kalerkantho


সকাল-বিকেল গোলাগুলি দিনভর মারামারি

তৌফিক মারুফ, রফিকুল ইসলাম ও এমরান হাসান সোহেল, পটুয়াখালী থেকে   

২০ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সকাল-বিকেল গোলাগুলি দিনভর মারামারি

পায়রা নদী পাড়ি দিলেই পটুয়াখালীর ভূখণ্ড শুরু। বাঁ দিকের রাস্তা ধরে দুমকী হয়ে বাউফলের বগা এলাকা।

বেলা বাড়ার সঙ্গে সঙ্গে সূর্যের তাপ যতটা তার চেয়েও অন্য তাপ অনুভূত হলো অনেকটাই বেশি। রোদের তাপের চেয়ে নির্বাচনী উত্তাপ প্রখর। প্রধান সড়কের পাশে চায়ের দোকানে ১০-১২ জন লোকের আড্ডা। কেউ সিনেমার গল্প করছেন কেউবা শরিয়ত-মারেফত তরিকা নিয়ে চর্চায় মশগুল। চায়ের অর্ডার দিয়ে তাদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে দু-চার কথা শেষে ‘ভোটের পরিবেশ কেমন?’ প্রশ্ন তুলতেই একে একে সরে পড়লেন সবাই। রইলেন শুধুই চায়ের দোকানি। পরিষ্কার বিরক্তি ঝেড়ে বললেন, ‘ভোটের আলাপ কইরেন না। দেখছেন না পরিবেশটা কেমন অইয়া গেল!’ খানিকটা থেমে একটু নিচু গলায় বললেন, ‘এডা কিন্তু হুইপের (জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজ) এলাকা, বুইজ্জা হুইন্যা কথা কইয়েন। এর মধ্যে এইহানে কিন্তু খুনোখুনিও অইয়া গেছে। সবাই কয় হুইপের গুণেই এলাকা সব সময় গরম থাহে। ’

কথা শেষ করে সামনে এগোতেই আরেকজন এসে অনেকটাই স্বপ্রণোদিত হয়ে পরিচয় জানতে চান। এরপরই বললেন, ‘এইহানের পরিবেশ খুবই ভালো, সবাই নৌকায় ভোট দিব। বিএনপি কন আর বিদ্রোহী কন কেউ আমাগো বাইরে নাই। ’

বগা ইউনিয়ন পরিষদের কাছে আরেক দোকানে ছিলেন মধ্য বয়সের এক ব্যবসায়ী একাই। ভোটের প্রসঙ্গ তুলতেই বেশ খোলামেলাভাবে গড় গড় করে বললেন, ‘ভোটের কথা কিছু বলা যায় না। সবই তো হুইপের হাতে। যোগ্য লোকগুলারে বাদ দিয়া কাগোরে না কাগোরে নৌকায় চড়াইছে আল্লায়ই জানে। মানুষে ভোটের দিন ভোট দিতে পারব বইল্যা তো মনে হয় না। অনেক এলাকাতেই বিদ্রোহীরা বেশি যোগ্য ও শক্তিশালী প্রার্থী। আবার বিএনপিরও কয়েকজন বেশ শক্তিশালী প্রার্থী আছেন। প্রশাসন ঠিক থাকলে ফলাফল কয়টা কোন দিকে যায় বলা কঠিন হবে। কয়েক দিন ধইর্যা বাউফলে যা মারামারি চলছে এইটার ফল ভালো হইবে না। কারণ হুইপের বাইরেও এই এলাকায় চেতা মানুষ আরও দু-একজন আছে। ’

একটু থেমে ওই ব্যবসায়ী যোগ করেন, ‘হুইপের আপন এক ভাতিজাই তো একটা ইউনিয়নে বিদ্রোহী প্রার্থী। আবার কোথাও কোথাও বিএনপির কর্মীরাও আওয়ামী লীগের বিদ্রোহীদের সঙ্গে কাজ করছে। ’

এলাকার উত্যপ্ত পরিস্থিতি সম্পর্কে জানতে চাইলে জাতীয় সংসদের চিফ হুইপ ও বাউফল উপজেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি আ স ম ফিরোজ কালের কণ্ঠকে বলেন,  ‘আমি জীবনে কখনো অস্বচ্ছ রাজনীতি বা কাজ করিনি। যারা আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ করছে তারা একটি মহল বিশেষ থেকে বিভ্রান্তির শিকার হয়েছে। স্থানীয় পর্যায়ের কিছু নেতাকর্মী দলীয় মনোনয়ন না পাওয়ায় তারা অসন্তুষ্ট হয়ে বিদ্রোহী প্রার্থী হয়েছে। আর তাদের মদদ দিচ্ছে কোনো কোনো আমলা ও রাজনৈতিক লোক এবং অসৎ উপায়ে টাকা অর্জনকারীরা। তারা আমার দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক অবস্থানকে ছোট করার জন্য জননেত্রী প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার কাছে আমার অবস্থানকে খারাপ বলে প্রমাণ করার জন্য বিদ্রোহীদের জিতিয়ে নিয়ে নৌকার প্রার্থীকে হারানোর ষড়যন্ত্র শুরু করেছে। এর আগে কখনোই বাউফলে স্থানীয় পর্যায়ের নির্বাচনে এমন সব ঘটনা ঘটেনি। ’ হুইপ বলেন, ‘যারা আমাকে টপকে বা ধাক্কা দিয়ে ফেলে আমার জায়গায় আসতে চায় তাদের উদ্দেশ্য সফল হবে না। ’

