kalerkantho

শনিবার । ১০ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৬ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৯ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


দারিদ্র্য-অনিরাপত্তা কমলে বাল্যবিয়ে কমতে পারে

রেজাউল করিম   

৮ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



ইউনিসেফ ২০১৩ সালে বিশ্বে শিশু পরিস্থিতির যে চিত্র তুলে ধরেছে তাতে বাল্যবিয়ের দিক দিয়ে বিশ্বে বাংলাদেশের অবস্থান চতুর্থ। ইউনিসেফের তথ্য মতে, এ দেশের ৬৬ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয় ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই।

অন্যদিকে গত নভেম্বরে আন্তর্জাতিক শিশু অধিকার সংস্থা প্ল্যান ইন্টারন্যাশনাল এবং যুক্তরাজ্যভিত্তিক প্রতিষ্ঠান কোরাম ইন্টারন্যাশনাল প্রকাশিত এক সমীক্ষায় বলা হয়, বাংলাদেশে ১৮ বছর পূর্ণ হওয়ার আগেই ৭৩ শতাংশ মেয়ের বিয়ে হয়ে যায়। এর মধ্যে ১২ থেকে ১৪ বছর বয়সেই বিয়ে হয় ২৭ শতাংশ মেয়ের। ‘এশিয়া চাইল্ড ম্যারেজ ইনিশিয়েটিভ’ শীর্ষক এ সমীক্ষা অনুযায়ী, বাল্যবিয়ের প্রতি এলাকাবাসী, মেয়ের মা-বাবা এবং মেয়ে শিশুর নিজের সমর্থন রয়েছে। শিক্ষা, স্বাস্থ্য ও অর্থনৈতিক সুযোগ-সুবিধার অভাব এবং দারিদ্র্য, বিচার ও আইন প্রয়োগ প্রক্রিয়ার অকার্যকারিতা বাল্যবিয়ের কারণ হিসেবে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়।

লেখক, গবেষক ও সাংবাদিক আফসান চৌধুরী অবশ্য কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘আমাদের দেশের ঠিক কত শতাংশ মেয়ের বাল্যবিয়ে হয়, এটির সঠিক পরিসংখ্যান কেউ তুলে আনতে পারেনি। যারা জরিপ করে তারা আমাদের গ্রাম সমাজের সঙ্গে সংশ্লিষ্ট নয়। আমাদের গবেষণার বেশির ভাগই করেন কোনো এনজিও প্রতিনিধি, বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক বা কোনো বিদেশি সংস্থার লোকেরা। ফলে আমাদের গ্রাম-সমাজের চিত্রের সঙ্গে কোনোভাবেই তাঁদের চিন্তাভাবনা মেলাতে পারেন না। ’ তিনি বলেন, ‘আমার কাছে মনে হয়, দেশের গ্রামাঞ্চলের বেশির ভাগ অভিভাবক তাঁদের মেয়েদের কম বয়সেই বিয়ে দিয়ে থাকেন নিরাপত্তাহীনতার ভয় থেকে। তার কারণ, একজন অভিভাবক সাধারণত মনে করেন, তাঁর মেয়ে বড় হলেই সমাজের ছেলেদের নজরে পড়বে। তাকে ধর্ষণ করতে পারে বা নানাভাবে হয়রানি করতে পারে। ’ তিনি আরো বলেন, ‘সমাজে এই অনিরাপত্তা আগে দূর করার ব্যবস্থা করতে হবে। এ ছাড়া আমাদের দেশ মুসলিম সংখ্যাগরিষ্ঠ। ইসলাম ধর্মে বলা আছে বয়ঃসন্ধিকাল হলেই মেয়েকে বিয়ে দেওয়ার কথা। সে অনুযায়ী কোনো অভিভাবক তাঁর মেয়েকে বয়ঃসন্ধিকালের শুরুতে বিয়ে দিলে আমাদের মুসলিম পারিবারিক আইন অনুযায়ী সেটি বাতিল হবে না। এই বিষয়টিও সমাধান করতে হবে। তাহলে বাল্যবিয়ে কমানো সম্ভব। ’

জাতীয় কন্যাশিশু অ্যাডভোকেসি ফেরামের সভাপতি ড. বদিউল আলম মজুমদার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘গ্রামের অনেক বাবা-মা রয়েছেন, যাঁরা সন্তানদের ঠিকমতো খাবার দিতে পারেন না। জোগান দিতে পারেন না পড়ালেখার খরচ। তাঁদের মেয়ে কোনো রকম একটু বয়ঃসন্ধি হলে চিন্তা করেন বিয়ে দেওয়ার, যাতে সে স্বামীর বাড়িতে দুমুঠো খাবার পায়। অর্থাৎ দারিদ্র্যের কারণেই মেয়েকে কম বয়সে বিয়ে দিতে বাধ্য থাকে তার পরিবার। ’

মহিলা ও শিশুবিষয়ক প্রতিমন্ত্রী মেহের আফরোজ চুমকি কালে কণ্ঠকে বলেছেন, ‘একাধিক কারণে মেয়েদের বাল্যবিয়ে হলেও মূল কারণ দারিদ্র্য ও অসচেতনতা। সরকার তাই বাল্যবিয়ে ঠেকাতে দারিদ্র্য দূর করাসহ নানা প্রকল্প হাতে নিয়েছে। ’

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির সভাপতি অ্যাডভোকেট ফাওজিয়া করিম ফিরোজ বলেন, গ্রামে একটি কুপ্রথা চালু আছে—বিয়ের জন্য মেয়ে যত কম বয়সী হবে তত ভালো। তাই ছেলেরা কম বয়সী পাত্রী খোঁজ করে। আর কম বয়সী মেয়েকে বিয়ে দিলে যৌতুক দিতে হয় কম। ফলে দরিদ্র অভিভাবকরাও দ্রুত মেয়েকে বিয়ে দিয়ে থাকেন।

সহকারী অ্যাটর্নি জেনারেল জান্নাতুল ফেরদৌস রুপা বলেন, ‘যদিও আমাদের দেশে বাল্যবিয়ে নিরোধ আইন প্রচলিত সেই ১৯২৯ সাল থেকে, এর পরও এ আইনে যেসব অসংগতি আছে তা আজও দূর করা হয়নি।


মন্তব্য