kalerkantho


নিয়ম মানার গরজ নেই

আ. লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই বেশি অভিযোগ

নিখিল ভদ্র ও গৌরাঙ্গ নন্দী, খুলনা থেকে   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আ. লীগ প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই বেশি অভিযোগ

খুলনা শহর থেকে ১৬ কিলোমিটার পশ্চিমে ডুমুরিয়া বাজার। সেখান থেকে দক্ষিণমুখো গ্রামের মধ্য দিয়ে চলা পিচঢালা পথ ধরে ১০ কিলোমিটারের মতো এগুলে চটচটিয়া খেয়াঘাট।

নদী পার হলেই মাগুরখালী ইউনিয়ন। সকাল ১১টায় সেখানে পৌঁছেই শোনা গেল নৌকা প্রতীকে বিমল সানার পক্ষে মাইকে প্রচার। দুপুর ২টার আগে মাইকে প্রচার করার নিয়ম নেই। এখানে আচরণবিধি ভেঙে কেন এমন প্রচার জানতে চাইলে প্রবীণ এক ব্যক্তি ক্ষোভের সঙ্গেই বলে ওঠেন, ‘শুধু প্রচার মাইক! আরো কত কিছু আছে। সরকারি দল বলে কথা!’

ইউনিয়নের বেশ কিছু এলাকা ঘুরে ওই প্রবীণ ব্যক্তির কথারই নিদর্শন দেখা গেল। নৌকা প্রতীকের প্রার্থীর ছবি সংবলিত গেঞ্জি বিতরণ করা হয়েছে, এলাকার মানুষ সেই গেঞ্জি পরে ঘুরে বেড়াচ্ছে। একাধিক রঙের পোস্টার দেয়ালে দেয়ালে, গাছে, বাড়ির প্রবেশমুখে। আছে মোটরসাইকেল মহড়া, আর সুবিধামতো হুমকি-ধমকি। স্থানীয় এমপির নাম করে প্রকাশ্যেই হুমকি দেওয়া হচ্ছে।

আবার অনেককে ভোটকেন্দ্রে যেতে নিষেধ করা হয়েছে বলেও অভিযোগ পাওয়া গেছে।

প্রকৃতপক্ষে এখানে নির্বাচনী আচরণবিধি ভাঙার মচ্ছব চলছে। উপজেলা সদর থেকে অনেক দূরে হওয়ায় এখানকার সরকারি দলের প্রার্থী ইচ্ছেমতো কর্মকাণ্ড করে চলেছেন। এসব বিষয়ে ফোনে জানতে চাইলে চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী বিমল সানা বলেন, ‘আমি নিজে শার্ট বা গেঞ্জি প্রিন্ট করিনি। আমার একজন সমর্থক এটি সৌজন্য হিসেবে দিয়েছেন। ’ দেয়ালে পোস্টার লাগানো ও প্রতীক তৈরির বিষয়ে তিনি বলেন, ‘কর্মীরা কী করেছে, তা আমি জানি না। ’

নিয়ম না মানার এমন চিত্র দেখা গেছে জেলার বিভিন্ন ইউনিয়ন ঘুরে। আচরণবিধিতে নিষেধ থাকলেও মিছিল-মিটিং, মোটরসাইকেল, বাইসাইকেল, অটোরিকশাসহ নানাভাবে শো-ডাউন করে চলেছেন বিভিন্ন প্রার্থীর কর্মী-সমর্থকরা। বাসা-বাড়ি, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠানের দেয়ালে দেয়ালে সাঁটানো হয়েছে পোস্টার। কয়েকটি স্থানে প্রতীক সংবলিত বিশাল তোরণও দেখা গেছে। অনেক চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী ইউনিয়ন পরিষদ ভবন নিজের নির্বাচনী কার্যালয় হিসেবে ব্যবহার করছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে। নির্বাচনী কাজে লাগানো হচ্ছে ইউনিয়ন পরিষদের কর্মচারীদেরও। এসব অভিযোগ সরকারি দলের প্রার্থীদের বিরুদ্ধেই বেশি।

‘এক ভোট পেলেও নির্বাচনে নৌকা মার্কা পাস করবে’—এমন প্রচার চালাচ্ছেন পাইকগাছা উপজেলার লস্কর ইউনিয়ন পরিষদে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী এম আরিফুজ্জামান তুহিন। এ অভিযোগ করেছেন তাঁর একমাত্র প্রতিদ্বন্দ্বী স্বতন্ত্র প্রার্থী মো. আব্দুল করিম গাইন। তিনি বলেন, কোনো ধরনের আচরণবিধি মানছেন না নৌকা মার্কার কর্মী-সমর্থকরা। প্রতিদিনই মিছিল-সমাবেশ ও মোটর শোভাযাত্রার মাধ্যমে এলাকায় শোডাউন করছেন তাঁরা।

একই ধরনের অভিযোগ করেছেন দাকোপ উপজেলার বানিশান্তা ইউনিয়নে সিপিবি মনোনীত প্রার্থী বিশ্বজিৎ মণ্ডল। তিনি জানান, শুক্রবার রাতেও হামলা চালিয়ে তাঁর ছয়-সাতজন কর্মীকে আহত করা হয়েছে। একজনের অবস্থা আশঙ্কাজনক। একের পর এক হামলা ও নির্যাতনের ঘটনা ঘটলেও আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনী কোনো পদক্ষেপ নিচ্ছে না।