আ স ম ফিরোজ সরকারের একজন সচিবের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, ‘অনেকেই আমাকে বলে বিদ্রোহী প্রার্থীকে ভোট দেওয়ার জন্য তিনি বিএনপির কর্মীদের রাস্তা-টিউবওয়েল দেওয়ার প্রলোভন দেখাচ্ছেন। ’ তিনি স্থানীয় প্রশাসনের অবস্থানের দিকে ইঙ্গিত করে বলেন, কোনো কেন্দ্রে যদি প্রশাসন সুষ্ঠু ও শান্তিপূর্ণ ভোটের পরিবেশ না রেখে অন্য কোনো কিছু করার চেষ্টা করে তবে বাউফলের জনগণ কিন্তু প্রশাসনকে ছেড়ে দেবে না। ’

গতকাল বিকেলে মোবাইল ফোনে হুইপ যখন প্রশাসন নিয়ে কালের কণ্ঠের সঙ্গে এমন কথা বলছিলেন তখনই খবর আসে দুপুরে এক দফা সংঘাত হয়ে যাওয়া নওমালা এলাকায় আবার সংঘর্ষ শুরু হয়েছে এবং ইতিমধ্যেই একজন পুলিশ গুলিবিদ্ধ হয়েছেন। ওই ঘটনায় আরো চার পুলিশ ইটের আঘাতে গুরুতর আহত হয়েছেন। তাঁদের হাসপাতালে চিকিৎসা দেওয়া হচ্ছে।

এদিকে অন্য এলাকা চন্দ্রদ্বীপে থাকা চিফ হুইপ আ স ম ফিরোজের ভাতিজা আলকেচ মোল্লা ওরফে এনামুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমার লোকজনকে নৌকার সমর্থকরা মারধর করেছে। তারা হাসপাতালে ভর্তি, আমি তাদের দেখতে হাসপাতালে যাচ্ছি। ’

বিদ্রোহী ওই প্রার্থী (হুইপের ভাতিজা) বলেন, ‘হুইপের প্রভাবে আওয়ামী লীগ নেতা ইব্রাহিম ফারুক আমার বিরুদ্ধে ষড়যন্ত্র করছে। আমার কর্মীদের মারধর করছে লোকজন দিয়ে। প্রশাসন যদি নিরপেক্ষ থাকে তবে ৯৫ শতাংশ ভোটারের ভোট আমিই পাব। ’

এর আগে দুপুরে বাউফল শহর হয়ে নওমালা ইউনিয়নের নগরের দিকে যেতে যেতে খবর আসে একই উপজেলার আরেক প্রান্ত; ধূলিয়ায় গোলাগুলি চলছে। এর কিছুক্ষণ পর ওই নওমালাতেই এক পক্ষের বাড়িতে হামলা ভাঙচুর করে করে প্রতিপক্ষের লোকেরা। কিছু সময়ের ব্যবধানে একই উপজেলার আরো দুই স্থানে ঘটে সহিংস ঘটনা। নওমালা ইউনিয়নে বটকাজল এলাকায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী কামাল হোসেন বিশ্বাসের লোকজন স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী) শাহাজাদা হাওলাদারের তিন সমর্থক মন্নান মৃধা, কুডু মৃধা ও মোতাহার মৃধার বসতঘরে হামলা চালিয়ে ভাঙচুর ও লুটপাট করে। ধূলিয়া ইউনিয়নের হাই স্কুল এলাকায় বিএনপি মনোনীত প্রার্থী আব্দুল জব্বার সমর্থকদের সঙ্গে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আনিচুর রহমান হাওলাদার (আব্দুর রব) সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। ওই ঘটনায় ১০ জন আহত হয়েছে। এ সময় পাঁচ রাউন্ড ফাঁকা গুলির শব্দ শোনা যায়। তবে গুলি বিস্ফোরণের জন্য একপক্ষ অন্যপক্ষকে দায়ী করেছেন। হামলায় স্বপন নামের একজনকে গুরুতর আহত অবস্থায় বরিশাল শের-ই-বাংলা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়েছে। চন্দ্রদ্বীপ ইউনিয়নে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী আমির আলী হাওলাদারের লোকজন স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী প্রার্থী) এনামুল হক (আলকেচ মোল্লা) সমর্থকদের ওপর হামলা চালায়। হামলায় ৯ জন আহত হয়েছে। এদের মধ্যে গুরুতর চারজন আল আমিন, নিজাম প্যাদা, মো. আব্দুল, কাশেম দর্জি ও জামাল হোসেনকে বাউফল উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে ভর্তি করা হয়েছে। খবর পেয়ে পুলিশ এসব এলাকার পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে নিয়েছে।

