kalerkantho


হাতীবান্ধায় শহীদের কবরের পাশে টয়লেট

সমাধি সরাতে চায় পরিবার দায় নিতে রাজি নয় কেউ

হায়দার আলী বাবু, লালমনিরহাট   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



হাতীবান্ধায় শহীদের কবরের পাশে টয়লেট

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধার ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের টয়লেট তৈরি করা হয়েছে শহীদ হাবিবুর রহমান বাবুর কবর ঘেঁষে। ছবি : কালের কণ্ঠ

লালমনিরহাটের হাতীবান্ধা উপজেলার ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে সরকারি অর্থায়নে টয়লেট নির্মাণ করা হয়েছে এক শহীদ মুক্তিযোদ্ধার সমাধির পাশে। এ ঘটনাকে ন্যক্কারজনক মন্তব্য করে ক্ষোভ প্রকাশ করেছেন এলাকার মুক্তিযোদ্ধারা। বাধা দেওয়ার পরও টয়লেট নির্মাণ করায় মুক্তিযোদ্ধার অসহায় পরিবারটি এখন কবরটিই সরিয়ে নিতে আকুল আবেদন জানিয়েছে।

হাবিবুর রহমান হাবু নামের এ মুক্তিযোদ্ধা লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার তালিকাভুক্ত ১১ শহীদের একজন। তাঁর বাড়ি লালমনিরহাটের কালীগঞ্জ উপজেলার চামটাহাট এলাকার কৈটারী গ্রামে। তাঁর বাবা প্রয়াত আব্দুর রেজ্জাক ও মা রোকেয়া বেগম। তিন ভাইবোনের মধ্যে সবার বড় ছিলেন হাবু। দশম শ্রেণির ছাত্র থাকা অবস্থায় তিনি মুক্তিযুদ্ধে অংশ নেন। ১৯৭১ সালের ১৯ সেপ্টেম্বর হাতীবান্ধার টংভাঙ্গা এলাকায় সম্মুখযুদ্ধে গুলিবিদ্ধ হন হাবু। তখন এক রাজাকারের সহায়তায় তাঁকে ধরে রশি দিয়ে গাড়ির সঙ্গে বেঁধে এলাকাটি কয়েকবার ঘুরিয়ে শেষ পর্যন্ত তাঁকে সেখানে চাকায় পিষ্ট করে হত্যা করে একটি পরিত্যক্ত কুয়ায় মরদেহটি ফেলে দেওয়া হয়। স্বাধীনতার পর সেটিকে কবরে রূপ দেওয়া হয়।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, ২০১৪-১৫ অর্থবছরে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের পিইডিপি-৩ প্রকল্পের আওতায় বিদ্যালয়ে অত্যাধুনিক টয়লেট (ওয়াশরুম) তৈরির দরপত্র আহ্বান করে জনস্বাস্থ্য প্রকৌশল অধিদপ্তর। গত বছরের ১৩ আগস্ট সংশ্লিষ্ট ঠিকাদারকে সেটি নির্মাণের কার্যাদেশ দেওয়া হয়। প্রায় সাড়ে সাত লাখ টাকা ব্যয়ে নির্মিত টয়লেটটি নির্মাণ শেষে গত ২৪ ফেব্রুয়ারি বিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তর করা হয়।

গত রবিবার ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে গিয়ে দেখা যায়, বিদ্যালয় মাঠের উত্তর দিকে একাডেমিক ভবনের অবস্থান। মাঠের পূর্ব ও পশ্চিম অংশে ফাঁকা জায়গা থাকার পরও দক্ষিণ প্রান্তে তৈরি করা হয়েছে টয়লেটটি। এর ঠিক পেছনেই রয়েছে শহীদ হাবিবুর রহমান হাবুর পাকা কবর। টয়লেট থেকে কবরের দূরত্ব তিন থেকে চার ফুট। কবরটির অবস্থান স্থানীয় বাসিন্দা আব্দুর রশিদের বাঁশঝাড়ের ভেতর। সেদিন এ প্রতিনিধির সঙ্গে শহীদ হাবুর একমাত্র ছোট ভাই হামিদুর রহমান ঘটনাস্থলে গিয়ে ভাইয়ের কবরের পাশে টয়লেট নির্মাণ দেখে ডুকরে কেঁদে ওঠেন।

হামিদুর রহমান কান্নাজড়িত কণ্ঠে বলেন, ‘প্রশাসনসহ সংশ্লিষ্টরা সম্পূর্ণ অসম্মানজনকভাবে সেই সমাধি ঘেঁষে তৈরি করেছে টয়লেট। এটা আমাদের জন্য অত্যন্ত কষ্টকর। তাই শহীদ ভাইয়ের আত্মার শান্তির জন্য তাঁর দেহাবশেষ সেখান থেকে নিজের এলাকায় নিয়ে আসার দাবি জানাচ্ছি। ’ হাতীবান্ধা উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা কমান্ডার ফজলুল হক বলেন, তাঁদের বাধা অগ্রাহ্য করে টয়লেটটি স্থাপন করা হয়েছে। উপজেলা মুক্তিযোদ্ধা সন্তান কমান্ডের আহ্বায়ক স্কুল শিক্ষক রোকনুজ্জামান সোহেল গতকাল বলেন, ‘মাত্র চার দিন আগে খবরটি পেয়ে আমি সেখানে গিয়ে স্কুল কর্তৃপক্ষকে ওয়াশরুমটি ব্যবহার না করার অনুরোধ করে এসেছি। ’

ভবানীপুর সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক লুত্ফা শিরিন দাবি করেন, ‘স্কুলের পাশে থাকা কবরটি যে একজন শহীদের, তা প্রথমে আমরা জানতাম না। ’ তবে নির্মাণের আগেই স্কুল পরিচালনা কমিটির সভার রেজুলেশনে শহীদের কবরের কথা উল্লেখ রয়েছে জানানো হলে তিনি সদুত্তর দিতে পারেননি। তবে ঠিকাদারি প্রতিষ্ঠান এনবি কনস্ট্রাকশনের স্বত্বাধিকারী মাজেদুর রহমান ছন্দ জানান, টয়লেটটির স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছে স্কুল কর্তৃপক্ষ। ’


মন্তব্য