kalerkantho

মঙ্গলবার । ১৭ জানুয়ারি ২০১৭ । ৪ মাঘ ১৪২৩। ১৮ রবিউস সানি ১৪৩৮।


মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসছে না

রেজাউল করিম   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য আলাদা তদন্ত সংস্থা এবং রাষ্ট্রপক্ষে আদালতে মামলা পরিচালনার জন্য স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস না থাকায় দ্রুত মামলা নিষ্পত্তি হচ্ছে না। আইনজ্ঞরা বলছেন, বেশির ভাগ মামলায় তদন্ত শেষ করতেই বছরের পর বছর লেগে যায়। থানার পুলিশ কর্মকর্তাদের হরেক রকম দায়িত্ব পালনের ব্যস্ততা থাকায় তাঁদের পক্ষে নির্ধারিত সময়ে তদন্ত শেষ করা সম্ভব হয় না। ফলে দ্রুত ন্যায়বিচার পাওয়া যায় না। অন্যদিকে আদালতে রাষ্ট্রপক্ষে মামলা পরিচালনা করেন সরকারি আইনজীবীরা। বাংলাদেশ ল অফিসার্স অর্ডার-১৯৭২ অনুযায়ী এই আইনজীবীদের নিয়োগ দেওয়া হয় চুক্তিভিত্তিক। দক্ষতা বিবেচনায় নয়, এই নিয়োগ হয়ে থাকে সাধারণত রাজনৈতিক বিবেচনায়। সরকারি আইনজীবীদের অদক্ষতার কারণে বেশির ভাগ মামলায় সরকার পরাজিত হয়। সরকার বদল হলে নিয়োগের চুক্তি বাতিল হওয়ায় পুরনো মামলা পরিচালনার জন্যও নতুন নিয়োগ পাওয়া আইনজীবীরা আগ্রহ দেখান না। ফলে পুরনো মামলাগুলো চলে যায় হিমাগারে। এভাবে একদিকে মামলাজট বাড়ে, অন্যদিকে ন্যায়বিচার থেকে বঞ্চিত হয় বিচারপ্রার্থীরা।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, ২০০২ সালে স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার উদ্যোগ নিয়েছিল সরকার। আইন কমিশনের মতামত নিয়ে এ-সংক্রান্ত আইনের একটি খসড়াও তৈরি করেছিল আইন মন্ত্রণালয়। সেটি আর চূড়ান্ত হয়নি। এরপর ২০০৮ সালে তত্ত্বাবধায়ক সরকারের আমলে ‘স্থায়ী অ্যাটর্নি সার্ভিস’ অধ্যাদেশ প্রণয়ন করা হয়। সেটিও কোনো কাজে আসেনি। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার দেওয়া আশ্বাসের পরিপ্রেক্ষিতে তৈরি করা হয় আইনের খসড়া। গত বছর মন্ত্রিসভা সেটি অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। এরপর এটি আর আলোর মুখ দেখেনি। আলাদা তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ২০১১ সালে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের সুপারিশ করেছিল আইন কমিশন। সেই সুপারিশও বাস্তবায়িত হয়নি।

বাংলাদেশ বার কাউন্সিলের ভাইস চেয়ারম্যান আব্দুল বাসেত মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ফৌজদারি মামলা পরিচালিত হয় ফৌজদারি কার্যবিধি-১৮৯৮ অনুযায়ী। এই বিধানে পুলিশকে  মামলা তদন্তের এখতিয়ার দেওয়া আছে। তবে এখন সময় এসছে এই বিধি সংশোধনের। ব্রিটিশরা ফৌজদারি কার্যবিধিতে পুলিশকে তদন্তের ক্ষমতা দিয়ে তাদের সুবিধামতো কাজ করতে চেয়েছে। কিন্তু এখন বিশ্বের প্রায় দেশেই পৃথক তদন্ত সংস্থা রয়েছে। আমাদের দেশে আন্তর্জাতিক অপরাধ ট্রাইব্যুনালের জন্য পৃথক তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা করেছে সরকার। ফলে মানবতাবিরোধী অপরাধের মামলায় বেশ দ্রুতই তদন্ত সম্পন্ন করে বিচার শুরু করা সম্ভব হচ্ছে। এ রকম অন্যান্য মামলা তদন্তের জন্যও সরকার পৃথক তদন্ত সংস্থা করতে পারে। তাহলে খুব দ্রুত মামলার তদন্ত সম্পন্ন করে তার বিচারকাজ শুরু সম্ভব হবে। ’ তিনি বলেন, ‘প্রধান বিচারপতি সুরেন্দ্র কুমার সিনহা মামলা দ্রুত নিষ্পত্তির জন্য মহাপরিকল্পনা নিয়েছেন। কিন্তু তদন্ত সম্পন্ন করতে না পারলে কিভাবে বিচার শুরু হবে আর কিভাবে প্রধান বিচারপতির মহাপরিকল্পনা বাস্তবায়ন হবে?’ তাই মামলার তদন্তকাজ করতে পৃথক তদন্ত সংস্থা গঠন করার জন্য আইন মন্ত্রণালয় ও স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান আব্দুল বাসেত মজুমদার।

