kalerkantho


বিদ্রোহী তোপে বিপাকে নৌকা সুবিধায় বিএনপি-জামায়াত

নিখিল ভদ্র ও মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা থেকে   

২১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিদ্রোহী তোপে বিপাকে নৌকা সুবিধায় বিএনপি-জামায়াত

নির্বাচন নিয়ে কথা বলতে আগ্রহীর সংখ্যা নিতান্তই কম। জনমনে একরাশ ভীতি পক্ষ-বিপক্ষের নানা হিসাব কষে।

উচ্ছ্বাস নেই প্রার্থী ও কর্মীদের মধ্যেও। হামলা ও হয়রানির অভিযোগ একের বিরুদ্ধে অন্যের। সাতক্ষীরা জেলার ৭৮টি ইউনিয়ন পরিষদে এসব নিয়েই অনুষ্ঠিত হতে যাচ্ছে নির্বাচন। সরেজমিনে ঘুরে ও সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, নির্বাচন নিয়ে শঙ্কায় আছে সবাই। একই এলাকায় ক্ষমতাসীন দলের একাধিক নেতা প্রার্থী হওয়ায় আতঙ্কের মাত্রা বেড়েছে কয়েক গুণ। নির্বাচনপূর্ব পরিবেশ উত্তপ্ত হয়ে আছে তাঁদের বিরোধ ঘিরেই। আওয়ামী লীগ ছাড়া অন্য রাজনৈতিক দলে নেই বিদ্রোহী প্রার্থী, সে কারণে বিএনপি ও জামায়াত সমর্থিত প্রার্থীরা কিছুটা সুবিধাজনক অবস্থানে রয়েছেন ভোটের মাঠে। চারটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে জামায়াতের ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থীকে সমর্থন জানিয়েছে বিএনপি। আর সেখানেও রয়েছেন আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী।

সাতক্ষীরা জেলায় মোট ৭১৬টি ভোটকেন্দ্রের নির্বাচন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ করতে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী এরই মধ্যে নিয়েছে বিভিন্ন উদ্যোগ। গতকাল রবিবার বিকেলে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে পুলিশ সুপার চৌধুরী মঞ্জুরুল কবীর বলেন, ‘পরাজয়ের আশঙ্কা থেকে কোনো কোনো চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী সংঘর্ষে লিপ্ত হচ্ছেন। আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির অবনতির চেষ্টা করছেন। কিন্তু আইনশৃঙ্খলা বাহিনী সতর্ক রয়েছে। ভোটাররা নির্বিঘ্নে ভোট দিতে পারবেন। ’

গতকাল সাতক্ষীরা-শ্যামনগর সড়কের পাশে কুলিয়া ব্রিজের আগে দেখা যায় আওয়ামী লীগ প্রার্থীর নির্বাচনী অফিস। নৌকার প্রার্থী মো. আছাদুল হক মোবাইল ফোনে ব্যস্ত হয়ে কথা বলছিলেন বিভিন্নজনের সঙ্গে। পৌরসভার লাগোয়া দেবহাটা উপজেলার কুলিয়া ইউনিয়নে তিনবার নির্বাচিত চেয়ারম্যান ছিলেন আওয়ামী লীগের এ নেতা। নৌকা প্রতীকের প্রভাবশালী এ প্রার্থীর বিরুদ্ধে বিএনপি-জামায়াতের কেউ না দাঁড়ালেও ‘স্বতন্ত্র’ প্রার্থী হয়েছেন একসময়ের ঘনিষ্ঠজন মো. ইমাদুল ইসলাম। তিনি প্রতীক পেয়েছেন আনারস। আছাদুল হক অভিযোগ করে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থীর পক্ষ নিয়ে পুলিশ কাজ করছে। সমর্থক ও কর্মীদের ওপর নির্যাতন চলছে, মিথ্যা মামলা দিয়ে হয়রানি করা হচ্ছে। ’ ইমাদুল ইসলাম এ অভিযোগ প্রসঙ্গে বলেন, ‘আছাদুল-যুগের অবসান ঘটাতে এলাকাবাসী আমাকে নির্বাচনে নামিয়েছে। তার দাপটে ঠিকমতো প্রচার চালাতে পারছি না। লোকজনের বাড়িতে গিয়ে তারা হুমকি দিচ্ছে। তিনিই ভীতি সঞ্চার করে বেড়াচ্ছেন, আবার অপপ্রচার চালাচ্ছেন। ’ প্রায় অভিন্ন অভিযোগ ও পাল্টা অভিযোগ সাতক্ষীরা জেলার সাতটি উপজেলার ৭৮টি ইউনিয়নে। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীদের মূল চ্যালেঞ্জ বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই ‘বিদ্রোহী প্রার্থী’। আর এতেই সুবিধাজনক স্থানে বিএনপি-জামায়াতের প্রার্থীরা। এ জেলায় ৬৬টি ইউনিয়নে বিএনপি চেয়ারম্যান পদে ধানের শীষ প্রতীকে প্রার্থী দিয়েছে আর চারটি ইউনিয়নে জামায়াতকে সমর্থন দিয়েছে। জেলায় মোট ১৬টি ইউনিয়নে ‘স্বতন্ত্র প্রার্থী’ হিসেবে নির্বাচনী লড়াইয়ে নেমেছেন জামায়াত নেতারা।

