ঝুঁকি কমছে না বরং প্রায়ই বিপত্তি ঘটছে-334936 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


নারীর মানসিক স্বাস্থ্য

ঝুঁকি কমছে না বরং প্রায়ই বিপত্তি ঘটছে

তৌফিক মারুফ   

১২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বাংলাদেশে নারীর আর্থ-সামাজিক উন্নয়ন ও ক্ষমতায়ন হচ্ছে দ্রুত গতিতে। তাদের মর্যাদা বাড়ছে, সচেতনতাও বাড়ছে। নারীরা নিজেদের যোগ্যতায় সামনের সারিতে উঠে আসছে।

এতসব অগ্রগতির মধ্যেও তাদের নানা যন্ত্রণা সইতে হচ্ছে প্রতিনিয়ত। নারীর মানসিক স্বাস্থ্যে এসবের নেতিবাচক প্রভাব পড়ছে। কারো কারো ক্ষেত্রে বিপর্যয়ের ঝুঁকি তৈরি হচ্ছে। ফলে প্রায়ই ঘটছে বিপত্তিকর ঘটনা।

কখনো পরিস্থিতি এমন দাঁড়াচ্ছে যে নারীরা মানসিকভাবে ভেঙে পড়ছে এবং আত্মহত্যার পথ বেছে নিচ্ছে। কখনো তারা হত্যা করছে সন্তানকে, স্বজনকে। আবার অনেকে মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে বিকারগ্রস্ত জীবন কাটাচ্ছে।

মানসিক স্বাস্থ্য-বিশেষজ্ঞরা জানান, মানুষের মধ্যে এ বিষয়ক সচেতনতার অভাব রয়েছে। আর্থ-সামাজিক বা শিক্ষাগত কারণে পিছিয়ে থাকা জনগোষ্ঠীর একটি অংশ কুসংস্কারে বিশ্বাস করে এবং আধুনিক চিকিৎসাব্যবস্থা থেকে দূরে থাকে। নগর-শহরের অনেক শিক্ষিত বা সচ্ছল পরিবারের সদস্যরাও লোকলজ্জার কারণে মানসিক চিকিৎসা নেয় না।

বিশেষজ্ঞরা বলছেন, সরকারি বা বেসরকারি কোনো পর্যায়েই মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করার জন্য উপযুক্ত ব্যবস্থা তৈরি হয়নি। চিকিৎসা ব্যবস্থাপনায়ও অনেক ঘাটতি রয়েছে। সচেতনতামূলক কর্মসূচির অভাব রয়েছে। এসব কারণে সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হচ্ছে নারী। কোনো না কোনো বাধার কারণে তারা বঞ্চিত হচ্ছে মানসিক স্বাস্থ্যসেবা থেকে, চিকিৎসাবিষয়ক পরামর্শ থেকে।

আন্তর্জাতিক উদরাময় রোগ গবেষণা প্রতিষ্ঠান আইসিডিডিআরবির গবেষক ড. আলিয়া নাহিদ কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমরা মানসিক স্বাস্থ্য নিয়ে কাজ করতে গিয়ে দেখছি, অন্য রোগ বা সমস্যাকে যেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় মানসিক সমস্যাকে সেভাবে গুরুত্ব দেওয়া হয় না। এ ক্ষেত্রে পুরুষের চেয়ে নারীর অবস্থা বেশি খারাপ। নারীদের মানসিক স্বাস্থ্য খুবই ঝুঁকিপূর্ণ অবস্থায় রয়েছে।’

পর্যবেক্ষণলব্ধ তথ্য তুলে ধরে তিনি বলেন, ‘উচ্চ শিক্ষিত ৪৫ শতাংশ নারীর মধ্যে চরম বিষাদগ্রস্ততা দেখেছি। তাঁদের জন্য চিকিৎসা অপরিহার্য ছিল। কিন্তু তাঁরা বিষয়টি বুঝতে পারেননি, পরিবারের লোকজনও তাঁদের সাহায্য করেনি। আবার অনেকে বুঝে থাকলেও স্বীকার করতে চাননি। মানসিক সমস্যার কথা স্বীকার না করাও বড় সমস্যা। ডাক্তারের কাছে তাঁরা যেতেই চান না। ব্যবস্থাপনাগত সমস্যা তো আমাদের দেশে রয়েছেই।’

