kalerkantho


চট্টগ্রামে ওসির হামলায় ছাত্রলীগ নেতা আহত

জের ধরে থানায় হামলা, যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর, সড়কে ব্যারিকেড

নিজস্ব প্রতিবেদক, চট্টগ্রাম   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চট্টগ্রামে ছাত্রলীগের এক নেতাকে ওসি মারধরের ঘটনার জের ধরে থানায় হামলা ও ভাঙচুরের ঘটনা ঘটেছে। এ সময় সড়কে এক ঘণ্টা ব্যারিকেড দিয়ে বেশ কয়েকটি যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর হয়েছে। গতকাল শনিবার বিকেলে নগরের সদরঘাট থানায় এ ঘটনা ঘটে। ওই থানার ওসি মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়াসহ আরো কয়েকজন পুলিশ সদস্যের মারধরে আহত ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রহিম জিল্লুকে গত রাত ৯টার দিকে চট্টগ্রাম মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে ভর্তি করা হয়। তিনি ছাত্রলীগ কেন্দ্রীয় গত কমিটির উপ-পরিবেশ বিষয়ক সম্পাদক এবং বর্তমানে চট্টগ্রাম সরকারি সিটি কলেজ ছাত্র সংসদের বক্তৃতা ও বিতর্ক সম্পাদক।

এদিকে ছাত্রলীগ নেতারা ঘটনায় অভিযুক্ত ওসিসহ পুলিশ সদস্যদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য ২৪ ঘন্টার আল্টিমেটাম দিয়েছেন। ঘটনার খবর পেয়ে নগর পুলিশের সহকারী কমিশনার (কোতোয়ালী জোন) মো. মঈনউদ্দিনসহ ঊর্ধ্বতন পুলিশ কর্মকর্তারা থানায় ছুটে যান। সন্ধ্যা ৭টার পর পরিস্থিতি স্বাভাবিক হলেও ঘটনাস্থলের আশেপাশে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা অবস্থান নিয়েছেন। ঘটনার পর থেকে সদরঘাট থানার ওসি মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়া গা-ঢাকা দিয়েছেন।

এ ব্যাপারে ওসি মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়ার মোবাইলে বেশ কয়েকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। তিনি ফোন ধরেননি।

একই বিষয়ে আহত ছাত্রলীগ নেতা আব্দুর রহিম জিল্লু গতকাল রাতে কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সদরঘাট আল-ইসলামিয়া হোটেলে গত শুক্রবার ঢাকা থেকে আমার বন্ধুসহ তাঁর পরিবারের চারজন সদস্য ওঠেন। তাঁরা চট্টগ্রামের সাতকানিয়ায় একটি বিয়ে অনুষ্ঠানে আসেন। আজ (শনিবার) বিকেল ৩টার দিকে তাঁরা সাতকানিয়ায় চলে যাওয়ার পর ওই সময় আমার স্ত্রীসহ আমি হোটেলে ২০১ নম্বর রুমে বসে কথা বলছিলাম। এ সময় ম্যানেজার এসে আমাদেরকে রুম থেকে চলে যেতে বললে বের হওয়ার সময় ওসি অকথ্য ভাষায় গালিগালাজ শুরু করে। ’

তিনি আরো বলেন, ‘আমার রুমে (ওসি) বাইরের লোক কেন’ এমন চিত্কার-চেঁচামেচি করে তিনি ম্যানেজারকে মারধর শুরু করেন। এসময় জিল্লু গিয়ে প্রতিবাদ জানালে তাকে কিল-ঘুষি মারতে থাকেন। এ সময় আমার নাম ও পরিচয় বললে ওসি ক্ষিপ্ত হয়ে বলেন, ও তুই তো লতিফ সাহেবের বিরুদ্ধে মামলা করছিস। এসময় আমি তাকে ভাই সম্বোধন করলে তিনি আমাকে বলেন, তুই স্যার না বলে আমাকে ভাই বলেছিস কেন? একথা বলেই আমাকে আবার পেটানো শুরু করে। এক পর্যায়ে ওসির নির্দেশে সদরঘাট থানা থেকে আরো কয়েকজন পুলিশ এসে আমাকে থানায় নিয়ে গিয়ে আটকে রাখে। আমার স্ত্রী সাদিয়া কায়েস রশ্মিকে ডিউটি অফিসারের রুমে বসিয়ে রাখে। ’

এ ঘটনার খবর পেয়ে মহানগর ছাত্রলীগের সভাপতি ইমরান আহমেদ ইমু, সহ সভাপতি আবদুল খালেক ও জয়নাল উদ্দিন জাহেদসহ ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সদরঘাট থানায় যায়। এ সময় থানার সেকেন্ড অফিসার এসআই মো. নাজিরের সাথে কথা কাটাকাটির এক পর্যায়ে তিনি থানা হেফাজত থেকে জিল্লুকে বের করে আনেন। ছাত্রলীগ নেতাদের মুচলেকা দিয়ে তাকে নিয়ে যাওয়ার জন্য বললে নেতারা ক্ষিপ্ত হয়ে উঠলে পরে জিল্লুকে ছেড়ে দেয়। এ সময় বিক্ষুব্ধ ছাত্রলীগ নেতারা সদরঘাট থানা ও আশেপাশের এলাকায় বেশ কিছু যানবাহন ও দোকানপাট ভাঙচুর চালায়। বিকেল ৫টা থেকে সন্ধ্যা সাড়ে ৬টা পর্যন্ত ওই এলাকায় যানবাহন চলাচল বন্ধ ছিল।

