kalerkantho

25th march banner

গর্বের রিজার্ভই কাল হলো

আবুল কাশেম   

১৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ড. আতিউর রহমান গভর্নর হিসেবে নিয়োগ পাওয়ার পর থেকে ফুলে-ফেঁপে উঠছিল বাংলাদেশের বৈদেশিক মুদ্রার রিজার্ভ। তাঁর মেয়াদের সাড়ে সাত বছরে রিজার্ভের অঙ্ক বেড়ে চার গুণ হয়েছে। পাকিস্তানকে পেছনে ফেলা তো বটেই, উচ্চ রিজার্ভের হিসাবে ভারতের পরই দ্বিতীয় স্থানে চলে আসে বাংলাদেশ। ফলে দেশের ক্রেডিট রেটিং বাড়তে থাকে। বড় রিজার্ভে ভর করে পদ্মা সেতুর মতো বিশাল প্রকল্প নিজস্ব অর্থায়নে বাস্তবায়ন শুরু করে সরকার। মোটকথা গর্বের সেই রিজার্ভ বাংলাদেশকে সব ক্ষেত্রে শুধুু স্বস্তিই দিয়েছে এত দিন ধরে। এবারে সেই রিজার্ভ থেকে ১০ কোটি ১০ লাখ ডলার চুরি হওয়ার ঘটনা বড় অস্বস্তির কারণ হয়ে উঠেছে। সরকারের ‘রাজকোষ’ নামে পরিচিত বৈদেশিক মুদ্রার এই রিজার্ভ চুরি কেবল ব্যাংকিং খাতের অব্যবস্থাপনার নির্দেশকই নয়, রিজার্ভ ব্যবস্থাপনায় অদক্ষতার চিত্রও প্রকটভাবে তুলে ধরেছে।

২০০৯ সালের ১ মে গভর্নর আতিউর রহমান যখন বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর হিসেবে যোগ দেন, তখন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল ৬ দশমিক ৫ (৬৫০ কোটি) বিলিয়ন ডলার। ওই বছরের ডিসেম্বরেই তা ১০ বিলিয়ন ডলারের মাইলফলক স্পর্শ করে। এতে আনন্দোৎসব করে বাংলাদেশ ব্যাংক ঢাকার পাঁচতারা হোটেলে জমকালো অনুষ্ঠান আয়োজনের মাধ্যমে। গতকাল বুধবার আতিউর রহমান যখন পদত্যাগ করলেন, তখন এই রিজার্ভের পরিমাণ ২৭ দশমিক ৮২ বিলিয়ন ডলার। দিন পনের আগে এর আকার আরো বেশি ছিল, ২৯ ফেব্রুয়ারি ২৮ বিলিয়ন ছাড়িয়ে গিয়েছিল।

মূলত এই রিজার্ভের উৎস প্রবাসী শ্রমিকদের পাঠানো রেমিট্যান্স, রপ্তানি আয়, বিদেশি বিনিয়োগ ও ঋণ আর অনুদানে পাওয়া বৈদেশিক মুদ্রা। তা থেকে আমদানি ব্যয়, বিদেশি ঋণ-অনুদানের কিস্তি পরিশোধ ও অন্যান্য প্রয়োজনে বৈদেশিক মুদ্রা ব্যয় করার পর অবশিষ্ট অর্থ বাংলাদেশ ব্যাংকের কাছে জমা থাকে। এটাই রিজার্ভ। বাংলাদেশ ব্যাংক ওই অর্থের কিছু অংশ দিয়ে বিদেশে বন্ড কিনে রেখেছে, স্বর্ণ কিনে বিনিয়োগ করেছে। বাকিটা ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক অব নিউ ইয়র্কে চলতি অ্যাকাউন্টে রাখা আছে। এই অ্যাকাউন্টে থাকা রিজার্ভ

থেকেই সরকারের বিদেশি দায় ও বিল পরিশোধ করা হয়। আর সেখান থেকেই চুরি হয়ে গেছে বিশাল অঙ্কের মুদ্রা।

গতকাল গভর্নরের পদ থেকে সরে দাঁড়ানোর পর সাংবাদিকদের উদ্দেশে আতিউর রহমান বলেন, ‘বাংলাদেশ ব্যাংককে আমি আমার সন্তানের মতো দেখেছি। খনি শ্রমিকের মতো তিলে তিলে ২৮ বিলিয়ন ডলার রিজার্ভ গড়ে তুলেছি। সেই ডলার হারিয়ে যাবে আমার অবহেলায়, তা বিশ্বাস করতেও আমার কষ্ট হয়। ’

অর্থনীতিবিদরা বলছেন, রিজার্ভের মালিক সরকার বা জনগণ। বাংলাদেশ ব্যাংক এর ব্যবস্থাপক বা ম্যানেজার। কিন্তু ব্যবস্থাপনায় ত্রুটি থাকার কারণেই এটি চুরি করা সম্ভব হয়েছে। কারণ ফেডারেল রিজার্ভ ব্যাংক জানিয়েছে, তাদের সিস্টেমে কোনো ত্রুটি নেই বা হ্যাকিংয়ের ঘটনাও ঘটেনি। ব্যবস্থাপনা ব্যর্থতার দায় নিয়ে গতকাল পদত্যাগ করতে হয়েছে, উচ্চ রিজার্ভের জন্য যিনি সবচেয়ে বেশি গর্বিত ছিলেন সেই আতিউর রহমানকে। বাংলাদেশ ব্যাংকের আরো দুই ডেপুটি গভর্নর আবুল কাশেম ও নাজনীন সুলতানাকে বরখাস্ত করা হয়েছে। দপ্তর হারিয়ে ওএসডি হয়েছেন ব্যাংক ও আর্থিক প্রতিষ্ঠান বিভাগের সচিব। সরকারের উচ্চ পর্যায় থেকে আইনশৃঙ্খলা রক্ষাকারী বাহিনীকে নির্দেশনা দেওয়া হয়েছে সুষ্ঠু তদন্তের মাধ্যমে দোষীদের শনাক্ত করে কঠোর ব্যবস্থা নিতে। বিশ্বজুড়েও আলোচনায় জায়গা পেয়েছে বাংলাদেশের রিজার্ভ চুরির ঘটনাটি।

বাংলাদেশ ব্যাংকের সংশ্লিষ্ট এক কর্মকর্তা গত ২৯ ফেব্রুয়ারি পর্যন্ত রিজার্ভের তথ্য দিয়ে জানান, ওই দিন রিজার্ভের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৮০৫ কোটি ৮৫ লাখ ৬৬ হাজার ৬০০ ডলার। এর মধ্য থেকে বৈদেশিক মুদ্রায় রিজার্ভের পরিমাণ ছিল দুই হাজার ৪৫১ কোটি ৯২ লাখ ৬৩ হাজার ৭০০ ডলার। এর মধ্যে এক হাজার ৭০ কোটি ডলার বিনিয়োগ করা আছে বিভিন্ন সিকিউরিটিজ ও বন্ডে। অন্যান্য দেশের জাতীয় কেন্দ্রীয় ব্যাংক, ব্যাংক ফর ইন্টারন্যাশনাল সেটেলমেন্ট (বিআইএস) ও আইএমএফের কাছে রয়েছে ৪৭৩ কোটি ৮৩ লাখ ডলার। নগদ রিজার্ভের বাইরে ৫৪ কোটি ৩৪ লাখ ডলার বিনিয়োগ করা আছে স্বর্ণ কেনায়।


মন্তব্য