এদিকে কেশবপুর ইউনিয়নের স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী) প্রার্থী আসাদুল হক জুয়েল অভিযোগ করেন, শুক্রবার রাতে আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী লাবলু হাওলাদার ও তাঁর লোকজন বাড়িতে গিয়ে ভয়ভীতি দেখায়। একই সঙ্গে নির্বাচনের আগে এলাকা ছেড়ে চলে যাওয়ার জন্য হুমকি দেয়।

দশমিনা পরিস্থিতি : গতকাল বিকেলে আলিপুরা ইউনিয়নের আলিপুরা স্লুইস বাজার এলাকায় আওয়ামী লীগ মনোনীত প্রার্থী বাদশা ফয়সাল আহম্মেদ এবং স্বতন্ত্র (আওয়ামী লীগ বিদ্রোহী) প্রার্থী সোহরাব হোসেন সরদার সমর্থকদের মধ্যে সংঘর্ষ হয়েছে। এতে দুই পক্ষের সংঘর্ষে চারজন আহত হয়েছে। ফয়সাল সমর্থকরা ওই সময় সোহরাবের নির্বাচনী অফিস ভাঙচুর করে।

গলাচিপা উপজেলায় এখন পর্যন্ত বড় কোনো নির্বাচনী হাঙ্গামা না হলেও কোনো কোনো ইউনিয়নে কিছুটা উত্তেজনা রয়েছে। বিশেষ করে ডাকুয়া ইউনিয়নে নৌকা মার্কার প্রার্থী বদরুল ইসলামের পক্ষে প্রতি সন্ধ্যায়ই বিশেষ মহড়া হয় বলে অভিযোগ করে এলাকার একাধিক সূত্র।

চেয়ারম্যান পদপ্রার্থীদের ঘিরে এমন উত্তপ্ত পরিস্থিতির পাশাপাশি পাল্টা চিত্র দেখা যায় দুমকী-বাউফল-দশমিনা-গলাচিপার বিভিন্ন গ্রামে। নির্বাচনী প্রচারণার বিধিবিধান ঠিকঠাক জানা না থাকলেও উৎসব আমেজে যেন ঘাটতি নেই। সকাল ৯টায়ই দুমকীর প্রধান সড়কজুড়ে দেখা যায় ফুটবল প্রতীকধারী একজন মেম্বর পদপ্রার্থীর সমর্থকদের লম্বা মিছিল। একই ভাবে বাউফলের নওমালা, দশমিনার বেতাগী-শানকিপাড়ায় আরেক মেম্বর পদপ্রার্থীর মিছিলও একই ধরনের উৎসবের রূপ চোখে পড়ে।  

জেলা আওয়ামী লীগের সাংগঠনিক সম্পাদক ও বাউফল পৌরসভার মেয়র জিয়াউল হক জুয়েল বলেন, চিফ হুইপের ইন্ধনে আওয়ামী লীগ নামধারী ক্যাডাররা উপজেলা চেয়ারম্যানকে প্রশাসনের উপস্থিতিতে মারধর করেছে। সেই থেকেই ক্যাডাররা ধারাবাহিকভাবে  দলের ত্যাগী নেতাকর্মীদের ওপর হামলা করে যাচ্ছে। এমনকি তাদের হাত থেকে পুলিশ প্রশাসন পর্যন্ত রক্ষা পাচ্ছে না। নওমালায় পুলিশ প্রশাসনের ওপর হামলার উদাহরণ টেনে তিনি বলেন, ভোটে জিতবে না জেনেই একটি পক্ষ আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি অবনতির চেষ্টা করছে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত প্রশাসনের কঠোর পদক্ষেপের কারণে তাদের ভোট চুরির চেষ্টা ব্যর্থ হবে বলে তিনি মন্তব্য করেন।

এ ব্যাপারে কথা হলে বরিশাল রেঞ্জের ডিআইজি মো. হুমায়ূন কবীর বলেন, আজ রাত (গত রাত) থেকে শুধুু বাউফল নয়, গোটা বরিশালেই যেখানে নির্বাচন হচ্ছে রিজার্ভ ফোর্স মোতায়েন হচ্ছে। আশা করছি পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণেই থাকবে।


মন্তব্য