তবে পাইকগাছা উপজেলার কপিলমুনি ইউনিয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থী কওসার আলী জোয়ার্দ্দার অভিযোগ করেন, বিএনপি মনোনীত প্রার্থী দুইবারের নির্বাচিত চেয়ারম্যান শাহাদাৎ হোসেন ডাবলু লোকজনকে হুমকি দিয়ে বলছেন, এবারও যাতে তাঁকেই জেতানো হয়। শাহাদাৎ হোসেন ডাবলু অবশ্য দাবি করেন, সরকারি দলের প্রার্থী নানা অপপ্রচারে লিপ্ত।

পার্শ্ববর্তী ইউনিয়ন হরিঢালীতে স্বতন্ত্র প্রার্থী হিসেবে লড়ছেন আওয়ামী লীগ নেতা সরদার গোলাম মোস্তফা। তাঁর নির্বাচনী কার্যালয় ভাঙচুর করা এবং নির্বাচনী কাজে বাধা দেওয়া হচ্ছে বলে অভিযোগ করেছেন তিনি। একই ধরনের অভিযোগ ডুমুরিয়া উপজেলার গুটুদিয়া ইউনিয়নে ঘোড়া মার্কার প্রার্থী সিপিবি নেতা শিশির ফৌজদারেরও। এ বিষয়ে ডুমুরিয়া উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মোহাম্মদ সামছু দ্দৌজা বলেন, আচরণবিধি লঙ্ঘন যাতে না হয়, সে বিষয়ে প্রশাসন যথেষ্ট সজাগ রয়েছে। কেউ অভিযোগ না দিলেও আচরণবিধি লঙ্ঘনের বিষয়ে মাঠপর্যায়ে ব্যবস্থা নেওয়া হবে।

তবে প্রশাসন নীরব বলে দাবি করেছেন রূপসা উপজেলার শ্রীফলতলা ও আইচগাতী ইউনিয়নে বিএনপি মনোনীত প্রার্থীরা। গতকাল শনিবার দুপুরে খুলনা প্রেস ক্লাবে এক সংবাদ সম্মেলনে শ্রীফলতলা ইউপির চেয়ারম্যান পদপ্রার্থী এস এম মনিরুল হাসান বাপ্পী বলেন, নিজেদের প্রার্থীদের বিজয়ী করতে আওয়ামী লীগ নীল নকশা শুরু করেছে। এরই ধারাবাহিকতায় রূপসার বঙ্গবন্ধু সরকারি কলেজ ও রূপসা ডিগ্রি কলেজের শিক্ষকের বিভিন্ন কেন্দ্রে প্রিসাইডিং অফিসার হিসেবে নিয়োগ দেওয়া হচ্ছে, যাঁরা সরাসরি আওয়ামী লীগের সঙ্গে সম্পৃক্ত। এ বিষয়ে রিটার্নিং অফিসারের কাছে অভিযোগ দিয়েও কোনো ফল পাওয়া যায়নি।

খুলনা জেলা প্রশাসক মো. নাজমুল আহসান কালের কণ্ঠকে বলেন, ইউপি নির্বাচনে যাতে আচরণবিধি লঙ্ঘন না হয় সে জন্য নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করছেন। অভিযোগ পেলেই ব্যবস্থা নেওয়া হচ্ছে। জেলার ৯ উপজেলার নির্বাহী কর্মকর্তারা নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট হিসেবে দায়িত্বপালন করছেন। আরো নির্বাহী ম্যাজিস্ট্রেট দায়িত্ব পালন করবেন।

জেলা নির্বাচন অফিস সূত্রে জানা যায়, আচরণবিধি লঙ্ঘনের অভিযোগে বটিয়াঘাটা উপজেলায় দুই চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীসহ আট প্রার্থীকে জরিমানা করা হয়েছে। গত শুক্রবার সন্ধ্যায় ভ্রাম্যমাণ আদালতের মাধ্যমে বটিয়াঘাটা উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা মুহা. বিল্লাল হোসেন খান ওই প্রার্থীদের জরিমানা করেন।

আ. লীগের দুই বিদ্রোহী প্রার্থীর অভিযোগ : দিঘলিয়া উপজেলার সদর ও বারাকপুর ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের বিদ্রোহী প্রার্থী যথাক্রমে হায়দার আলী মোড়ল ও গাজী হাফিজুর রহমান প্রতিদ্বন্দ্বী প্রার্থী ও স্থানীয় সংসদ সদস্যের বিরুদ্ধে রিটার্নিং অফিসারের কাছে আচরণবিধি লঙ্ঘনের আলাদা অভিযোগ করেছেন। হায়দার আলীর অভিযোগ, নৌকা প্রতীকের প্রার্থী মোল্লা ফিরোজ হোসেন রাস্তার মোড়ে নির্বাচনী কার্যালয় স্থাপন করেছেন। এ ছাড়া তাঁর লোকজন হায়দার আলীর পোস্টার ছিঁড়ে ফেলে এবং বোর্ড ভাঙচুর করেছে। স্থানীয় সংসদ সদস্য এস এম মোস্তফা রশিদী সুজা বিভিন্ন কর্মসূচিতে অংশ নিয়ে নির্বাচনী প্রচার চালাচ্ছেন বলেও তিনি অভিযোগ করেন। নৌকার প্রার্থী গাজী জাকিরের বিরুদ্ধে ১০-১৫টি ক্যাম্প স্থাপন, গভীর রাত পর্যন্ত প্রচার চালানোর অভিযোগ করেন হাফিজুর। এ ছাড়া খুলনা-৬ আসনের এমপি শেখ মো. নূরুল হকের বিরুদ্ধে নির্বাচনী প্রচার চালানোর অভিযোগ উঠেছে।


মন্তব্য