নারীর বিড়ম্বনা দেখার কেউ নেই-333414 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

শুক্রবার । ৩০ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৫ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৭ জিলহজ ১৪৩৭


রাজধানীর গণপরিবহন

নারীর বিড়ম্বনা দেখার কেউ নেই

পার্থ সারথি দাস   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



নারীর বিড়ম্বনা দেখার কেউ নেই

রাজধানীর কাকলী মোড়ের কাছে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে বাসের জন্য অপেক্ষা করছেন আট তরুণী। চপল স্বভাবে কথা বলছেন তাঁরা। একসময় তাঁদের চোখেমুখে দেখা দেয় উদ্বেগ। তাঁরা সবাই পোশাক কারখানার কর্মী; কাজ শেষ করে টঙ্গী যাওয়ার জন্য বাসের অপেক্ষা করছেন। কিন্তু অনেকক্ষণ ধরে বাস আসছে না।

বেশ কিছুক্ষণ পর বাস আসতে দেখেই ফুটপাত থেকে দৌড়ে রাস্তায় গেলেন, কিন্তু উঠতে পারলেন না; আবার ফুটপাতে দাঁড়ালেন তাঁরা। ছয়টি বাস গেছে, একটিতেও পা রাখতে পারেননি; প্রতিবার সরিয়ে দিয়েছে চালকের সহকারী।

বিকেল সাড়ে ৫টার দিকের ঘটনা এটি। আটজনের একজন শাহিনা আক্তার বুলি। তিনি এ প্রতিবেদককে বলেন, ‘কী করুম বলেন, ভিড় ঠেলতে ঠেলতেই উঠতে হয়। বসার জায়গা পাই না। প্রায়ই ঝুলতে ঝুলতে যাইতে হয়। কোনো কোনো সময় রাস্তায় নামাইয়া দেয়। রাইতে বেশি সমস্যা হয়।’

বুলিদের মতো রাজধানীতে প্রতিদিন অসংখ্য নারীকে পরিবহনের জন্য এমন বিড়ম্বনায় পড়তে হয়। বাস না পেয়ে অনেকে (গন্তব্য কাছে হলে) রিকশায় চড়ে যেতে বাধ্য হয়। হেঁটেও চলাচল করে অনেকে। নিরাপত্তাহীনতার শঙ্কা নিয়েই পথ চলে তারা।

প্রতিবেশী দেশ ভারতের রাজধানী দিল্লিতে এবং আরো অনেক দেশের রাজধানী শহরে নারীদের জন্য আলাদা পরিবহনের ব্যবস্থা রয়েছে। বাসে তাদের জন্য আসন সংরক্ষণের নিয়মও মানা হয়। অনেক ক্ষেত্রে নারীদের দিয়েই চালানো হয় নারীদের পরিবহন।

রাজধানী ঢাকায় উল্টো চিত্র। বেসরকারি ছয় হাজার বাস ও মিনিবাসের একটিও নারীদের জন্য বরাদ্দ নয়। সরকারি সংস্থা বাংলাদেশ সড়ক পরিবহন করপোরেশন (বিআরটিসি) নগরীতে ২০টি রুটে নারীদের জন্য বাস চালু করেছিল; কমতে কমতে ১২টিতে নেমেছে। তাও সব চলে না; হঠাৎ পথে বন্ধ হয়ে যাওয়ার ঘটনাও ঘটে। কর্তৃপক্ষ বলছে, পরিচালনা ব্যয় বেশি, লোকসান গুনতে হয়। তাই নিয়মিত চালানো যাচ্ছে না।

সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় দেখা গেছে, মিরপুর চিড়িয়াখানা, মোহাম্মদপুরের জাপান গার্ডেন সিটির সামনে এবং আরো কিছু স্থানে নারীদের বাস থামার-ছাড়ার নির্ধারিত স্থান রয়েছে, সাইনবোর্ডও আছে। কিন্তু সেসব স্থানে নারী যাত্রীরা হাজির হয়ে বাস পায় না।

বিআরটিসির মিরপুর-১২ নম্বরের ডিপো থেকে মহিলাদের জন্য দিনে দুটি বাস দুই বেলা চলার কথা; চলছে একটি। একটি চললে অন্যটি বন্ধ থাকে। ওই ডিপোতে গিয়ে জানা গেছে, মহিলা সার্ভিসের একটি বাস প্রায়ই মেরামত করতে হয়। মাঝেমধ্যেই পথে নষ্ট হয়ে যায় এটি। তখন যাত্রীদের নামিয়ে দেওয়া হয়। বাসটির চালকের সহকারী শাহনাজ পারভীন জানান, এটির অ্যাকসিলারেটরে ও গিয়ারে সমস্যা আছে। ফলে প্রায়ই এটিকে মেরামতের জন্য বন্ধ রাখতে হয়।

