kalerkantho


সরকারি দুই সংস্থার সীমানা বিরোধে নিঃস্ব ৭ পরিবার

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদ অভিযান

তোফাজ্জল হোসেন রুবেল   

১৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



মোহাম্মদ নূরুল ইসলাম রাজধানীর মিরপুরের জাতীয় চিড়িয়াখানা স্কুলের শিক্ষক। ১৯৯৪ সালে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে লটারির মাধ্যমে মিরপুর ১ নম্বর সেকশনের এইচ ব্লকের ১৪ নম্বর রোডের ১৭ নম্বর প্লটটি পান।

কষ্ট করে পৌনে দুই কাঠার ওই প্লটের জন্য সরকারের ধার্য করা সব অর্থ পরিশোধ করেন তিনি।

এরপর নিজের প্লটে ঘর তুলে সপরিবারে বসবাস শুরু করেন নূরুল ইসলাম। বাকি জায়গায় কয়েকটি ছোট ঘর বানিয়ে নিয়ম মেনে পানি-বিদ্যুতের সংযোগ নিয়ে নিম্ন আয়ের কিছু মানুষের কাছে ভাড়া দেন। বেশ সুখেই কেটে যাচ্ছিল তাঁর দিন। হঠাৎ তাতে ব্যাঘাত ঘটে। তাঁর প্লটের মালিকানা দাবি করে জাতীয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ এবং নোটিশ ছাড়াই তাঁকে উচ্ছেদ করা হয়। তিনি অভিযোগ করেন, মালপত্র ঠিকমতো সরিয়ে নেওয়ার সুযোগও দেওয়া হয়নি তাঁকে।

স্কলাস্টিকা স্কুলের শিক্ষিকা কোহিনূর বেগম জানান, মিরপুরে একই এলাকায় ১৫ নম্বর রোডে পৌনে দুই কাঠার একটি প্লট পান তিনি। রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষের (রাজউক) কাছ থেকে নকশা অনুমোদন করে সেখানে বাড়িও করেন তিনি।

তাঁর বাড়িটিও উচ্ছেদ করেছে চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

শিক্ষিকার স্বামী রফিকুল ইসলাম বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সরকারি দুটি প্রতিষ্ঠানের সীমানা-সংক্রান্ত বিরোধের জেরে আমাদের উচ্ছেদ করা হলো। আমরা তো নিয়ম অনুযায়ী বরাদ্দ নিয়ে সরকারের সব কিস্তি পরিশোধ করে শান্তিপূর্ণভাবে বসবাস করছিলাম। জমি যদি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের হয়ে থাকে, তাহলে গৃহায়ণ কেন বরাদ্দ দিল? আর চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ ২৫ বছর পর নোটিশ না দিয়েই উচ্ছেদ করল কেন?’

এই দুজনের মতো ফজল করিম শিকদার, সৈয়দ আহসানুল হক, হেদায়েত আহমেদ রাজু, মো. নাজিম উদ্দিন ও জিয়া উদ্দিন চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদের শিকার হয়েছেন।

জানা গেছে, মিরপুরে জাতীয় চিড়িয়াখানা-সংলগ্ন প্রায় দুই একর জমি নিয়ে মুখোমুখি অবস্থানে সরকারি দুটি সংস্থা। ৬০ কোটি টাকা মূল্যের এ জমির দাবিদার জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ ও জাতীয় চিড়িয়াখানা। দীর্ঘদিন ধরে তাদের মধ্যে মালিকানা নিয়ে বিরোধ চলছে। গত ২ মার্চ ভ্রাম্যমাণ আদালতের সহযোগিতায় ওই জমির দখল নেয় চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ। এরপর গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ থেকে বরাদ্দ পাওয়া সাতটি প্লটের মালিকদের উচ্ছেদ করে তারা। ওই সব প্লটে বসবাসকারী শতাধিক লোক উচ্ছেদের শিকার হয়েছে।

গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ সূত্রের দাবি, ওই জমিতে প্লট করে প্রায় দুই যুগ আগে সরকারি বিধি মোতাবেক বরাদ্দ দেওয়া হয়েছে। রাজউক থেকে নকশা অনুমোদন করিয়ে অনেকে বাসাবাড়িও করেছেন। তাই ওই জমি চিড়িয়াখানার হওয়ার কোনো সুযোগ নেই।

