kalerkantho


কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকত

রাতে নয়নাভিরাম দিনে দুর্গতি

রফিকুল ইসলাম, কুয়াকাটা থেকে ফিরে   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সূর্যোদয় আর সূর্যাস্ত ছাড়াও কুয়াকাটা সমুদ্রসৈকতে দেখা মিলবে চমত্কার এক দৃশ্যের। রাতের বেলায় সৈকতের ধারে গেলে দেখা যাবে নীল আর সাদা আলোর খেলা চলছে, মনে হবে অসংখ্য জোনাকি যেন ছড়িয়ে আছে সৈকতজুড়ে।

তবে রাতের বেলায় মনোমুগ্ধকর এ আলোর উৎস দিনের বেলায় পর্যটকদের জন্য বিপত্তির কারণ হয়ে দেখা দিচ্ছে। কারণ রাতে আলো বিচ্ছুরণ করা জেলিফিশগুলো ততক্ষণে মরে যায়। আর তা থেকে সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে দুর্গন্ধ।   

সম্প্রতি স্ত্রী ও দুই সন্তান নিয়ে কুয়াকাটা সৈকতে বেড়াতে গিয়েছিলেন বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষক বদিউজ্জামান। রাতে বালুকাবেলাজুড়ে সাদা-নীলের মাখামাখি দেখে মুগ্ধ হয় তারা। সকালে স্ত্রী, সঙ্গে সন্তানরা সেই বস্তুর খোঁজে সৈকতে গিয়ে দেখল স্বচ্ছ কিছু একটা পড়ে আছে। হাত দিয়ে স্পর্শ করতে গিয়েই বিপাকে পড়ল তারা। জেলিফিশের আঠালো পদার্থ তাদের হাতে আটকে যায়। তা থেকে বের হতে থাকে দুর্গন্ধ।

দু-একটি নয়, সৈকতজুড়ে ছড়িয়ে ছিটিয়ে ছিল এ রকম হাজার হাজার মৃত জেলিফিশ।  

শিক্ষার্থীদের নিয়ে শিক্ষা সফরে গিয়েছিলেন একটি বিশ্ববিদ্যালয়ের সহকারী অধ্যাপক ইমরানুল ইসলাম। গত শনিবার ভোরে তিনি বেরিয়েছিলেন সূর্যোদয় দেখতে। কিন্তু সৈকতে গিয়েই থমকে যেতে হয় তাঁকে। কারণ সৈকতজুড়ে পড়ে ছিল হাজার হাজার স্বচ্ছ দেহের প্রাণী। পরে তিনি বুঝতে পারেন সেগুলো জেলি ফিশ। স্থানীয় জেলেদের কাছে যা নোনা নামে পরিচিত। মৃত সেই জেলিফিশ থেকে দুর্গন্ধ ছড়িয়ে পড়েছে পুরো এলাকায়।  

সরেজমিনে গিয়ে দেখা গেছে, কুয়াকাটা ও আশপাশের এলাকার সমুদ্রসৈকতে অসংখ্য জেলিফিশ ভেসে উঠছে। জোয়ারের পানিতে তা বালুচরে আটকা পড়ে মারা যাচ্ছে। দুর্গন্ধে নাক চেপে হাঁটছে পর্যটকরা। দলে দলে জেলিফিশ সৈকতের দিকে ধেয়ে আসায় জাল নষ্ট হওয়ার আশঙ্কায় জেলেরাও সেভাবে জাল ফেলতে চাইছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, জেলিফিশ গভীর সমুদ্রের লবণাক্ত পানিতে থাকতেই পছন্দ করে। কিন্তু জলবায়ু পরিবর্তনসহ বিভিন্ন কারণে সমুদ্রের লবণাক্ততা বেড়ে যাওয়ায় জেলিফিশ সৈকতে চলে আসছে। কম বয়সী জেলিফিশ বেশি লবণাক্ততা সহ্য করতে পারে না। দূষণের কারণে তাদের আবাসস্থল বসবাসের অনুপযোগী হওয়ায়ও এমনটা ঘটতে পারে।

