kalerkantho


পদ্মা সেতু প্রকল্প

মূল কাজের ২৩ শতাংশ সম্পন্ন

মো. মাসুদ খান, মুন্সীগঞ্জ   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জাজিরা প্রান্তে পদ্মা সেতুর মূল কাজ শুরু হচ্ছে শিগগির। ওই প্রান্তে পাইলিংয়ের চূড়ান্ত প্রস্তুতি চলছে; টেস্ট পাইলিং প্রায় শেষ।

পাইল বসাতে ৩৯ নম্বর পিলার-পয়েন্টে বিশেষ মঞ্চ তৈরি করা হয়েছে। সপ্তাহখানেকের মধ্যে কাজ শুরুর কথা রয়েছে। ৩৭, ৩৮ ও ৩৯ নম্বর পিলারের জন্য পাইল বসানোর কাজ একসঙ্গেই শুরু হবে।

মাওয়া প্রান্তে ৬ ও ৭ নম্বর পিলারের কাজও দ্রুত এগিয়ে চলেছে। নদীশাসনের জন্য জাজিরা প্রান্তে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। সেতুর ম্যানেজমেন্ট কনসালট্যান্ট গত বৃহস্পতিবার প্রকল্প এলাকায় অবস্থান নিয়েছে এবং দায়িত্ব পালন শুরু করেছে। এ দায়িত্ব পেয়েছে যুক্তরাজ্যের প্রতিষ্ঠান হাই-পয়েন্ট রেন্ডেল। টিমের নেতৃত্বে রয়েছেন রেন্ডেলের ব্যবস্থাপনা পরিচালক ভার্ডাম্যান জোনস। বাংলাদেশ, যুক্তরাজ্য, জাপান ও ভারতের মোট ১০ জনকে নিয়ে এই টিম।

মূল সেতুর ২৩ শতাংশ কাজ শেষ হয়েছে। মোট কাজ হয়েছে গড়ে ৩১ শতাংশের বেশি। বর্ষার আগেই মূল সেতুর কাজ ৩০ শতাংশে উন্নীত করার চেষ্টা চলছে। সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, বর্ষায় মূল কাজ অব্যাহত রাখার জন্য প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। মাদারীপুরের শিবচর উপজেলার করলী গ্রামে নতুন কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড তৈরির কাজ চলছে পুরোদমে। বর্ষায় সেখান থেকেই মূল সেতুর কাজ করা হবে। চর কেটে সেখানে একটি ধারা তৈরি করা হয়েছে। সেখানে স্রোত কম থাকবে। ফলে আশপাশের পিলারগুলোর কাজ এগিয়ে নেওয়া সহজ হবে।

করলী চরে নদীতীর ঘেঁষে শেড তৈরির কাজ চলছে। পাশেই বড় বড় পাইল স্তূপ করে রাখা হচ্ছে। এগুলো আনা হচ্ছে মাওয়া ওয়ার্কশপ থেকে। ক্রেন প্রভৃতি ভারী যন্ত্রপাতি আনা হচ্ছে। নদীশাসনের কাজের গতি আরো বেশি। মাঝের চরে হাজার হাজার জিওব্যাগ তৈরি করা হচ্ছে প্রতিদিন। এগুলো নিয়ে ফেলা হচ্ছে মাওয়ার কাছে। বর্ষায় পদ্মাকে বশে রাখার জন্যই এত তোড়জোড়।

কাজের অগ্রগতি দেখার জন্য গত শনিবার সেতু সচিব খন্দকার আনোয়ারুল ইসলাম প্রকল্প এলাকা পরিদর্শন করেছেন। আগামী শনিবারের নিয়মিত সভায় যোগ দিতে আবার মাওয়ায় আসার কথা রয়েছে তাঁর। বিশাল এই প্রকল্পের কাজ বিশেষভাবে তদারকি করা হচ্ছে।

গত শুক্রবার প্রধানমন্ত্রীর একান্ত সচিব সাজ্জাদুল হাসান প্রকল্প এলাকা ঘুরে গেছেন। সভা করে তাঁর পর্যবেক্ষণের কথা জানিয়েছেন। সমস্যা ও সমাধান—সব বিষয়েই আলোচনা হয়েছে ওই সভায়।

মাওয়ার পাশে কুমারভোগের মূল কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ড থেকে করলী চরের সাপ্লিমেন্টারি কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডের দূরত্ব প্রায় চার কিলোমিটার। সেতুর ৩৫ নম্বর পিলারের কাছে এর অবস্থান। কাজে আরো গতি আনতে এ বছরই ১৬ শ কিলোজুল ক্ষমতার একটি হ্যামার এবং এক হাজার টন ওজনের আরেকটি ভাসমান ক্রেন যুক্ত করা হবে।

