kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


জলবায়ু অভিঘাত মোকাবিলা

জাতিসংঘে প্রযুক্তি চেয়েছে বাংলাদেশ ছাড়া ৪০ দেশ

আরিফুর রহমান   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশের নাম সবার আগে থাকলেও এর অভিঘাত মোকাবিলায় টেকসই প্রযুক্তি ব্যবহারে সবার চেয়ে পিছিয়ে। প্রাকৃতিক দুর্যোগ থেকে রক্ষা পেতে আফ্রিকার দরিদ্র দেশগুলো প্রযুক্তি ব্যবহারে যতটা তত্পর, বাংলাদেশ এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রম।

জলবায়ু পরিবর্তন-সংক্রান্ত জাতিসংঘের ফ্রেমওয়ার্ক কনভেনশনের কার্যকরী সংস্থা ক্লাইমেট টেকনোলজি সেন্টার অ্যান্ড নেটওয়ার্কের (সিটিসিএন) কাছ থেকে প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য এ পর্যন্ত ৪০টি দেশ আবেদন করলেও বাংলাদেশ করেনি। সিটিসিএনের কাছে এ প্রযুক্তির জন্য আবেদন করে এরই মধ্যে পেয়ে গেছে পাশের দেশ নেপাল ও থাইল্যান্ড। দেশ দুটি এরই মধ্যে জলবায়ুর অভিঘাত মোকাবিলায় বিভিন্ন ধরনের প্রযুক্তির ব্যবহার শুরু করে দিয়েছে। অন্যদিকে বাংলাদেশ শুধু আবেদন করার প্রক্রিয়ার মধ্যে আছে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, সিটিসিএন থেকে প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ এখনো আবেদন করেনি। তবে এর প্রক্রিয়া চলছে। ওই কর্মকর্তারা জানান, পানি উন্নয়ন বোর্ড, কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, টেকসই নবায়নযোগ্য জ্বালানি কর্তৃপক্ষসহ বিভিন্ন সরকারি-বেসরকারি সংস্থার কাছে তাদের চাহিদা চাওয়া হয়েছে। এরই মধ্যে ১৫টি প্রস্তাব পাওয়া গেছে। সেখান থেকে যাচাই-বাছাই করে পাঁচ-ছয়টি প্রস্তাব পাঠানো হবে সিটিসিএন বোর্ডের কাছে। পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অনুমোদনক্রমে আগামী মাসের শেষ দিকে প্রস্তাবগুলো ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে সিটিসিএন সদর দপ্তরে পাঠানো হবে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয় সূত্রে জানা যায়, মেক্সিকোর কানকুনে ২০১০ সালে অনুষ্ঠিত বিশ্ব জলবায়ু (কপ ১৬) সম্মেলনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশগুলোকে প্রযুক্তি দিয়ে সহযোগিতা করতে সিটিসিএন নামের আলাদা একটি সংস্থা গঠন করার বিষয়ে নীতিগত সিদ্ধান্ত নেয় জাতিসংঘের সদস্য রাষ্ট্রগুলো। এর ধারাবাহিকতায় ২০১৩ সালে সিটিসিএন গঠিত হয়, যার সদর দপ্তর ডেনমার্কের কোপেনহেগেনে। সিটিসিএন হলো ইউএনএফসিসিসির অপারেশনাল আর্ম। সংস্থাটির প্রধান কাজ হলো ঝুঁকির মধ্যে থাকা দেশগুলোকে অভিযোজন ও উপশম খাতে প্রযুক্তি সরবরাহের মাধ্যমে সহযোগিতা করা। জলবায়ু পরিবর্তনজনিত ঝুঁকির মধ্যে থাকা সেনেগাল, মালি, জিম্বাবুয়ে, পাকিস্তান, আফগানিস্তান, তানজানিয়া, কোস্টারিকা, গিনি, টোঙ্গোসহ ৪০টি দেশ এ পর্যন্ত আবেদন করেছে প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য।

সিটিসিএন গঠিত হওয়ার তিন বছর পরও বাংলাদেশ কেন সেখানে প্রযুক্তির জন্য আবেদন করতে পারেনি—জানতে চাইলে পরিবেশ অধিদপ্তরের জলবায়ুবিষয়ক সেলের পরিচালক মির্জা শওকত আলী কালের কণ্ঠকে জানান, প্রযুক্তি হস্তান্তরের বিষয়ে বাংলাদেশসহ এ অঞ্চলের দেশগুলোর জন্য লিয়াজোঁ করার দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে এশিয়ান ইনস্টিটিউট অব টেকনোলজি (এআইটি) নামের একটি প্রতিষ্ঠানকে। সংস্থাটির সদর দপ্তর থাইল্যান্ডে; কিন্তু এর কার্যক্রম অত্যন্ত শ্লথ। বাংলাদেশে এ বিষয়ে সচেতনতা বাড়ানোর জন্য একটি কর্মশালা আয়োজন করতে দীর্ঘদিন ধরেই প্রতিষ্ঠানটিকে অনুরোধ জানানো হচ্ছিল। কিন্তু তাদের পক্ষ থেকে সাড়া পাওয়া যাচ্ছিল না। মূলত কার্যক্রমে দীর্ঘসূত্রতার কারণেই আবেদন করতে দেরি হচ্ছে।

