kalerkantho


আওয়ামী লীগের শঙ্কা ‘বিদ্রোহীরা’ জামায়াত-বিএনপি গোপন ঐক্য!

আপেল মাহমুদ ও স্বপন চৌধুরী, রংপুর   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আওয়ামী লীগের শঙ্কা ‘বিদ্রোহীরা’ জামায়াত-বিএনপি গোপন ঐক্য!

দিনাজপুরের ঘোড়াঘাট উপজেলায় চারটি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে বিদ্রোহী প্রার্থীর ছড়াছড়ি। আর এ সুযোগকে কাজে লাগিয়ে ফায়দা লুটতে চাচ্ছেন জামায়াতের প্রার্থীরা। আগামী ২২ মার্চ প্রথম ধাপে অনুষ্ঠিতব্য এই উপজেলার চারটি ইউনিয়ন হলো বুলাকীপুর, পালশা, সিংড়া ও ঘোড়াঘাট। বড় দুই দলে বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার সুযোগে চারটি ইউনিয়নের মধ্যে অন্তত দুটি ইউনিয়নে জামায়াত প্রার্থীরা তাঁদের অবস্থান সংহত করে নিচ্ছেন।

সরেজমিনে জানা যায়, ঘোড়াঘাটে আগে থেকেই জামায়াত-শিবিরের কর্মী-সমর্থক বেশি। এর পেছনে অবশ্য ভৌগোলিক কারণও রয়েছে। জামায়াতের ঘাঁটি হিসেবে খ্যাত সুন্দরগঞ্জ, পলাশবাড়ী, সাদুল্যাপুর ও নবাবগঞ্জের মধ্যবর্তী এলাকার চারটি ইউনিয়ন নিয়ে ঘোড়াঘাট উপজেলা গঠিত। জামায়াত অনেকটা আন্ডারগ্রাউন্ডে থাকলেও প্রথম ধাপের এ নির্বাচনে কিছুটা কৌশল অবলম্বন করে স্বতন্ত্র হিসেবে তিনটি ইউনিয়নে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন তাদের প্রার্থীরা। এলাকায় গিয়ে জামায়াত প্রার্থী এবং তাঁদের সমর্থকদের প্রকাশ্যে নির্বাচনী প্রচারণা চালাতে দেখা গেছে।

পালশা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সঠিকভাবে প্রার্থী নির্বাচন করা হয়নি। চারটি ইউনিয়নেই টাকার বিনিময়ে প্রার্থী দেওয়া হয়েছে, যার খেসারত দিতে হবে আওয়ামী লীগকে। এতে জামায়াতে ইসলামী সুবিধা নেবে। এ জন্য উপজেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক রাসে খন্দকার শাহেনশাহকে দায়ী করে কবিরুল বলেন, তিনিই প্রার্থী নির্বাচনে মুখ্য ভূমিকা পালন করেছেন। তাঁর কলকাঠিতেই যোগ্য প্রার্থীরা ছিটকে গেছে দল থেকে। ’

একই অভিযোগ করলেন সিংড়া ইউনিয়নের বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী এবং বর্তমান চেয়ারম্যান আলহাজ মজিবর রহমান। তিনি বলেন, ‘প্রার্থী নির্বাচন সঠিক হয়নি বলেই নির্বাচনে বিদ্রোহী প্রার্থী। আগেরবার আমি বিপুল ভোটে চেয়ারম্যান নির্বাচিত হওয়ার পরও এবার মনোনয়ন পাইনি। এতে দলীয় নির্বাচনে বিরূপ প্রভাব পড়তে পারে। ’

এলাকাবাসী জানায়, ঘোড়াঘাট ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী আছেন। মোট আটজন চেয়ারম্যান পদে প্রতিদ্বন্দ্বিতা করছেন এখানে। বেশি প্রার্থী থাকায় জামায়াতে ইসলামীর প্রার্থী সুবিধা নিতে পারেন। অন্যদের মধ্যে ভোট কাটাকাটির সুযোগে ক্যাডারভিত্তিক ওই দলের প্রার্থী জোর প্রতিদ্বন্দ্বিতায় থাকবেন। এখানে আওয়ামী লীগের জয় কেড়ে নেবে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী—মন্তব্য করলেন ঘোড়াঘাট ইউনিয়নের ওসমানপুর এলাকার ভোটার ও ভ্যানচালক আবদুল কাদির।

বুলাকীপুর ইউনিয়ন পরিষদে পাঁচজন চেয়ারম্যান প্রার্থীর মধ্যে রয়েছেন আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক সদের আলী। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি ও বর্তমান চেয়ারম্যান মোফাজ্জল হোসেন প্রধান। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে আনারস প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক মাহফুজার রহমান লাবলু, বিদ্রোহী প্রার্থী হিসেবে রয়েছেন উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান আফজাল হোসেন সরকার। তিনি টেলিফোন প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জাতীয় পার্টির মনোনীত প্রার্থী উপজেলা জাতীয় পার্টির সাংগঠনিক সম্পাদক রেজাউল করিম।

