kalerkantho

সোমবার। ২৩ জানুয়ারি ২০১৭ । ১০ মাঘ ১৪২৩। ২৪ রবিউস সানি ১৪৩৮।


বিধি মানছে না আরইবি

২০০ কোটি টাকার কাঠের খাম্বা কেনার চেষ্টা

আরিফুজ্জামান তুহিন   

১৭ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিদ্যুৎ বিতরণে ব্যবহৃত একটি স্টিলের পুল বা খাম্বার স্থায়িত্ব ৫০ বছর। আর একটি কাঠের খাম্বার স্থায়িত্ব ২০ থেকে ২৫ বছর।

স্থায়িত্ব বাড়াতে কাঠের খাম্বায় ক্ষতিকারক যে রাসায়নিক মেশানো হয় তা মাটির মাধ্যমে ভূগর্ভস্থ পানির স্তরে গিয়ে পৌঁছায়। এতে পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা যায় বেড়ে। এসব বিবেচনায় সারা পৃথিবীতেই এখন বিদ্যুৎ বিতরণ ব্যবস্থায় স্টিলের খাম্বার চল। বাংলাদেশে বিদ্যুৎ বিতরণ সংস্থাগুলোও স্টিলের খাম্বা ব্যবহার করছে। তবে সরকারের বিষদ প্রকল্প প্রস্তাবনা বা ডিপিপিতে (ডিটেইল প্রজেক্ট প্রপোজাল) বলা আছে, খাম্বা কেনার দরপত্রে স্টিল ও কাঠের খাম্বার কথা আলাদাভাবে উল্লেখ করতে হবে। তবে এসবের তোয়াক্কা না করে বাংলাদেশ পল্লী বিদ্যুতায়ন উন্নয়ন বোর্ড (আরইবি) সম্প্রতি ২০০ কোটি টাকার কাঠের খাম্বা কেনার দরপত্র আহ্বান করেছে। দরপত্রে স্টিলের খাম্বা কেনার কথা উল্লেখ করা হয়নি।

সংশ্লিষ্টরা বলছেন, ২০০ কোটি টাকা ব্যয়ে কাঠের খাম্বা কেনা হলে এর স্থায়িত্ব হবে কম আর এ ধরনের কাঠের খাম্বা ভূগর্ভস্থ পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। ফলে কোটি কোটি মানুষ স্বাস্থ্যঝুঁকিতেও পড়ে। অন্যদিকে স্টিলের খাম্বার স্থায়িত্বকাল যেমন বেশি তেমনি নেই পরিবেশের কোনো ঝুঁকি।

তবে এমন ব্যাখ্যা মানতে রাজি নয় আরইবি। তাদের মতে, ডিপিপিতে কাঠ ও স্টিল উল্লেখ আছে ঠিকই তবে দরপত্রে উভয় ধরনের খাম্বার কথা উল্লেখ করলে এটির মূল্যায়ন করা জটিল হয়ে যাবে। কারণ কাঠের দামের সঙ্গে স্টিলের খাম্বার দামের পার্থক্য রয়েছে। এ কারণে শুধু কাঠের খাম্বাই দরপত্রে উল্লেখ করা হয়েছে।

জানা গেছে, সরকার এক বছরের মধ্যে ১৫ লাখ গ্রাহককে বিদ্যুৎ সংযোগ দেওয়ার পরিকল্পনা হাতে নিয়েছে। এসব গ্রাহকের সবাই আরইবি এলাকার। এ জন্য আরইবি নতুন এলাকায় বিদ্যুৎ বিতরণ অবকাঠামো নির্মাণ করতে হবে। এরই অংশ হিসেবে সংস্থাটি গত ১৫ ফেব্রুয়ারি একটি দরপত্র আহ্বান করে। ওই দরপত্রে ৯৩ হাজার ১৯৪টি খাম্বার কথা উল্লেখ করা হয়, যার সবগুলোই কাঠের। এ দরপত্রে স্টিলের খাম্বার উল্লেখ নেই। এসব খাম্বার মূল্যমান ১৯৩ কোটি ৩৬ লাখ ১৭ হাজার টাকা। দরপত্রে কাঠের খাম্বার পাশাপাশি স্টিলের খাম্বার কথা উল্লেখ না থাকায় একক প্রতিষ্ঠান দরপত্রে অংশ নেবে। কারণ দেশে কাঠের খাম্বা মাত্র একটি প্রতিষ্ঠান আমদানি করে থাকে। এতে প্রতিযোগিতা থাকবে না। খোদ বিদ্যুৎ, জ্বালানি ও খনিজসম্পদ প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদ চিঠি দিয়ে আরইবির চেয়ারম্যানকে দরপত্রে এমন ‘ত্রুটি’র কথা জানান।