অন্য একটি সূত্রে জানা গেছে, প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য সিটিসিএনের কাছে কিভাবে আবেদন করতে হয়, তা জানে না সরকারি সংস্থাগুলো। এ ছাড়া কী ধরনের সহযোগিতা পাওয়া যেতে পারে, সে বিষয়েও অনেকের ধারণা নেই। এ জন্য আবেদন করতে দেরি হচ্ছে।

জানতে চাইলে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের অতিরিক্ত সচিব নুরুল করিম কালের কণ্ঠকে জানান, সিটিসিএন গঠিত হয়েছে বেশি দিন হয়নি। এর মধ্যে সংস্থাটি বাংলাদেশ থেকে পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালককে ন্যাশনাল ডেজিগনেটেড এনটিটি বা (এনডিই) নির্বাচিত করেছে। প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য বাংলাদেশ শিগগিরই সিটিসিএনে আবেদন করবে।

জলবায়ু পরিবর্তনের কারণে ঝুঁকিতে থাকা যত দেশ আছে, এর মধ্যে বাংলাদেশের নাম উচ্চারিত হয় সবার আগে। আন্তর্জাতিক গবেষণা প্রতিষ্ঠান জার্মান ওয়াচ প্রকাশিত ‘বৈশ্বিক জলবায়ু ঝুঁকি সূচক ২০১৬’-র প্রতিবেদনে ঝুঁকিপূর্ণ দেশের তালিকায় বাংলাদেশকে রাখা হয়েছে ৬ নম্বরে। ওই প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বৈশ্বিক তাপমাত্রা নিয়ন্ত্রণে আনতে না পারলে এ দেশে দুর্যোগের মাত্রা আরো বাড়বে। বাংলাদেশকে নিয়ে বৈশ্বিক সংস্থাগুলো প্রতিনিয়তই উদ্বেগ-উত্কণ্ঠা প্রকাশ করে আসছে।

সিটিসিএনের ওয়েবসাইটে দেখা গেছে, সর্বশেষ গত ২৮ জানুয়ারি সিটিসিএনে প্রযুক্তি পাওয়ার জন্য আবেদন করেছে মরিশাস। দেশটি তাদের উপকূলীয় এলাকায় অভিযোজন খাতে প্রযুক্তি চেয়ে আবেদন করেছে। গত ১৮ ডিসেম্বর ভূমি ব্যবস্থাপনার জন্য প্রযুক্তি চেয়েছে কোস্টারিকা। ২০১৪ সালের ফেব্রুয়ারিতে চিলি প্রথমবারের মতো এ সংস্থায় ইকোসিস্টেম ও জীববৈচিত্র্য রক্ষায় প্রযুক্তির জন্য আবেদন করে।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তাদের সঙ্গে কথা বলে জানা গেছে, জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাব মোকাবিলায় বাংলাদেশ এখন যে টাকা খরচ করছে, তা মিলেছে বিশ্বব্যাংক, এডিবিসহ বিভিন্ন উন্নয়ন সহযোগী সংস্থা থেকে পাওয়া ঋণ থেকে। উপকূলীয় এলাকায় বাঁধ নির্মাণ, পোল্ডার নির্মাণ, সামাজিক বনায়নের মতো বিভিন্ন কার্যক্রম বাস্তবায়িত হচ্ছে। পরিবেশ অধিদপ্তরের এক কর্মকর্তা বলেন, জলবায়ু পরিবর্তনের অভিঘাত মোকাবিলায় একটি দেশ যখন প্রযুক্তি চেয়ে সিটিসিএনে আবেদন করবে, তখন সংস্থাটি প্রযুক্তির ব্যবস্থা করে দেবে। টাকা দেবে সংশ্লিষ্ট দেশের সরকার। বাংলাদেশ সরকার সবুজ ফান্ডের (জিসিএফ) টাকা দিয়ে সিটিসিএন থেকে প্রযুক্তি পাওয়ার চেষ্টা করছে। তবে সবুজ ফান্ড থেকে টাকা পাওয়া না গেলে সহজ শর্তে অন্য সংস্থা থেকে ঋণ নেওয়া হবে। ওই কর্মকর্তা বলেন, বাংলাদেশে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা, নবায়নযোগ্য জ্বালানি ব্যবহার, পানি ব্যবস্থাপনা, বন ব্যবস্থাপনা ও কৃষি বিষয়ে প্রযুক্তির জন্য সিটিসিএনে আবেদন করা হবে। তবে আবেদন করার কত দিন পর প্রযুক্তি হস্তান্তর করা হবে, সে বিষয়ে কেউ নির্দিষ্ট করে বলতে পারেননি।

সরকারি সংস্থার পাশাপাশি বেসরকারিভাবেও সিটিসিএনে প্রযুক্তির জন্য আবেদন করার সুযোগ রয়েছে।


মন্তব্য