পালশা ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের মনোনীত প্রার্থী উপজেলা আওয়ামী লীগের সহসভাপতি ও বর্তমান  চেয়ারম্যান কাজী মাকসুদুর রহমান লাবু চৌধুরী। এখানে বিদ্রোহী প্রার্থী সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলাম প্রধান। তিনি আনারস প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী মামুনুর রশিদ এবং জামায়াত সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী আজিজার রহমান মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। এই ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থী এ কে এম মনিরুজ্জামান সিদ্দিকী তাঁর মনোনয়নপত্র প্রত্যাহার করে নিয়েছেন। এলাকায় গুঞ্জন রয়েছে, জামায়াত প্রার্থীকে সুবিধা দেওয়ার জন্যই বিএনপি তাদের প্রার্থীকে প্রত্যাহার করেছে।

সিংড়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আবদুল মান্নান মণ্ডল, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সাবেক সভাপতি ও সাবেক ইউপি চেয়ারম্যান সারোয়ার হোসেন, বিএনপির বিদ্রোহী প্রার্থী উপজেলা বিএনপির সহসভাপতি বর্তমান চেয়ারম্যান আলহাজ মজিবর রহমান প্রধান (মোটরসাইকেল প্রতীক), জাতীয় পার্টি মনোনীত মজনু মোল্লা ও জামায়াত সমর্থিত স্বতন্ত্র প্রার্থী প্রভাষক সাজ্জাদ হোসেন (আনারস প্রতীক)।

ঘোড়াঘাট সদর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী পৌর আওয়ামী লীগের যুগ্ম আহ্বায়ক আসাদুজ্জামান ভুট্টু, বিদ্রোহী প্রার্থী ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক আনারুল ইসলাম। তিনি স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে মোটরসাইকেল প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জামায়াত সমর্থিত প্রার্থী আফজাল হোসেন (টেলিফোন প্রতীক), বিএনপি মনোনীত প্রার্থী বর্তমান চেয়ারম্যান শাহ মো. তৌহিদুল ইসলাম, বিদ্রোহী প্রার্থী লড়ছেন ইউনিয়ন বিএনপি নেতা মাহবুবুল ইসলাম। তিনি ঘোড়া প্রতীক নিয়ে লড়ছেন। জাতীয় পার্টি মনোনীত প্রার্থী হায়দার আলী চৌধুরী, স্বতন্ত্র রয়েছেন আবদুল জলিল মণ্ডল (চশমা প্রতীক) ও রাজিয়া সুলতানা কাঞ্চন (আনারস প্রতীক)।

সরেজমিনে গতকাল ঘোড়াঘাট উপজেলার বুলাকীপুর ইউনিয়নের কলাবাড়ী, ভেলাইন, বিন্নাগাড়ী, কৃষ্ণরামপুর, ঘোড়াঘাট ইউনিয়নের ওছমানপুর, সিংড়া ইউনিয়নের নুরপুর, দেবীপুর, পালোগাড়ী, কশিগাড়ীসহ বিভিন্ন এলাকা ঘুরে দেখা যায়, নির্বাচনের শেষ প্রচারণায় সরগরম হয়ে উঠেছে এলাকাগুলো। একাধিক ভোটার জানান, নির্বাচনী কর্মকাণ্ডে স্থানীয় এমপি শিবলী সাদিক ও উপজেলা চেয়ারম্যান শামীম হোসেন চৌধুরীর কোনো অংশগ্রহণ নেই। মাঠ পর্যায়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির নেতাকর্মীরা মাঠ গরম করে রেখেছেন।

স্থানীয় একটি সূত্র জানায়. ঘোড়াঘাট ইউনিয়ন নির্বাচনে উপজেলা ও ইউনিয়ন পর্যায়ের নেতাকর্মীদের প্রাধান্য রয়েছে। এদের কাছে স্থানীয় এমপির অনুরোধ পর্যন্ত রক্ষা হয়নি। তিনি পালশা ইউনিয়নে সাবেক চেয়ারম্যান কবিরুল ইসলামকে দলীয় মনোনয়ন দেওয়ার অনুরোধ করেছিলেন। কিন্তু উপজেলা আওয়ামী লীগ নেতারা এমপির অনরোধ রক্ষা না করে কাজী মাকসুদুর রহমান লাবু চৌধুরীকে মনোনয়ন দেন। এ ঘটনার পর এমপি আর এলাকায় আসেননি। অনেকে মনে করছেন, এমপির নীরবতা নির্বাচনে প্রভাব পড়তে পারে।

সিংড়া ইউনিয়নের নুরপুর এলাকার ভোটার বাবুল কুমার সাহা কালের কণ্ঠকে জানান, ‘চার ইউনিয়নের ১০ হাজারের বেশি সংখ্যালঘু ও আদিবাসী ভোটার রয়েছেন। তাঁদের অধিকাংশ ভোট নৌকা প্রতীকে পড়ে। কিন্তু বিদ্রোহী প্রার্থী থাকার কারণে ভোটা ভাগ হয়ে যাবে। এতে নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর জয়লাভের আশা কমে যেতে পারে। অবশ্য বিএনপিরও বিদ্রোহী প্রার্থী রয়েছেন। এতে বরং জামায়াত প্রার্থী সুবিধা ভোগ করবেন। ’

বুলাকীপুর ইউনিয়নে কলাবাড়ী এলাকার ভোটার লুত্ফর রহমান ও মতিয়ার মাস্টার জানান, তাঁদের এলাকায় জায়ায়াত প্রার্থী না থাকায় আরেক রহস্যের সৃষ্টি হয়েছে। মূলত জামায়াতের ভোট বিএনপির পকেটে দেওয়ার জন্যই তারা এখানে প্রতিদ্বন্দ্বী রাখেনি।


মন্তব্য