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের (বিএসএমএমইউ) মনোরোগ বিভাগের সহযোগী অধ্যাপক ডা. সালাউদ্দিন কাউসার কালের কণ্ঠকে বলেন, মানসিক স্বাস্থ্য-সমস্যায় আক্রান্তদের মধ্যে পুরুষের চেয়ে নারীর সংখ্যা বেশি। নারী-পুরুষের সুযোগ-সুবিধায়ও ফারাক রয়েছে। এ কারণে চিকিৎসা-কেন্দ্রে নারীরা কম আসে। আবার অনেকে চিকিৎসকের কাছে আসতে বিব্রত বোধ করে।

স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয় সূত্র জানায়, ২০১৪ সালে জাতীয় মানসিক স্বাস্থ্য ইনস্টিটিউট হাসপাতালের বহির্বিভাগে সেবা নেয় ৩৫ হাজার ১৪ জন। জরুরি বিভাগে ভর্তি হয়ে চিকিৎসা নেয় তিন হাজার ১২০ জন। বহির্বিভাগের রোগীদের ৫১ শতাংশ ছিল পুরুষ, আর ৩৫.১৪ শতাংশ ছিল নারী ও ১৩.৮৭ শতাংশ শিশু। জরুরি বিভাগে বা ওয়ার্ডে চিকিৎসা নেওয়া রোগীদের মধ্যেও পুরুষের সংখ্যা বেশি। ওই হাসপাতালে পুরুষদের চিকিৎসার যে ব্যবস্থা বা সুবিধা রয়েছে নারীদের জন্য তা নেই।

বাংলাদেশ সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাসোসিয়েশন সূত্র জানায়, দেশে মানসিক সমস্যার চিকিৎসার জন্য উচ্চ পর্যায়ের বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক রয়েছেন দুই শ জনের মতো। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার সহায়তায় পরিচালিত এক সমীক্ষায় দেখা গেছে, বাংলাদেশে ১৬.০৫ শতাংশ মানুষ অর্থাৎ দুই কোটির বেশি মানুষ কোনো না কোনো মানসিক সমস্যায় ভুগছে। প্রাপ্তবয়স্ক জনগোষ্ঠীর ১৮ শতাংশের বেশি বিষণ্নতায় ভুগছে। তাদের বেশির ভাগ নারী।

সাইকিয়াট্রিস্ট অ্যাসোসিয়েশনের সভাপতি অধ্যাপক ডা. এম গোলাম রব্বানী জানান, বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব অনুযায়ী প্রতিদিন বিভিন্ন দেশে তিন হাজার মানুষ আত্মহত্যা করে। এর চেয়ে প্রায় ২০ গুণ বেশি লোক আত্মহত্যার চেষ্টা করে, বেশির ভাগ ক্ষেত্রেই এর কারণ অসম্পূর্ণ চিকিৎসাজনিত বা চিকিৎসাহীনতাজনিত বিষণ্নতা। তিনি আরো জানান, বাংলাদেশে আত্মহত্যার চেষ্টা করা মানুষের এক-চতুর্থাংশ অর্থাৎ ২৫ শতাংশ বিষণ্নতায় ভুগছে। তাদের বেশির ভাগ কখনো চিকিৎসা পায়নি।

গবেষকরা জানান, মানসিক রোগ, বিপর্যয়-পরবর্তী মানসিক চাপ, অহেতুক ভীতি, অত্যধিক দুশ্চিন্তাজনিত রোগ ও ব্যক্তিত্ব-বৈকল্যে আক্রান্তদের আত্মহত্যার হার সাধারণের চেয়ে বেশি।

স্বাস্থ্য অধিদপ্তর সূত্র জানায়, সাম্প্রতিক বছরগুলোয় পরিস্থিতির অনেকটা উন্নতি হয়েছে। এখন দেশের সব মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে মানসিক স্বাস্থ্য বিভাগ আছে; ১০-৩০টি বেড রয়েছে। তবে থানা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে মানসিক রোগের চিকিৎসা এখনো চালু হয়নি। তৃণমূল পর্যায়ে মৃগীরোগ, মনোরোগ, বিষণ্নতা ও অটিজম নির্ণয়ের ব্যবস্থাও ঠিকমতো কাজ করছে না।

বিশেষজ্ঞরা বলেন, মানসিক সমস্যায় আক্রান্তদের প্রতি সমাজের দৃষ্টিভঙ্গি বদলাতে, ভুল ধারণা ভাঙতে ও খারাপ আচরণ বন্ধ করতে জনসচেতনতা বাড়ানো জরুরি। কেউ যাতে অপচিকিৎসার কবলে না পড়ে সেদিকেও খেয়াল রাখতে হবে। কারো মধ্যে মানসিক রোগের লক্ষণ দেখা দিলেই চিকিৎসকদের কাছে নিয়ে যেতে হবে। নারীদের দিকে নজর বেশি দেওয়া দরকার।

মন্তব্য