ওই বাসের যাত্রী ব্যাংক কর্মকর্তা নাজিয়া রহমান বলেন, মতিঝিল থেকে মিরপুরের দিকে ফেরার সময় কপাল ভালো থাকলে বাসে ওঠা যায়। যানজটের কারণে বসে বসে বিরক্ত হয়ে অনেকে নেমে পড়ে। একদিন কর্মজীবী নারীদের নিয়ে বাসটি মতিঝিল থেকে মিরপুরের উদ্দেশে ছাড়ে। কিন্তু পল্টন পর্যন্ত আসতেই লেগে যায় দুই ঘণ্টা। ওই দিনের পরিস্থিতি বর্ণনা করে বাসের চালকের সহকারী শাহনাজ বলেন, ‘৬০-৭০ জন যাত্রী ছিল। অর্ধেকই নেমে হাঁটা শুরু করে। প্রায় দিনই এ অবস্থা হয়।’

উল্লেখ্য, বিআরটিসির মহিলা সার্ভিস পরীক্ষামূলকভাবে চালু করা হয় ১৯৯৮ সালে। ২০০১ সালে ঢাকার আশপাশে সার্ভিস সম্প্রসারণ করা হয়। তবে সম্প্রসারিত সেবা চালু থাকেনি বেশি দিন।

বেসরকারি বাসে যাচ্ছেতাই অবস্থা। কয়েক দিনের সরেজমিন পর্যবেক্ষণে দেখা গেছে, ওই সব বাসে ওঠার জন্য দীর্ঘ সময় অপেক্ষা করতে হয়। রীতিমতো যুদ্ধ করতে হয় নারী যাত্রীদের। চালকের সহকারীরা দরজায় দাঁড়িয়ে থেকে বাধা দেয়; তাদের বেশির ভাগের এক রব—মহিলা সিট খালি নেই। রামপুরা ব্রিজ, কুড়িল বিশ্বরোড, খিলক্ষেত, ফার্মগেট, কাকরাইল, শাহবাগ, এলিফ্যান্ট রোড, ধানমণ্ডি—এসব এলাকার রাস্তায় এমন দৃশ্য বেশি দেখা গেছে। বিশেষ করে অফিসে যাওয়ার সময় নারীদের বাসে ওঠার সুযোগ কম থাকে।

নারীর জন্য আসন : অনুসন্ধানকালে বিভিন্ন রুটের কিছু বাস-মিনিবাসে ‘মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষিত আসন’ লেখা দেখা গেছে। তবে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে ওই সব আসনে পুরুষ যাত্রী ছিল।

ঢাকার বেশির ভাগ বাস-মিনিবাসে চালকের বাঁ পাশের আসনগুলো নারীদের জন্য রাখা হয়। চারজনের আসন; টানা আসন হলে ছয়-সাতজনকেও বসানো হয়। ইঞ্জিনের ওপরও বসানো হয় তাদের। বেশির ভাগ বাসে চালকের আসনের পেছনেও টানা আসন থাকে।

২০০৮ সালে যোগাযোগ মন্ত্রণালয় গণপরিবহনে নারীদের জন্য ৩০ শতাংশ আসন সংরক্ষণের বিষয়টি যাচাইয়ের নির্দেশ দেয়। পরে ঢাকা মহানগর পরিবহন কমিটি ঠিক করে, বড় বাসে ৯টি ও মিনিবাসে ছয়টি আসন মহিলা, শিশু ও প্রতিবন্ধীদের জন্য সংরক্ষণ করতে হবে। তবে আসনগুলো চালকের পেছনে বা বাঁ পাশে বা দরজার পাশে হবে না। এসব বিষয়কে চলাচলের অনুমতির শর্ত হিসেবে অন্তর্ভুক্ত করা হয়। অবশ্য এখন পর্যন্ত শর্ত না মানার জন্য কোনো বাস-মিনিবাসের রুট পারমিট বাতিল করা হয়নি।

যাত্রাবাড়ী-গাজীপুর রুটের তুরাগ পরিবহনের বাসে বনেটের ওপর বসে এ প্রতিবেদকের সঙ্গে কথা বলেন আছিরুন বেগম। তিনি বলেন, ‘রান্নাঘরের মতো গরম, তাও আবার ইঞ্জিনের ওপর বসে থাকতে হচ্ছে। কী করুম!’ নাম প্রকাশ না করার শর্তে মিরপুর-গুলিস্তান রুটের এক নারী যাত্রী বলেন, ‘বাসে ওঠা-নামার সময় হেলপাররা ইচ্ছা করেই গায়ে হাত দেয়। বুঝতে পারি। কিন্তু করার কিছু থাকে না। এসব কথা কাকে বলব?’

অ্যাকশনএইডের নগর পরিবহনবিষয়ক একটি জরিপ প্রতিবেদন অনুযায়ী গণপরিবহনে চালক বা ভাড়া আদায়কারীর মুখে অবমাননাকর ভাষা শোনার অভিজ্ঞতা হয়েছে ৪৮ শতাংশ নারীর। ১৩ শতাংশ নারী গণপরিবহন ব্যবহার বন্ধ করেছেন বলে জানান। ৩ শতাংশ নারী জানান, আত্মরক্ষার জন্য তাঁরা অস্ত্র বা যন্ত্রপাতি সঙ্গে রাখেন। ২০১৪ সালের মধ্য মে থেকে মধ্য জুন পর্যন্ত সময়ে জরিপের তথ্য সংগ্রহ করা হয়।

মন্তব্য