kalerkantho


আইএসের ভিডিওতে উদ্বুদ্ধ হয়ে ছক অনুযায়ী কাজ

সাইফুল আলম বাবু, পঞ্চগড়   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আন্তর্জাতিক জঙ্গি সংগঠন আইএসের ভিডিও দেখিয়ে জেএমবি সদ্যদের পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর রায় (৫০) হত্যাকাণ্ডে উদ্বুদ্ধ করা হয়েছিল। নির্ধারিত ছক (তালিকা) অনুযায়ী এ কাজ করা হয়েছিল বলে আটক জেএমবি সদস্যদের দেওয়া স্বীকারোক্তিমূলক জবানবন্দিতে তথ্য মিলেছে।

এ ঘটনার হোতা হিসেবে রাহুল ওরফে রবি নামে জেএমবির সামরিক শাখার এক নেতার নাম উঠে এসেছে, যাকে পুলিশ এখনো গ্রেপ্তার করতে পারেনি।

২১ ফেব্রুয়ারি সকালে দেবীগঞ্জ উপজেলা সদরে সন্তগৌড়ীয় মঠে গিয়ে দুর্বৃত্তরা পুরোহিত যজ্ঞেশ্বর রায়কে চাপাতি দিয়ে কুপিয়ে ও গলা কেটে হত্যা করে। এ ঘটনায় হত্যা এবং অস্ত্র ও বিস্ফোরক আইনে আলাদা দুটি মামলা হয়।

এ দুই মামলায় দুই দফায় পুলিশ জেএমবি সদস্য আলমগীর হোসেন, হারেছ আলী, রমজান আলী, খলিলুর রহমান ওরফে খলিল, জাহাঙ্গীর হোসেন, বাবুল হোসেন ও আবদুল মোমিনকে গ্রেপ্তার এবং হত্যাকাণ্ডের সময় ব্যবহূত রক্তমাখা চাপাতি, দুটি পিস্তলসহ বিভিন্ন অস্ত্র উদ্ধার করে। রিমান্ডে নিয়ে জিজ্ঞাসাবাদ শেষে আদালত এই সাত আসামিকে কারাগারে পাঠান। পরে রমজানকে গ্রেপ্তার দেখিয়ে দিনাজপুরের পুলিশ কাহারোলের যাত্রামঞ্চে হামলা মামলায় জিজ্ঞাসাবাদের জন্য নিয়ে যায়। এদের মধ্যে জেএমবি সদস্য আলমগীর হোসেন গত ১ মার্চ, হারেছ আলী ৬ মার্চ ও রমজান আলী ১৪ মার্চ জ্যেষ্ঠ বিচারিক হাকিম মার্জিয়া খাতুনের কাছে ১৬৪ ধারায় জবানবন্দি দেয়।

জবানবন্দিতে তারা জেএমবি সদস্য নজরুল ও খলিলের (দুজন যৌথভাবে দেবীগঞ্জ বাজারে এক সময় চালের ব্যবসা করত) মাধ্যমে মুদি দোকানি আলমগীর, প্রতিবেশী মামা ছাত্তারের পরিচিত রাহুল ও শাহাদতের মাধ্যমে মাদ্রাসা ছাত্র রমজান ও তার প্রতিবেশী মামা সাত্তারের মাধ্যমে ভ্যানচালক হারেছ জেএমবিতে যোগ দিয়েছে বলে জানায়। তারা রাহুলকে জেএমবির বিভক্ত নতুন দলের আমির ও সামরিক পদের লোক এবং শাহাদতকে জেলার দায়িত্বপ্রাপ্ত এহসার বা মোহাজের বলে উল্লেখ করে।

