kalerkantho

26th march banner

‘মার্কা খুঁজবাম এমপি ইলেকশনে, অহন না’

শফিক আদনান, কিশোরগঞ্জ   

১৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



‘মার্কা খুঁজবাম এমপি ইলেকশনে, অহন না’

‘এই ডো তো রাজার নির্বাচন না, হেই নির্বাচনের সময় দলের মার্কার লাইগ্যা জান দিয়াম। কিন্তু এইডাত আমরার মতো ভোট দিয়াম। কারণ গ্রামে এত দলফল মাইনসে বুজে না। ’—এ কথা কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার দানাপাটুলি ইউনিয়নে ভোটার মহরম আলীর। শুধু তিনিই নন, একই ধরনের বক্তব্য যশোদল ইউনিয়নের ভোটার মো. জাকিরের। তিনি বলেন, ‘মার্কা খুঁজবাম এমপি ইলেকশনে, অহন না। গ্রামের ইলেকশনে ব্যক্তি ও যোগ্যতাই আমরা দেখবাম। ’

ভোটার মহরম আলীর সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক। কিন্তু দলীয় মনোনয়ন যাকে দেওয়া হয়েছে সে প্রার্থী তাঁর পছন্দ নয়। ফলে ভোট দেবেন বিদ্রোহী প্রার্থীকে। ভোটার মো. জাকির জানান, বিএনপির সমর্থক কিন্তু তিনি সেই প্রার্থীকে ভোট দিতে চান যাঁর এলাকায় ব্যক্তি ইমেজ রয়েছে। শুধু দলীয় মনোনয়ন পাওয়া প্রার্থীকে ভোট দেবেন না।

কিশোরগঞ্জ সদর উপজেলার ১১টি ইউনিয়নে নির্বাচন হতে যাচ্ছে আগামী ২২ মার্চ। বিচ্ছিন্ন ঘটনা ছাড়া এসব ইউনিয়নে চলছে শান্তিপূর্ণ প্রচার-প্রচারণা। তবে দলীয় প্রার্থী মনোনয়ন নিয়ে আওয়ামী লীগ ও বিএনপির তৃণমূল নেতাকর্মী ও সাধারণ ভোটারদের মধ্যে রয়েছে চাপা ক্ষোভ। উপজেলার প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের একাধিক প্রার্থী রয়েছেন। ফলে দলীয় ভোটব্যাংকের হিসাব-নিকাশ তা হয়তো ঠিক থাকবে না। ভোটাররা দলের মনোনয়নের চেয়ে ব্যক্তি ইমেজকে বেশি প্রাধান্য দিচ্ছেন।

এই নিয়ে আওয়ামী লীগের অভ্যন্তরে বাড়ছে কোন্দল। ভোটাররা মনে করছেন, মনোনীত ও বিদ্রোহী প্রার্থী হওয়ায় ভোটাররা ভাগ হয়ে যাবেন। আর এ কারণেই দলীয় প্রার্থীদের পরাজয় হতে পারে। বিশেষ করে জনপ্রশাসনমন্ত্রী ও আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিজ উপজেলায় দলীয় চেয়ারম্যান প্রার্থীরা রয়েছেন এমনই বেকায়দায়। গত দুই দিন ইউনিয়নগুলোতে সরেজমিন ঘুরে প্রার্থী ও ভোটারদের সঙ্গে কথা বলে এসব তথ্য জানা গেছে।

জেলা আওয়ামী লীগের দুজন নেতা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, ‘যোগ্য ও একক প্রার্থী দেওয়া সম্ভব হলে আমরা পৌর নির্বাচনের মতো সবগুলোতেই সহজে জয়ী হতাম। ’ কিন্তু সব ইউনিয়নে একাধিক প্রার্থী থাকায় দল হিসেবে বেকায়দায় রয়েছে আওয়ামী লীগ।

