যাটের মালিক কামরুন্নেছা নামের একজন বাসিন্দা। তিনি কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুর্ঘটনার পর বর্তমানে আমরা এক নিকটাত্মীয়ের বাসায় উঠেছি। আমরা চাই দ্রুত এ বিষয়ে একটি সমাধান হোক। ’

কামরুন্নেছা আরো বলেন, “ঘটনার সময় আমরা ভবনের বাসিন্দারা ছাদে আশ্রয় নিয়েছিলাম। মেয়র আনিসুল হক সময়মতো এসে আমাদের উদ্ধার করেছেন। তিনি পাশের একটি ভবনে উঠে আমাদের বারবার আশ্বস্ত করছিলেন; ‘আপনারা ভয় পাবেন না’ আমরা এখন সব ঠিকঠাক করে ফেলব। আশা করছি তিনি আমাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি দেখবেন। ”

বনানীর এই ভবনের ১৩ কাঠা জমির মালিক ছিলেন সামসুল আলম। তিনি ভবনের পূর্ব পাশের পাঁচ তলার এ-৪ ফ্ল্যাটে পরিবার নিয়ে বসবাস করেন। তিনি বলেন, ‘আমার এ জমির ওপর এস্যাট ডেভেলপার ভবন তৈরি করেছে। সেখানে ১০টি ফ্ল্যাট আমি পেয়েছি। এর মধ্যে চারটি বিক্রি করেছি। বাকি ছয়টি আমার আছে। ’

সামসুল আলম বলেন, ‘আমাদের ক্ষতিপূরণের বিষয়টি নিয়ে কোনো কূলকিনারা হচ্ছে না। আমরা মেয়র আনিসুল হকের সঙ্গে যোগাযোগ করব। তিনি আমাদের ক্ষতিপূরণ পাওয়ার ক্ষেত্রে ব্যবস্থা নেবেন বলে আমরা আশাবাদী। এ ছাড়া এস্যাটের পক্ষ থেকে লোকজন এসেছিল। আমরা প্রতিষ্ঠানটির চেয়ারম্যানের সঙ্গে দেখা করব। এ ঘটনায় আমার ছেলে নাবিল ইমতিয়াজ আহত হয়ে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন রয়েছে। বিস্ফোরণের ফলে অনেক মালামালের ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে। এখন নতুন করে ভবন নির্মাণ করা হলে আমাদের বর্তমান হিসাবে অর্থ ও মালিকানা দিতে হবে। ’

বনানীর এই ভবনের কয়েকটি তলার বিভিন্ন অংশ পুড়ে গেছে। সেখানে আসবাব ও অন্যান্য জিনিসের ধ্বংসাবশেষ পড়ে আছে। আর যেসব প্রয়োজনীয় জিনিস অক্ষত রয়েছে তা ভবনের বাসিন্দরা সরিয়ে নিচ্ছে। ভবটির জানালার কাচ, গ্রিল, মেঝের টাইলস, দেয়ালের ইট, সুরকি লিফটের স্টিলের দরজাগুলোর ব্যাপক ক্ষয়ক্ষতি হয়েছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) চেয়ারম্যান প্রকৌশলী জি এম জয়নাল আবেদিন ভূঁইয়া বলেন, ‘এখানে বিস্ফোরণের ঘটনায় ফ্ল্যাট মালিকদের ওপর কোনোভাবে দায় আসার সুযোগ নেই। সরকারি যে প্রতিষ্ঠান উন্নয়ন কাজ করছে তাদের ঠিকাদার প্রতিষ্ঠানকে জরিমানার আওতায় এনে ফ্ল্যাট মালিকদের ক্ষতিপূরণ দেওয়া যেতে পারে। ’

জানা যায়, বনানীর এই ভবন ২০০৬ সালে নির্মাণ করে এস্যাট ডেভেলপার লিমিটেড। সেখানে ২০টি ফ্ল্যাটের মধ্যে ১৩টি বিভিন্ন ব্যক্তি ক্রয় করেছেন। সেখানে ২২০০ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাট ক্রয় করতে এক কোটি ১৫ লাখ টাকা লেগেছে। আর ১৪৮৫ বর্গফুটের একটি ফ্ল্যাটের মূল্য ছিল ৭৫ লাখ টাকা।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে রিয়াল এস্টেট অ্যান্ড হাউজিং অ্যাসোসিয়েশন অব বাংলাদেশের (রিহ্যাব) সহসভাপতি লিয়াকত আলী বলেন, ‘বনানীর এ ঘটনায় ভবন নির্মাণকারী প্রতিষ্ঠানের কোনো গাফিলতি আছে বলে আমার মনে হয় না। তাই সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠান থেকে ক্ষতিপূরণ দেওয়ার বিষয়টিরও যৌক্তিক কোনো কারণ থাকতে পারে না। এখানে যারা উন্নয়নকাজ করেছে তারাই ক্ষতিপূরণ দেবে। ’

এ ঘটনায় ফায়ার সার্ভিস অ্যান্ড সিভিল ডিফেন্স তিন সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। এ ছাড়া পেট্রোবাংলাও চার সদস্যের একটি তদন্ত কমিটি গঠন করেছে। সাত দিনের মধ্যে তদন্ত প্রতিবেদন জমা দেবে। রাজউকের পক্ষ থেকেও ভবনটির সার্বিক বিষয় পরীক্ষা-নিরীক্ষা করে মত দেওয়ার জন্য বুয়েটের বিশেষজ্ঞদের দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে বলে জানা গেছে।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে তিতাসের পরিচালক (অপারেশন) প্রকৌশলী এইচ এম আলী আশরাফ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখন পর্যন্ত কোনো সিদ্ধান্তে পৌঁছাতে পারিনি। তিতাসের এ অঞ্চল খুঁড়লেই প্রকৃত কারণ জানা যাবে। কিন্তু এখই অঞ্চল খোঁড়া সম্ভব হচ্ছে না। কারণ আলামত নষ্ট হয়ে যেতে পারে। তাই প্রকৃত কারণ জানতে আরো কিছু সময় অপেক্ষা করতে হবে। আর তখনই ক্ষতিপূরণের বিষয়টি বোঝা যাবে। ’


মন্তব্য