বরিশাল থেকে বেড়াতে আসা আফজাল হোসেন বলেন, মৃত জেলিফিশের দুর্গন্ধে নাকে রুমাল দিয়ে হাঁটাচলা করতে হচ্ছে। এগুলো মাটিচাপা দেওয়ার কোনো ব্যবস্থা না থাকায় সৈকতের পরিবেশ নষ্ট হচ্ছে।  

স্থানীয় জেলেরা জানায়, প্রতিবার জাল তোলার পর দেখা যায়, মাছের সঙ্গে ২৫ থেকে ৩০টি করে জেলি ফিশ জালে আটকা পড়ে। জাল থেকে ছাড়িয়ে মৃত জেলিফিশগুলো পানিতে ফেলে দেওয়া হয়। পরে সেগুলো পানিতে ভেসে উপকূলে চলে আসে।  

কুয়াকাটা ডেভেলপমেন্ট সোসাইটির নির্বাহী পরিচালক রুমান ইমতিয়াজ তুষার কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলেরা নোনার (জেলি ফিশ) অত্যাচারে অতিষ্ঠ হয়ে উঠেছে। জাল ফেললেই আটকা পড়ছে জেলি ফিশ। জাল না কেটে এগুলো ছাড়ানোও সম্ভব হয় না। ফলে জাল নষ্ট হয়ে যাচ্ছে। এ কারণে জেলেরা মাছ শিকারে দুর্ভোগে পড়েছে। গভীর সমুদ্রে থাকা এসব জেলিফিশ সৈকতে এসে আটকা পড়ায় পর্যটকরা আতঙ্কিত। জেলিফিশ মরে পচে গিয়ে সৈকতজুড়ে দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে।  

কুয়াকাটার পৌর মেয়র আব্দুল বারেক মোল্লা বলেন, হঠাৎ করে সৈকতের বিভিন্ন পয়েন্টে মৃত জেলিফিশ ভেসে আসছে। সেগুলো পুঁতে ফেলার ব্যবস্থা নেওয়া হয়েছে। ইতিমধ্যেই কুয়াকাটা চৌরাস্তা থেকে দক্ষিণে সাগরপাড়, পশ্চিমে হোটেল ক্যাসেল ড্রিম, উত্তরে আনন্দবাড়ী, পর্ব চয়ন ডাকবাংলো পর্যন্ত আটজন পরিচ্ছন্নতাকর্মী কাজ শুরু করেছেন। আগামীতে পুরো বিচ এলাকা পরিষ্কারের জন্য জনবল নিয়োগ দেওয়া হবে। তখন সমস্যা আর থাকবে না।

বেসরকারি উন্নয়ন সংস্থা ওয়ার্ল্ড ফিশে কর্মরত মীর মোহাম্মদ আলী বলেন, সামুদ্রিক পানির স্বাভাবিকতায় অত্যন্ত দ্রুত পরিবর্তন আসছে। জেলিফিশ লবণাক্ত পানিতে থাকতে পছন্দ করে। কিন্তু সমপ্রতি পানিতে লবণাক্ততা মাত্রাতিরিক্ত বেড়ে গেছে। এ কারণে প্রাণীগুলো দল বেঁধে তীরের দিকে চলে আসছে।

পটুয়াখালী বিজ্ঞান ও প্রযুক্তি বিশ্ববিদ্যালয়ের দুর্যোগ ব্যবস্থাপনা অনুষদের সাবেক ডিন অধ্যাপক আ ক ম মোস্তফা জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলিফিশের এভাবে উঠে আসার প্রধান কারণ হতে পারে সমুদ্রের লবণাক্ততার পাশাপাশি তাপমাত্রা বৃদ্ধি। সঙ্গে যোগ হয়েছে বাতাস, ফলে বৃদ্ধি পেয়েছে পানি। তাই গভীর জলের বাসিন্দারা তীরে আসছে। পূর্ণ বয়স্ক জেলিফিশ অনেক বিরূপ পরিস্থিতিতেও নিজেদের মানিয়ে নিতে পারে। কিন্তু কম বয়সীরা তা পারে না। তাই এভাবে দল বেঁধে তীরে এসে থাকতে পারে।


মন্তব্য