এলাকাবাসী ও রাজনৈতিক নেতারা জানিয়েছেন, ভোটের আগেই যে ধরনের আতঙ্ক তৈরি হয়েছে তাতে ভোটকেন্দ্রে উপস্থিতি কম হতে পারে। নির্বাচন-পরবর্তী বিড়ম্বনার কথা বিবেচনায় অনেককে আবার বাধ্য হয়ে কেন্দ্রে উপস্থিত থাকতে হবে। মূলত উচ্ছ্বাস নয়, আতঙ্ক নিয়েই ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচন হতে যাচ্ছে। প্রায় প্রতিদিনই ঘটছে অপ্রীতিকর ঘটনা ও সংঘর্ষ। শুক্রবার রাতে আশাশুনি উপজেলার প্রতাপনগর ইউনিয়নে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী শেখ জাকির হোসেনের সমর্থকদের সঙ্গে সংঘর্ষ হয়েছে ‘বিদ্রোহী’ খালিদুর রহমান বাবুর কর্মীদের। দুই পক্ষের নির্বাচনী অফিস ভাঙচুরসহ হাতবোমার বিস্ফোরণ ঘটলে এলাকায় আতঙ্ক ছড়িয়ে পড়ে। শ্রীউলা ইউনিয়নের সাবেক চেয়ারম্যান প্রবীণ আওয়ামী লীগ নেতা নুর মোহাম্মদ সরদার ঘোড়া প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন। এখানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী আবু হেনা সাকিলের কর্মীরা তাঁর সমর্থকদের মারধর ও নাজেহাল করছে বলে অভিযোগ করেন। নির্বাচনী সহিংসতায় শনিবার রাতে তালা উপজেলার ধানদিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী সন্তোষ কুমার বিশ্বাস মারাত্মক জখম হয়েছেন। কলারোয়া উপজেলার কয়লা ইউনিয়নের স্বতন্ত্র প্রার্থী উপজেলা ছাত্রলীগ সভাপতি ইমরান হোসেনের অভিযোগ, নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মহিদুর রহমানের লোকজনের হুমকিতে প্রচারণা বন্ধ করে দিতে হয়েছে। ওয়ার্কার্স পার্টির প্রার্থী মাস্টার আব্দুর রউফ অভিযোগ করেন একই প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

তালা উপজেলার খেশরা ইউনিয়নে নৌকার প্রার্থী রাজীব হোসেনের বিরুদ্ধে আনারস প্রতীকে লড়ছেন দলীয় বিদ্রোহী মুর্শিদা পারভিন পাপড়ি। আশাশুনি উপজেলার খাজরা ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান মুক্তিযোদ্ধা রুহুল কুদ্দুস লড়ছেন ঘোড়া প্রতীক নিয়ে। এখানে নৌকা প্রতীক পেয়েছেন শাহনেওয়াজ ডালিম। একই উপজেলার আনুলিয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আলমগীর আলম লিটন। সেখানে আনারস প্রতীক নিয়ে লড়ছেন নিজ দলের মো. ফারুকুজ্জামান। কলারোয়ার জয়নগর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী বিশাখা রানী সাহা। অটোরিকশা প্রতীকে প্রার্থিতায় থাকা বিশাখা বলেন, ‘পদে পদে বাধা দেওয়া হচ্ছে। নৌকার প্রার্থী শামসুদ্দিন আল মাসুদের লোকজন পোস্টার ছিঁড়ে ফেলছে, এমনকি কর্মীদের একত্রিত হতে দিচ্ছে না। ’ দেয়াড়া ইউনিয়নে আনারস প্রতীক নিয়ে নির্বাচনে থাকা আওয়ামী লীগ নেতা মেহেদি হাসান অভিযোগ করেছেন নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর বিরুদ্ধে।

কলারোয়া উপজেলার চন্দনপুর ইউনিয়নে টেবিল ফ্যান প্রতীক নিয়ে প্রার্থী হয়েছেন জামায়াতের ডা. রমজান আলী। এখানে নৌকা প্রতীকে মনিরুল ইসলামের পাশাপাশি স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক অধ্যাপক রুস্তম আলী। ১৪ দলের শরিক ওয়ার্কার্স পার্টির বদরুজ্জামান প্রার্থী হয়েছেন হাতুড়ি প্রতীক নিয়ে। শ্যামনগর উপজেলার কৈখালী ইউনিয়নে ধানের শীষের প্রার্থী জি এম শাহ আলম, এখানে নৌকা প্রতীকের প্রার্থী জি এম রেজাউল করিম। আওয়ামী লীগ নেতা শেখ আব্দুর রহিম ও শাহজাহান সিরাজ এখানে স্বতন্ত্র প্রার্থী হয়েছেন। কাশিমাড়ী ইউনিয়নে জামায়াত নেতা এস এম আ. রউফ স্বতন্ত্র প্রার্থী হলে বিএনপি নেতারা সমর্থন দিয়েছেন। অন্যদিকে আওয়ামী লীগের একাধিক নেতা এখানে প্রার্থী হয়েছেন।


মন্তব্য