সেতু কর্তৃপক্ষ জানিয়েছে, কাজের অগ্রগতিতে প্রধানমন্ত্রীর দপ্তর সন্তোষ প্রকাশ করেছে। মূল সেতুর কাজ ২৩ শতাংশ, নদীশাসনের কাজ ১৭ দশমিক ১১ শতাংশ, মাওয়া প্রান্তের অ্যাপ্রোচ রোডের (সংযোগ সড়ক) ৬৫ শতাংশ, জাজিরা প্রান্তের অ্যাপ্রোচ রোডের কাজ ৬০ শতাংশ এবং সার্ভিস এরিয়ার কাজ প্রায় ৭২ শতাংশ শেষ হয়েছে।

সংশ্লিষ্ট প্রকৌশলীরা জানান, মূল সেতুর পিলারের জন্য পাইল বসানোর কাজ চলছে। একেকটি পাইলের দৈর্ঘ্য ৭০ মিটার। তবে বর্ষায় পদ্মায় ৪০ থেকে ৪৫ মিটার পর্যন্ত মাটি সরে যাওয়ার রেকর্ড আছে। সে ক্ষেত্রে পাইলের পড়ে যাওয়ার আশঙ্কা রয়েছে। এটি বিবেচনায় রেখে সব পাইল আরো ৫০ মিটার বাড়ানো হবে। ১২০ মিটারের ছয়টি পাইল বসে যাওয়ার পর সেগুলোর ওপর কাঠামো নির্মাণ করা হবে, তবেই পূর্ণতা পাবে একটি পিলার।

নদীশাসনের প্রয়োজনে এ পর্যন্ত ১২৫ কেজি ওজনের তিন লাখ জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে নদীতে। ৮ শ কেজি ওজনের তিন লাখ ৭২ হাজার জিওব্যাগ ফেলা হয়েছে। মাওয়া প্রান্তে ৮ শ কেজি ওজনের আরো তিন লাখ জিওব্যাগ ফেলা হবে শুষ্ক মৌসুমে। ২৪ লাখ সিসি ব্লক ফেলার জন্য প্রস্তুত রাখা হয়েছে। ৮ শ কেজির বাকি জিওব্যাগ ফেলার কাজ শেষ হলেই ব্লকগুলো ফেলা হবে। মাওয়া প্রান্তে চার লাখ ঘনমিটার বালু ড্রেজিং করা হয়েছে। মাওয়া প্রান্তে ড্রেজিং আর লাগবে না। এ ছাড়া মাওয়া প্রান্তে ৩৫ লাখ বালুভর্তি প্লাস্টিকের বস্তা ফেলে নদীতলের বড় বড় গর্ত ভরাট করা হয়েছে।

জাজিরা প্রান্তে কাওড়াকান্দি থেকে মাঝিকান্দি পর্যন্ত নদীশাসনের কাজের সুবিধার্থে ১০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি সড়ক তৈরি করা হচ্ছে। ইতিমধ্যে দুই দশমিক দুই কিলোমিটারের কাজ শেষ হয়েছে। ওই প্রান্তে ড্রেজিং করে সাত লাখ ঘনমিটার বালু অপসারণ করা হয়েছে। সিসি ব্লক তৈরি করার মেশিনগুলো আপাতত বন্ধ হয়েছে। তবে ম্যানুয়েলি কাজ চলছে। কনস্ট্রাকশন ইয়ার্ডে জায়গার অভাবে মেশিনগুলো চালানো যাচ্ছে না বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন। পুরো নদীশাসনের কাজে প্রায় সাড়ে সাত কোটি ব্লক ব্যবহার করা হবে।

ছয় দশমিক ১৫ কিলোমিটার দীর্ঘ ও ২২ মিটার চওড়া সেতুটিতে মোট ৪১টি স্প্যান থাকবে। প্রতিটি স্প্যানের দৈর্ঘ্য ১৫০ মিটার। সেতুর মূল অবকাঠামো স্টিল দিয়ে তৈরি করা হচ্ছে। এতে ওজন কম হবে। বায়ুপ্রবাহ ও ভূমিকম্পজনিত ধাক্কা সামলাতে বেছে নেওয়া হয়েছে ওয়ারেন ট্রাস ফর্ম। সেতুর ভার বহন করবে মোট ৪২টি পিলার।

এলাকার সংসদ সদস্য অধ্যাপিকা সাগুফতা ইয়াসমিন বলেন, বর্ষায়ও সেতুর কাজ চলবে যথারীতি, সেভাবেই এগোচ্ছে সব কিছু। তিনি বলেন, ‘আমার নির্বাচনী এলাকায় এত বড় কর্মযজ্ঞ চলছে, ভাবতেও গর্ব হয়। ’


মন্তব্য