গত ১৪ ফেব্রুয়ারি প্রতিমন্ত্রী নসরুল হামিদের লেখা আরইবির চেয়ারম্যান মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিনকে লেখা ওই চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ‘১৫ লাখ গ্রাহকের সংযোগের জন্য গ্রামাঞ্চলে বিদ্যুৎ সম্প্রসারণের লক্ষ্যে যে প্রকল্প নেওয়া হয়েছে তাতে ৯৩ হাজার ১৯৪টি খাম্বা দরকার। ওই খাম্বা সংগ্রহের জন্য যে দরপত্র ডকুমেন্ট প্রস্তুত করা হচ্ছে তাতে ডিপিপির ব্যত্যয় ঘটিয়ে এককভাবে কাঠের খাম্বা সংগ্রহের চেষ্টা করা হচ্ছে। দরপত্রে মুক্ত ও অবাধ প্রতিযোগিতা নিশ্চিত করার লক্ষ্যে খাম্বা সংগ্রহের জন্য যেন ডিপিপি অনুযায়ী কাঠ ও স্টিল (কাঠ/স্টিল) উল্লেখ করার বিষয়টি নিশ্চিত করা হয়। ’ প্রতিমন্ত্রীর এ চিঠির এক দিন পরেই দরপত্র আহ্বান করা হয় শুধু কাঠের খাম্বার কথা উল্লেখ করেই।

এ বিষয়ে জানতে চাইলে আরইবির চেয়ারম্যানের মেজর জেনারেল মঈন উদ্দিন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিষয়টি যেভাবে উপস্থাপন করা হচ্ছে আদতে সে রকম নয়। স্টিলের খাম্বার দাম বেশি আর কাঠের খাম্বার দাম কম। এখন দুই দামের দুই ধরনের খাম্বা একই দরপত্রে আহ্বান করা হলে এটির মূল্যায়ন করা কোনোভাবেই সম্ভব নয়। ডিপিপি মেনেই দরপত্র আহ্বান করা হয়েছে। এখানে বিধানের কোনো ব্যত্যয় ঘটেনি। ’ এক প্রশ্নের জবাবে তিনি বলেন, ‘এবার কাঠের খাম্বা কেনা হচ্ছে, সামনে আমাদের আরো খাম্বা দরকার হবে, তখন আমরা স্টিলের খাম্বা কেনার জন্য দরপত্র আহ্বান করব। ’

কাঠের খাম্বা পরিবেশের জন্য ক্ষতিকর : জানা গেছে, ১৯৭৯ সালের দিকে আরইবি গ্রামাঞ্চলে কাঠের খাম্বার ব্যাপক বিস্তৃতি ঘটায়। কাঠের খাম্বা যেন পানি ও মাটিতে নষ্ট না হয় সে জন্য এটির গায়ে ক্রমটেড কপার আর্সেনিকের (সিসিএ) প্রলেপ দেওয়া হয়। এর সঙ্গে আরো থাকে ক্রমটেড কপার আর্সেনেট (এসিএ) ও অ্যামোনিয়াকাল (ধসসড়হরপধষ) কপার জিংক আর্সেনিক (এসিজিএ)। এসব রাসায়নিক দ্বারা কাঠের খাম্বাকে দীর্ঘস্থায়ী করা হয়। কাঠের খাম্বা যখন মাটিতে পোঁতা হয় তখন এটি থেকে সিসিএ, এসিএ ও এসিজিএ মাটিতে প্রবেশ করে; এরপর তা ভূ-অভ্যন্তরের পানিতে আর্সেনিকের মাত্রা বাড়িয়ে দেয়। এ কারণে পৃথিবীর বহু দেশে পরিবেশ ক্ষতিকারক এসব কাঠের খাম্বা ব্যবহার করা হয় না।


মন্তব্য