উল্লেখ্য, বঙ্গবন্ধু ছবি বিকৃতির অভিযোগে আব্দুর রহিম জিল্লু সংসদ সদস্য এম এ লতিফের বিরুদ্ধে আদালতে মামলা দায়ের করেছিলেন। তিনি নগরীর ফিরিঙ্গিবাজারের বন্দর কলোনির অভয়মিত্র ঘাট রোডের আবুল কালাম আজাদের ছেলে। তার স্ত্রী সাদিয়া কায়েস রশ্মি আলকরণ তিন নম্বর গলির আব্দুল কায়েসের মেয়ে। দুই বছর আগে বিয়ে করলেও এখনও ঘরে ওঠেনি। গতকাল মারধরের কারণে জিল্লুর মুখমন্ডলসহ নাক ও বাম চোখে মারাত্মক আঘাতপ্রাপ্ত।

সদরঘাট থানার উপ-পরিদর্শক বাবলা চৌধুরী বলেন, শনিবার বিকেলে হোটেলে অভিযান চালিয়ে জিল্লু ও তার স্ত্রীকে আটক করে পুলিশ। অসামাজিক কার্যকলাপের অভিযোগে তাদের আটক করা হলেও পরে পুলিশ জানতে পারে তারা স্বামী-স্ত্রী। তাদের আটক করে থানায় নিয়ে আসার পর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা হামলা ও ভাঙচুর করেছে। পরে ছাত্রলীগ নেতাদের জিম্মায় জিল্লু ও তার স্ত্রীকে ছেড়ে দেওয়া হয়েছে।

নগর ছাত্রলীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ইরফানুল আলম জিকু বলেন, জিল্লু ভাইকে আটকের খবর পেয়ে আমি থানায় যায়। এসময় কয়েকজন পুলিশ সদস্য আমাকে ছ্যাঁচড়া ছাত্রলীগ বলে সম্বোধন করে থানা থেকে ধাক্কা দিতে দিতে বের করে দেয়। এরপর ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা মিছিল নিয়ে থানার সামনে যান।

সদরঘাট থানা নগর পুলিশের ট্রাফিক বিভাগের উত্তর জোনের কার্যালয়ের ভেতরে। এর প্রবেশপথেই আছে পুলিশ ক্যান্টিন।

ক্যান্টিনের ব্যবস্থাপক নজরুল ইসলাম বলেন, ‘বেশ কয়েকজন যুবক মিছিল নিয়ে এসে ক্যান্টিনে ভাঙচুর করে। তারা অতর্কিত হামলা চালিয়েছে। আমি দরজা বন্ধ করতে চেয়েছিলাম। কিন্তু সময় পাইনি। ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা ট্রাফিক বিভাগের একটি রেকারও ভাঙচুর করে। এছাড়া ট্রাফিক বিভাগের একটি সিসি ক্যামেরা খুলে নিয়ে যায় বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। ’

নগর পুলিশের ট্রাফিক-উত্তর বিভাগের পরিদর্শক (প্রশাসন) সরওয়ার মোহাম্মদ পারভেজ বলেন, মিছিল নিয়ে এসে আমাদের একটি রেকার ভাঙচুর করেছে। এ ব্যাপারে ভাঙচুরকারীদের বিরুদ্ধে বিধি মোতাবেক ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক সদরঘাট থানার কয়েকজন উপ-পরিদর্শক জানান, ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সদরঘাট থানায় বড় বড় ইটের টুকরো ছুঁড়ে মারেন। তারা লকআপে ঢুকে জিল্লুকে ছিনিয়ে নিয়ে যান।   এছাড়া ছাত্রলীগের নেতাকর্মীরা সদরঘাট কালিবাড়ী মোড় এবং সিটি কলেজের সামনেও বিভিন্ন গাড়িতে ইট, পাটকেল নিক্ষেপ করেছে। এসময় আতঙ্কে পুরো এলাকায় দোকানপাট বন্ধ হয়ে যায়। পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে আনতে ঘটনাস্থলে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

এদিকে খবর পেয়ে নগর পুলিশের কোতোয়ালী জোনের সহকারি কমিশনার মো. মঈনউদ্দিন সিটি কলেজে যান। কলেজের ছাত্র সংসদে ছাত্রলীগের নেতাকর্মীদের নিয়ে তিনি বৈঠক করেন। সেখানে জিল্লু তাকে পুরো ঘটনা খুলে বলেন। ছাত্রলীগের সাবেক ও বর্তমান নেতাকর্মীরা ওসি মঈনুল ইসলাম ভূঁইয়ার বিরুদ্ধে বিভিন্ন অভিযোগ করেন।


মন্তব্য