উদ্বেগের দিনগুলোতে পরিবারের কাউকে-333826 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

রবিবার । ২৫ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১০ আশ্বিন ১৪২৩ । ২২ জিলহজ ১৪৩৭


উদ্বেগের দিনগুলোতে পরিবারের কাউকে পাশে পাননি জেসমিন

বনশ্রীতে ভাই বোনের মৃত্যু

রেজোয়ান বিশ্বাস   

৯ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



উদ্বেগের দিনগুলোতে পরিবারের কাউকে পাশে পাননি জেসমিন

মানসিক বিপর্যয় থেকেই দুই সন্তানকে শ্বাসরোধে হত্যা করেছেন মা মাহফুজা মালেক জেসমিন। রিমান্ডে মায়ের অনড় অবস্থান এবং দুই শিশুর বাবা আমান উল্লাহ ও দাদি হাসনা বেগমের সঙ্গে কথা বলে এমনটা নিশ্চিত হয়েছেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। পুলিশ বলছে, সন্তানের ভবিষ্যৎ নিয়ে দুশ্চিন্তা থেকে দুই সন্তানকে হত্যার যে দাবি মা শুরু থেকে করে আসছেন, সেটাই সত্যি। তদন্তে দেখা গেছে, নানা বিষয়ে উদ্বেগ ঘিরে ধরেছিল জেসমিনকে। তবে সেই দিনগুলোতে পরিবারের কাউকে পাশে পাননি তিনি। এক পর্যায়ে তিনি মানসিক দৃঢ়তা হারিয়ে ফেলেন।

গতকাল মঙ্গলবার জেসমিনের পাঁচ দিনের রিমান্ডের মেয়াদ শেষ হয়েছে। আজ বুধবার তাঁকে আদালতে পাঠানো হবে।

নুসরাত আমান (১৪) ও আলভী আমান (৬) নামের দুই শিশুকে গত ২৯ ফেব্রুয়ারি বনশ্রীর ৪ নম্বর রোডের ৯ নম্বর বাসার পঞ্চম তলার ফ্ল্যাটে হত্যা করা হয়। গতকাল সকালে ওই বাসায় আমান উল্লাহ ও হাসনা বেগমকে জিজ্ঞাসাবাদ করেন তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা। ঘটনার দিন হাসনা বেগম ওই বাসায়ই ছিলেন। তদন্ত সূত্র জানায়, আমান উল্লাহর কথায় সাংসারিক জীবনে স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি তাঁর অবহেলার তথ্য মিলেছে। তাঁকে নজরদারিতে রাখা হয়েছে। স্ত্রী-সন্তানদের প্রতি দায়িত্বে অবহেলাসহ সম্ভাব্য আরো কয়েকটি প্রয়োজনে যেকোনো সময় তাঁকে আটক করা হতে পারে। তবে জিজ্ঞাসাবাদে হাসনা বেগম (৭২) নুসরাত-আলভী হত্যার ঘটনায় তাঁদের মায়ের দিকেই আঙুল তুলছেন।

তদন্তসংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলছেন, জিজ্ঞাসাবাদে পাঁচ দিন ধরে জেসমিন একই দাবি করেছেন, সন্তানদের লেখাপড়া আর ভবিষ্যতের চিন্তা করে তিনিই তাদের হত্যা করেছেন। তবে তদন্তে মনে হয়েছে ঘটনার জন্য তিনি প্রত্যক্ষভাবে দায়ী হলেও পরোক্ষভাবে পরিবারের সদস্যরাও দায়ী। কারণ, স্বামীর সন্দেহজনক আচরণ, রাত করে বাসায় ফেরাসহ পারিবারিক নানা সমস্যার কারণে জেসমিন মানসিকভাবে বিপর্যস্ত ছিলেন। দীর্ঘদিন এই সমস্যার গুরুত্ব দেননি আমান উল্লাহসহ পরিবারের অন্য সদস্যরা। উল্টো জেসমিনের মতের বাইরেও পরিবারের সদস্যরা কিছু কাজ করেছেন। ছাত্রজীবনে জেসমিনের নিজস্ব কিছু চাওয়া-পাওয়া ছিল। পরিবারের বাধার কারণে তা থেকে তিনি বঞ্চিত হয়েছিলেন। এরপর তিনি আমান উল্লাকে বিয়ে করেন। বিয়েতে পরিবারের মত ছিল কি না সেটাও বিবেচ্য। বিয়ের পর কলেজের শিক্ষকতা ছেড়ে স্বামীর সংসারে মনোনিবেশ, দুই সন্তান হওয়া, স্বামীর আর্থিক অনটন, সন্তানদের লেখাপড়ার খরচ, ভবিষ্যৎ নিয়ে তাঁকে ঘিরে উদ্বেগ। স্বামীসহ পরিবারের অনেকেই বিষয়টি জানতেন। কিন্তু তাঁরা জেসমিনের মানসিক অবস্থা বোঝার চেষ্টা করেননি।

রামপুরা থানার ওসি রফিকুল ইসলাম বলেন, রিমান্ডে পাঁচ দিন ধরে সতর্কতার সঙ্গে জেসমিনকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। তবে তিনি বরাবরই একই কথা বলছেন। তবে দুই শিশুর বাবা, দাদি, খালা, চাচাসহ অন্য স্বজনদের সঙ্গে কথা বলে মনে হয়েছে, ঘটনার জন্য তাঁরাও পরোক্ষভাবে দায়ী।

তদন্তসংশ্লিষ্টরা এখন পর্যন্ত এ ঘটনায় অন্তত ২০ জনকে জিজ্ঞাসাবাদ করেছেন। সব শেষ গতকাল দুই শিশুর বাবা ও দাদিকে জিজ্ঞাসাবাদ করা হয়। ঢাকা মহানগর পুলিশের অতিরিক্ত কমিশনার মনিরুল ইসলাম বলেন, ‘দুই সন্তানকে হত্যার অভিযোগে গ্রেপ্তার জেসমিন পাগল নন। তবে তিনি মানসিক রোগাক্রান্ত থাকতে পারেন। তাঁকে জিজ্ঞাসাবাদে মনোরোগ বিশেষজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হচ্ছে। আমরা আশাবাদী যে এই ঘটনার রহস্য পরিপূর্ণভাবে উদ্ঘাটিত হবে।’

গত ২৯ ফেব্রুয়ারি রাতে ঢাকা মেডিক্যাল কলেজ হাসপাতালে নুসরাত আমান ও আলভী আমান মারা যায়। ঘটনার পর তাদের মা জানান, খাবারের বিষক্রিয়ায় নুসরাত ও আলভীর মৃত্যু হয়েছে। তবে ময়নাতদন্তের পর চিকিৎসকরা জানান, দুই শিশুকে হত্যা করা হয়েছে। এরপর শিশু দুটির পরিবারের সদস্য, গৃহশিক্ষক, বাসার নিরাপত্তারক্ষী ও একটি চায়নিজ রেস্টুরেন্টের ম্যানেজার, বাবুর্চিসহ কয়েকজনকে আটক করা হয়।

মন্তব্য