চাকরি হারানোর আতঙ্কে দেড় শতাধিক-332635 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ২৯ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৪ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৬ জিলহজ ১৪৩৭


বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়

চাকরি হারানোর আতঙ্কে দেড় শতাধিক চিকিৎসক

নিজস্ব প্রতিবেদক   

৬ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের মনোরোগ বিভাগে মেডিক্যাল অফিসার পদে ২০০৩ সাল থেকে কর্মরত আছেন ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী। তিনি চাকরির পাশাপাশি একই বিশ্ববিদ্যালয়ের মেডিসিন অনুষদ থেকে কৃতিত্বের সঙ্গে উচ্চতর ডিগ্রি অর্জন করায় পেয়েছেন প্রধানমন্ত্রীর স্বর্ণপদক। কিন্তু গত ২২ ফেব্রুয়ারি উচ্চ আদালতের এক রায়ের প্রভাবে চাকরি হারানোর শঙ্কায় দিন কাটাচ্ছেন এই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক।

কেবল এ চিকিৎসকই নন, একই বিশ্ববিদ্যালয়ের আরো দেড় শতাধিক বিশেষজ্ঞ চিকিৎসক এখন একইভাবে চাকরি হারানোর শঙ্কায় রয়েছেন; যাদের কেউ এ প্রতিষ্ঠানে চাকরি করছেন ২০০৩ সাল থেকে, আবার কেউ কেউ আছেন ২০০৬ সাল থেকে। এ বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন কর্তৃপক্ষের একটি নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি উচ্চ আদালত থেকে অবৈধ ঘোষিত হওয়ার পর থেকে ওই বিশেষজ্ঞ চিকিৎসকরা দিন পার করছেন উত্কণ্ঠা ও উদ্বেগের মধ্য দিয়ে।

ডা. নাফিয়া ফারজানা চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘উচ্চ আদালতের রায় নিয়ে আমাদের কোনো কথা নেই। ওই রায়ে দায়ী করা হয়েছে বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন কর্তৃপক্ষকে। ওই কর্তৃপক্ষের দেওয়া নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অবৈধ ঘোষিত হয়েছে উচ্চ আদালতের রায়ে। শাস্তি ভোগ করলে কর্তৃপক্ষের করা উচিত। তাদের নির্দেশনা অনুসারে পরীক্ষা দিয়ে উত্তীর্ণ হয়ে নিয়োগ পেয়ে কাজে যোগদান করেছি এবং এখন পর্যন্ত কাজ করছি। কিন্তু উচ্চ আদালতের সর্বশেষ রায়ের পর আমরা শুনতে পারছি, ওই নিয়োগপ্রক্রিয়ার আওতায় নিয়োগপ্রাপ্ত হিসেবে আমাদের চাকরি এখন আর থাকবে না। যদি তা-ই হয়, তবে আমাদের কী হবে? যদিও এখন পর্যন্ত বর্তমান কর্তৃপক্ষ আমাদের আনুষ্ঠানিকভাবে কিছু জানায়নি।’

জানতে চাইলে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ের উপাচার্য (ভিসি) অধ্যাপক ডা. কামরুল হাসান খান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘এখনো উচ্চ আদালতের রায়ের কপি হাতে পাইনি। কপি না দেখে কিছু বলা যাবে না বা কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে না।’ তিনি বলেন, কপি পাওয়ার পর উপযুক্ত আইনগত ভিত্তিতে আদালতের আদেশ মেনেই করণীয় ঠিক করা হবে। এ ক্ষেত্রে প্রয়োজনে আইনজ্ঞদের পরামর্শ নেওয়া হবে। কারণ কারো চাকরি হারানো অবশ্যই মানবিক বিবেচনায় দুঃখজনক।