মালিকানা দাবির পরিপ্রেক্ষিতে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের সচিব মো. আশরাফ হোসেন গত ১৬ ফেব্রুয়ারি জাতীয় চিড়িয়াখানার কিউরেটরের কাছে একটি চিঠি দেন। চিঠির অনুলিপি পূর্তসচিব, প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক ও ঢাকা জেলা প্রশাসকের কাছে দেওয়া হয়েছে। তাতে বলা হয়, চিড়িয়াখানার দাবি করা জমিটি (এলএ কেস ১৩) ১৯৫৯-৬০ সালে অধিগ্রহণ করা হয়। পরে জেলা প্রশাসক জমি বুঝিয়ে দিলে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ প্লট করে বিভিন্ন ব্যক্তিকে বরাদ্দ দেয়। দুই সংস্থার জমির সীমানা চিহ্নিত করতে ডিজিটাল সার্ভে প্রয়োজন। সীমানা নির্ধারণ না হওয়া পর্যন্ত বরাদ্দপ্রাপ্তদের বসবাসে বিঘ্ন ঘটালে সরকারের ভাবমূর্তি ক্ষুণ্ন হবে। কিন্তু চিঠি আমলে নেয়নি চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ।

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের উচ্ছেদের পর গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের নির্বাহী প্রকৌশলী (ঢাকা ডিভিশন-১) তানজিলা খানম ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তাদের কাছে চিঠি পাঠান। তিনি বলেন, উচ্ছেদের সংবাদ পেয়ে সংস্থার (গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষ) দুই উপবিভাগীয় প্রকৌশলী ও কর্মচারীরা ছুটে যান। ভ্রাম্যমাণ আদালতের ম্যাজিস্ট্রেট ও চিড়িয়াখানার কর্মকর্তাদের কাছে নোটিশ বা প্রয়োজনীয় কাগজপত্র দেখতে চাইলে তাঁরা অপারগতা জানান। তখন সংস্থার পক্ষে প্রয়োজনীয় গেজেট, হুকুমদখল প্রভৃতির প্রমাণ উপস্থাপন করে উচ্ছেদ থেকে বিরত থাকতে বলা হয়। কিন্তু চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ বিরত হয়নি। চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষের লোকজন গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের লোকদের সঙ্গে দুর্ব্যবহার করে বলেও চিঠিতে উল্লেখ করা হয়।

এ বিষয়ে জাতীয় গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যান খন্দকার আখতারুজ্জামান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা অনেক আগে বরাদ্দ দিয়েছি। সেখানে বরাদ্দপ্রাপ্তরা বসবাসও করছিলেন। এখন অবৈধভাবে উচ্ছেদের বিষয়ে তাঁরা আদালতের শরণাপন্ন হতে পারেন। আমরাও জেলা প্রশাসকের কাছে আবারও সঠিকভাবে সীমানা চিহ্নিত করার জন্য চিঠি দিয়েছি। আর আমাদের কর্মকর্তাদের সঙ্গে দুর্ব্যবহারের জন্য সংশ্লিষ্ট দপ্তরের দায়িত্বশীল কর্মকর্তার সঙ্গে আলাপ করে করণীয় ঠিক করব। ’

চিড়িয়াখানা কর্তৃপক্ষ দাবি করেছে, জমির বিষয়ে উচ্চ আদালতের রায় অনুকূলে পাওয়ার পর আর কোনো বাধা থাকে না। তাই উচ্ছেদ অভিযান চালানো হয়েছে।

প্রাণিসম্পদ অধিদপ্তরের আইন কর্মকর্তা ও জাতীয় চিড়িয়াখানার সম্পত্তি কর্মকর্তা (চলতি দায়িত্ব) অসীম কুমার দাস বলেন, ‘আমরা কারো সঙ্গে দুর্ব্যবহার বা রূঢ় আচরণ করিনি। কাউকে অবৈধভাবে উচ্ছেদও করিনি। উচ্চ আদালতে মামলা মোকাবিলা করে আমরা জমি দখলে নিয়েছি। ’

গৃহায়ণ ও গণপূর্ত মন্ত্রণালয়ের সদ্য দায়িত্বপ্রাপ্ত সচিব শহিদ উল্লা খন্দকার বলেন, ‘চিড়িয়াখানার সঙ্গে সীমানা নিয়ে বিরোধ দেখা দিলে একটি যৌথ সার্ভে করার সিদ্ধান্ত হয়। এতে কারো দ্বিমত ছিল না। কিন্তু সার্ভে না করেই হঠাৎ করে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের বরাদ্দ দেওয়া প্লটে থাকা লোকজনকে উচ্ছেদ করা বিধিসম্মত হয়নি। এ বিষয়ে গৃহায়ণ কর্তৃপক্ষের চেয়ারম্যানের সঙ্গে কথা বলে পরবর্তী করণীয় ঠিক করব। ’


মন্তব্য