এ ছাড়া ঘটনার সঙ্গে সম্পৃক্ত খাটো ও মোটা (লাল গেঞ্জি পরা), সাদা চুলওয়ালা, কালো বর্ণের একজন, কালো পোশাক পরা একজন এবং সাদ, মিজান ও রানার নাম উঠে এসেছে। মিজান ও রানা স্থানীয়। অন্যদের ঠিকানা জানতে চাইলে বলা হয়, ‘যারা ইসলামের দাওয়াতের জন্য হিজরত করে তাদের ঠিকানা থাকে না। ’ খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, রমজানের জবানবন্দিতে আসা প্রতিবেশী মামা আবদুস সাত্তারের বাড়ি তাদের বাড়ি থেকে প্রায় দুই কিলোমিটার দূরে একই ইউনিয়নের (দণ্ডপাল) মৌমারী গ্রামে। সত্তরোর্ধ্ব এই ব্যক্তি জামায়াতের রাজনীতির সঙ্গে সম্পৃক্ত। আলমগীরের জবানবন্দিতে উল্লেখ করা নজরুল রমজানের চাচাতো ভাই। তার বাড়ি সোনাহার ইউনিয়নের গছপুরি গ্রামে। রানার বাড়ি দেবীডুবা ইউনিয়নের নাজিরটারি গ্রামে। খলিলুর রহমানের বাড়ি চিলাহাটি ইউনিয়নের প্রধানপাড়া গ্রামে। সে ২০০৫ সালের ১৭ আগস্ট সিরিজ বোমা হামলা মামলা থেকে খালাস পায়।

রমজান ঘটনার সময় ঘটনাস্থলে না থেকে রাহুলের কথায় ‘বাড়ির কাছাকাছি রাস্তায়’ ছিল বলে জবানবন্দিতে দাবি করেছে। আলমগীর তার জবানবন্দিতে ‘নজরুলের কথায় জানতে পারি’ উল্লেখ করে বলেছে, ‘নজরুল বাইক ড্রাইভ করবে, রাহুল পুরোহিতকে জবাই করবে এবং রমজান বা কালো পোশাক পরা ছেলেটির মধ্যে যে কেউ একজন গুলি করবে। ’ তার তথ্য মতে, জেএমবির সামরিক পদের সদস্য রাহুল ওরফে রবির কাজ হলো ‘কতল’ করা। আর হারেছ জবানবন্দিতে বলেছে, ‘আমি শিওর হই, রমজানরাই এ হত্যাকাণ্ড ঘটিয়েছে। ’

জবানবন্দিতে রমজানের দেওয়া তথ্য মতে, (ঘটনার) প্রায় পাঁচ মাস আগে রাহুল তার মোবাইলে আইএসের পাঁচ-সাতটি ভিডিও ফুটেজ দেয়। এগুলোতে পীরের মাজার ভাঙা, ইহুদি-খ্রিস্টানদের মূর্তি ভাঙা, লাল পোশাক পরে মানুষ হত্যা করার দৃশ্য ছিল। আলমগীরের ভাষ্য মতে, রমজান তাকে আইএসের ভিডিও দেখায়। সেখানে ইরাক ও সিরিয়ার মর্মান্তিক ভিডিও, আইএস কর্তৃক গলাকাটার ও গোলাগুলির দৃশ্য ছিল। রমজান তাকে বলে, ‘আমাদের এভাবেই জেএমবির মাধ্যমে বাংলাদেশে এ কাজগুলো করতে হবে। ’

রমজান নীলফামারীর ডোমার ইসলামিয়া সিনিয়র ফাজিল মাদ্রাসার ফাজিল প্রথম বর্ষের ছাত্র। পঞ্চম শ্রেণি থেকে ২০১৪ সাল পর্যন্ত ছাত্রশিবির করত। সে জবানবন্দিতে স্বীকার করেছে, নির্ধারিত ছক অনুযায়ী পুরোহিতকে হত্যা করা হয়েছে। তবে, ছকে আর কার নাম ছিল সে বিষয়ে কিছু বলেনি। রমজান বলেছে, ঘটনার আগের দিন বিকেলে সে রাহুলের ডাকে ডিসি পার্কে যায়। সেখানে রাহুল বলে ‘দুই-তিন দিনের মধ্যে কাজ হতে পারে। ছক অনুযায়ী কাজ হবে। ’ ছক আগেই রাহুল আমাকে দিয়েছিল। রাহুল বলেছিল, ‘ছকের (তালিকার) লোকগুলো ইসলাম প্রচারে বাধা। এদের হত্যা করে ইসলাম কায়েম করতে হবে। ’ এ প্রসঙ্গে আলমগীরের জবানবন্দিতে নজরুলের উদ্ধৃতিতে এসেছে, ‘হিন্দু সম্প্রদায়ের কট্টরপন্থী নেতা পুরোহিত যজ্ঞেশ্বরকে হত্যা করে আমাদের জান্নাতের পথ সহজ করতে হবে। ’