ভুক্তভোগী চিকিৎসকরা জানান, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক মেডিক্যাল অফিসার পদে দরখাস্ত আহ্বান করে ২০০২ সালের ১ মে একটি জাতীয় দৈনিকে বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়। দুই বছর মেয়াদি চুক্তিভিত্তিক নিয়োগের জন্য পরীক্ষা গ্রহণ করা হয় ২০০৩ সালের ৪ ফেব্রুয়ারি। পরীক্ষায় উত্তীর্ণ ১৩৭ জন প্রার্থী ওই বছরের ১৪ জুলাই বিএসএমএমইউতে মেডিক্যাল অফিসার (চুক্তিভিত্তিক) পদে যোগদান করেন। দুই বছরের মেয়াদ শেষ হলে পুনরায় কর্তৃপক্ষ বিশ্ববিদ্যালয় সিন্ডিকেটের ২০তম সভার সিদ্ধান্ত মোতাবেক আরো এক বছরের জন্য চুক্তির মেয়াদ বাড়ায়, যা ২০০৫ সালের ১২ জুলাই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের অবগত করা হয়। এ মেয়াদ চলাকালেই আরো ‘কিছুসংখ্যক’ মেডিক্যাল অফিসার পদে নিয়োগের জন্য আবেদন আহ্বান করে ২০০৫ সালের ২২ অক্টোবর একাধিক পত্রিকায় বিজ্ঞাপন প্রকাশিত হয়; যেখানে ‘চাকরিরত প্রার্থীগণকে যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে আবেদন করতে হবে’ শর্ত দেওয়া ছিল। সেই অনুযায়ী আগে থেকে চুক্তিভিত্তিক নিয়োগপ্রাপ্ত চিকিৎসকদের অনেকেই যথাযথ কর্তৃপক্ষের মাধ্যমে স্থায়ী পদের বিপরীতে চাকরির জন্য আবেদন করেন। আবেদনের পরিপ্রেক্ষিতে ২০০৫ সালের ১১ ডিসেম্বর নির্বাচনী পরীক্ষাও অনুষ্ঠিত হয়। ওই পরীক্ষায় যোগ্য বিবেচিত ১৯৪ জনকে মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে বিভিন্ন বিভাগে পদায়ন করা হয়। ১৯৪ জন মেডিক্যাল অফিসারদের বড় অংশই ২০০৩ থেকে একই বিশ্ববিদ্যালয়ে চুক্তিভিত্তিক মেডিক্যাল অফিসার হিসেবে কর্মরত ছিলেন। তখন যাঁদের চাকরির মেয়াদ এক বছর অবেক্ষাধীন বা প্রবেশনারি সময়কাল সন্তোষজনক হওয়ায় বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষ পত্রের মাধ্যমে চাকরি স্থায়ী করা হয়েছে বলে জানায়।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব মেডিক্যাল বিশ্ববিদ্যালয় সূত্র থেকে জানা যায়, ২০০৫ সালে পত্রিকায় প্রকাশিত নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির বৈধতা চ্যালেঞ্জ করে ২০০৬ সালের ২ জানুয়ারি উচ্চ আদালতে রিট করেন একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অধ্যাপক ও স্বাধীনতা চিকিৎসক পরিষদের (স্বাচিপ) বর্তমান সভাপতি ডা. ইকবাল আর্সলান। তিনি বিশ্ববিদ্যালয়ের তত্কালীন কর্তৃপক্ষকে এতে বিবাদী করেন। এর ভিত্তিতে ২০১০ সালে হাইকোর্ট এক আদেশে ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তি অবৈধ ঘোষণা করেন। পরে বিবাদীপক্ষ ওই আদেশের বিরুদ্ধে আপিল করলে আপিল বিভাগের তত্কালীন চেম্বার জজ (বর্তমান প্রধান বিচারপতি) হাইকোর্টের রায়ের ওপর অন্তর্বর্তীকালীন স্থগিতাদেশ দেন। পরে অপরাপর প্রক্রিয়া শেষে গত ২২ ফেব্রুয়ারি আপিল বিভাগের চূড়ান্ত রায়ে আপিলের আবেদন খারিজ করে হাইকোর্টের রায় বহাল রাখেন। এর পর থেকেই ওই নিয়োগ বিজ্ঞপ্তির আওতায় চাকরিপ্রাপ্তদের মধ্যে যেকোনো সময় চাকরি হারানোর আতঙ্ক ভর করে।

ওই সময়ে নিয়োগপ্রাপ্ত ১৯৪ জনের মধ্য থেকে কেউ কেউ ইতিমধ্যেই ওই পদের চাকরি থেকে ইস্তফা নিয়ে একই বিশ্ববিদ্যালয়ের অন্য পদে যোগ দিয়েছেন। আবার কেউ বা এ প্রতিষ্ঠান ছেড়ে অন্য কোথাও চলে গেছেন। এমনকি কারো কারো মৃত্যুও হয়েছে। ফলে ভুক্তভোগীর সংখ্যা এখন অনেকটা কমে গেছে। কেউ কেউ এ সংখ্যা এখন ১৫০ থেকে ১৭০ বলে দাবি করলেও এ বিশ্ববিদ্যালয়ের ভিসি কালের কণ্ঠ’র কাছে এ সংখ্যা বর্তমানে ১৪৩ বলে জানিয়েছেন।

মন্তব্য