জনপ্রশাসনমন্ত্রী সৈয়দ আশরাফুল ইসলামের নিজের ইউনিয়ন যশোদলের মণিপুরিঘাট এলাকায় গিয়ে দেখা যায়, বেশ কয়েকজন ভোটার একটি চায়ের দোকানে বসে নির্বাচনী আলাপ করছিলেন। তাঁদের একজন কাঞ্চন মিয়া। তিনি আওয়ামী লীগের সমর্থক। কিন্তু তিনি ভোট দেবেন দলের বিদ্রোহী প্রার্থীকে। কেন? উত্তরে বলেন, ‘বিদ্রোহী প্রার্থী ইমতিয়াজ সুলতান রাজনের বাবা ছিলেন আওয়ামী লীগের ত্যাগী নেতা। তিনি সৈয়দ আশরাফের বাবার সঙ্গে রাজনীতি করেছেন। ’

বিন্নাটি ইউনিয়নে গিয়ে জানা যায়, বর্তমান চেয়ারম্যান শফিকুল ইসলাম আওয়ামী লীগের টিকিট না পেয়ে বিদ্রোহী হিসেবে লড়ছেন। তাঁর অবস্থা অন্যান্য প্রার্থীর চেয়ে ভালো বলে দাবি করেছেন তিনি। এখানে আওয়ামী লীগের প্রার্থী আজহারুল ইসলাম বাবুল। বিএনপির প্রার্থী সাবেক চেয়ারম্যান এ এইচ এম লুত্ফুল বারী খোকন। এ ছাড়া প্রার্থী হয়েছেন এ বি এম মহিউদ্দিন আহমেদ বাদল, মো. আখতারুজ্জামান ও মো. মামুনুর রহমান ভূঁইয়া। তাঁরা সবাই আওয়ামী লীগের সমর্থক। ফলে ভোট ভাগ-বাটোয়ারা হয়ে এখানে জয়-পরাজয়ের হিসাব একটু ভিন্নই।

চৌদ্দশত ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে প্রার্থী হয়েছেন পাঁচজন। এর মধ্যে আওয়ামী লীগের দুজন ও বিএনপির তিনজন। তাঁরা হলেন আওয়ামী লীগ প্রার্থী এ বি ছিদ্দিক খোকা। দলের মনোনয়ন না পেয়ে স্বতন্ত্র হিসেবে লড়ছেন মো. শাহজাহান। বিএনপির মনোনয়ন নিয়ে লড়ছেন আমিনুল হক রতন। বর্তমান চেয়ারম্যান মো. আবদুল করিম বিএনপির মনোনয়ন চেয়ে পাননি। ফলে তিনি স্বতন্ত্র হিসেবে মাঠে আছেন। চৌদ্দশত উত্তরপাড়ার আবদুল কাইয়ুম, মুর্শিদ মিয়া জানান, তাঁরা দলীয় প্রার্থীকে ভোট দেবেন না, স্বতন্ত্র প্রার্থী শাহজাহান পাবেন তাঁদের ভোট।

কর্শাকড়িয়াইল ইউনিয়নে প্রার্থী সাতজন। আওয়ামী লীগ থেকে মনোনয়ন পেয়েছেন মো. বদর উদ্দিন। বিদ্রোহী আছেন আরো চারজন। মনাকর্শা, চিকনিরচর, কড়িয়াইল ও বাদেকড়িয়াল গ্রামের কয়েকজন ভোটার জানান, নৌকা ও ধানের শীষের তীব্র লড়াই হবে। তবে আওয়ামী লীগের বেশ কয়েকজন প্রার্থী থাকায় দলীয় প্রার্থী খুবই বেকায়দায় আছেন।

দানাপাটুলি ইউনিয়নে আওয়ামী ও বিএনপি দুই দলই ঝামেলায় আছে বিদ্রোহী প্রার্থী নিয়ে। এখানে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের দুজন ও বিএনপির দুজন ও জাতীয় পার্টির একজন প্রার্থী রয়েছেন। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, এখানে ভোটের হিসাবে আঞ্চলিকতা বড় ফ্যাক্টর হিসেবে কাজ করবে। সবাই নিজ নিজ এলাকার ভোট ধরে রেখে অন্য এলাকা থেকে ভোট টানার চেষ্টা করছেন।


মন্তব্য