আইন কমিশনের সদস্য ড. এম শাহ আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘২০১১ সালে ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য আলাদা তদন্ত সংস্থা প্রতিষ্ঠা করতে ফৌজদারি কার্যবিধি সংশোধনের জন্য সরকারের কাছে একটি সুপারিশ করেছিল আইন কমিশন। ফৌজদারি মামলা তদন্তের জন্য বিভিন্ন দেশে স্বতন্ত্র তদন্ত সংস্থা রয়েছে, যেমন যুক্তরাষ্ট্রে ফেডারেল ব্যুরো অব ইনভেস্টিগেশন (এফবিআই)। এ রকম আমাদের দেশেও করা এখন সময়ের দাবি। ’ তিনি বলেন, ‘রাজনৈতিক অস্থিরতায় পুলিশের কাজ বেড়ে যাওয়ায় মামলার তদন্তকাজ তেমন গতি পাচ্ছে না। এ ছাড়া আমাদের দেশে পুলিশের সংখ্যা অনেক কম। ফলে তাদের অতিরিক্ত কাজ হিসেবে মামলার তদন্তকাজ করতে গিয়ে সময় বেশি ব্যয় হচ্ছে। ’

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, বিভিন্ন আলোচিত মামলায় সরকার হেরে গেলে পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস করার উদ্যোগ নেয় আওয়ামী লীগ নেতৃত্বাধীন মহাজোট সরকার। ২০১২ সালের সেপ্টেম্বরে সচিব কমিটির এক সভায় সচিবদের দাবির পরিপ্রেক্ষিতে অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার আশ্বাস দিয়েছিলেন প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনা। সে অনুযায়ী তৈরি করা হয় আইনের খসড়া। মন্ত্রিসভা তাতে নীতিগত অনুমোদন না দিয়ে অধিকতর পরীক্ষা-নিরীক্ষার জন্য গত বছর আইন মন্ত্রণালয়ে ফেরত পাঠায়। এরপর এটি আর আলোর মুখ দেখেনি।

আইনসচিব আবু সালেহ শেখ মো. জহিরুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠায় সরকার একটি উদ্যোগ নিয়েছে। এটি এখনো প্রক্রিয়াধীন। তিনি বলেন, পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু হলে মামলা নিষ্পত্তিতে গতি আসবে।

আইন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা গেছে, ২০১২ সালে পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস প্রতিষ্ঠার জন্য আইনের যে খসড়া তৈরি করা হয় তাতে উল্লেখ ছিল, স্নাতকোত্তর ছাড়া কোনো আইনজীবী সরকারি আইনজীবী হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার সুযোগ পাবেন না। প্রস্তাবিত আইনের খসড়ায় অতিরিক্ত অ্যাটর্নি জেনারেল পদে শতকরা ৫০ ভাগ, ডেপুটি অ্যাটর্নি জেনারেল, জেলা অ্যাটর্নি ও অতিরিক্ত জেলা অ্যাটর্নি পদে শতকরা ২৫ ভাগ চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের বিধান রাখা হয়েছিল। অবশিষ্ট পদে সরকারি কর্মকমিশনের (পিএসসি) অধীনে পরীক্ষার মাধ্যমে সরাসরি নিয়োগ দেওয়ার কথা বলা হয়। খসড়া আইনে অ্যাটর্নি সার্ভিসের প্রশাসনিক নিয়ন্ত্রণ ও তত্ত্বাবধানের জন্য একটি অধিদপ্তর গঠন করার কথা বলা হয়েছিল। এ ছাড়া অ্যাটর্নি সার্ভিসে সুপ্রিম কোর্ট ও জেলা নামে দুটি শাখার প্রস্তাব করা হয়।

সুপ্রিম কোর্টের জ্যেষ্ঠ আইনজীবী ব্যারিস্টার এম আমীর-উল ইসলাম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিশ্বের প্রায় সব দেশেই পৃথক অ্যাটর্নি সার্ভিস চালু রয়েছে। ওই দেশগুলোতে সাধারণত পরীক্ষার মাধ্যমে আদালতের অ্যাটর্নি নিয়োগ করা হয়। শুধু দেশের প্রধান সরকারি আইনজীবীসহ ওপরের স্তরে কয়েকজন সরকারি আইনজীবীকে সে দেশের রাষ্ট্রপতি বা প্রধানমন্ত্রী সরাসরি নিয়োগ দিয়ে থাকেন। ’

অবসরপ্রাপ্ত জেলা ও দায়রা জজ ইকতেদার আহমেদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘নিম্ন আদালতে সরকারি অইনজীবী নিয়োগে বর্তমান যে বিধান রয়েছে, সে অনুযায়ী জেলা জজের পরামর্শ নিয়ে সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দিতে হবে। কিন্তু তা হয় না। তিনি বলেন, জাপান, শ্রীলঙ্কা ও নেপালের মতো দেশে সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া হয় ক্যাডারভিত্তিক। অর্থাৎ যে প্রক্রিয়ায় বিচারক নিয়োগ দেওয়া হয় ওই প্রক্রিয়ায় সরকারি আইনজীবীও নিয়োগ হয়। ইকতেদার আহমেদ বলেন, সরকার ইচ্চ্ছা করলে জুডিশিয়াল সার্ভিস কমিশন অথবা পিএসসির মাধ্যমে সরকারি আইনজীবী নিয়োগের ব্যবস্থা করতে পারে। তাহলে দক্ষতাসম্পন্ন সরকারি আইনজীবী নিয়োগ দেওয়া সম্ভব হবে।


মন্তব্য