জবানবন্দি দেওয়া তিনজনের বক্তব্যে হত্যাকাণ্ডের বিবরণ স্পষ্ট বা বিস্তারিতভাবে আসেনি। তবে হত্যাকাণ্ডের আগে ও পরের কিছু তথ্য পাওয়া গেছে। ঘটনার আগের দিন রমজান ও রাহুল হারেছের বাড়িতে যাতযাপন করে। ফজরের নামাজ পড়ে রাহুল ও রমজান আলমগীরের সাইকেলে ও হারেজ নিজের সাইকেলে কালীগঞ্জ বাজারসংলগ্ন টেকনিক্যাল কলেজের কাছাকাছি পৌঁছে। রাহুলের কথামতো হারেছ সেখানে ও রমজান তার বাড়ির কাছাকাছি রাস্তায় অপেক্ষায় থাকে। হারেছের ভাষ্য মতে, ‘সকাল ৮টা ৫ মিনিটে রাহুল ও একজন অপরিচিত (খাটো মোটা লাল গেঞ্জি পরা) লোক আসে। তাদের অস্থির লাগছিল। আমার সাইকেলে একটি ব্যাগ দিয়ে সেটি আমানত হিসেবে রাখছে বলে খুলতে নিষেধ করে। ’ রমজানের ভাষ্য, সকাল ৭টা ৫৫ মিনিটের দিকে রাহুল আলমগীরের সাইকেলটি তাকে দিয়ে কিছুক্ষণ পর আসতে চায়। যাওয়ার সময় বলে, আমি যেন পাঁচ-সাত দিন বাইরে বাইরে থাকি। তার কাজ সাকসেস হয়েছে। হারেছ বাড়িতে এসে পরে বাজারে গিয়ে, রমজান আত্মীয়ের বাড়িতে গিয়ে ও আলমগীর দোকানে এসে পুরোহিত হত্যার ঘটনা জানতে পারে বলে জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে। আলমগীর এ সম্পর্কে বলেছে, আমি শিউর হওয়ার জন্য রাহুলকে ‘ওকে’ মেসেজ পাঠাই, সেও আমাকে ফিরতি ‘ওকে’ মেসেজ পাঠায়। এ ছাড়া সে কাজটি (হত্যাকাণ্ড) সফল হওয়ায় দোয়া জানিয়ে রাহুলকে মেসেজ পাঠানোর কথাও জবানবন্দিতে উল্লেখ করেছে।

আলমগীরের ভাষ্য মতে, গত বছরের ডিসেম্বর মাসে আরো একবার ‘দেবীগঞ্জে একটা কাজ হবে’ জানিয়ে নজরুল তার কাছে অস্ত্রের ব্যাগটি রাখে। কিন্তু তখন কাজ হয়নি। পরে আবার সেটি তার কাছে ও মাঝে কিছুদিন থাকে রানার কাছে। পরে আবার তার কাছে রেখে ঘটনার আগের দিন রাতে নজরুল সেটি নিয়ে যায়। এই অস্ত্র ভরা ব্যাগটিই হারেছের কাছে আমানত হিসেবে রাখা হয়েছিল। হারেজ জবানবন্দিতে উপায়ান্তর না দেখে গোয়ালঘরের এক কোণে ব্যাগটি পুঁতে রাখার তথ্য দিয়েছে। বলেছে, ‘রমজানসহ পুলিশ তার বাড়িতে যায় এবং অস্ত্রের ব্যাগটি দিতে বলে। রমজানকে দেখা মাত্রই ব্যাগটি গোয়ালঘর থেকে বের করে এনে দিই। ’


মন্তব্য