kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


যেখানে ‘সবাই’ ব্যস্ত হরিলুটে!

বন গবেষণা ইনস্টিটিউট

জামাল হোসেইন, চট্টগ্রাম থেকে ফিরে   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



যেখানে ‘সবাই’ ব্যস্ত হরিলুটে!

চট্টগ্রামে দেশের একমাত্র বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে পর্যাপ্তসংখ্যক গবেষক নেই। ফলে বীজবাগানের পুরো মাঠ খালি পড়ে আছে। ইনস্টিটিউটের অন্যান্য বাগানের চিত্রও একই রকম। (ইনসেটে) গবেষকদের বাসার সামনেই জায়গা দখল করে নির্মিত হয়েছে কাঁচা ঘর। ছবি : কালের কণ্ঠ

চট্টগ্রামের ষোলশহরে দেশের একমাত্র বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে সরকারি টাকায় যেন হরিলুটের মহোৎসব চলছে। গবেষণার নামে কোটি কোটি টাকা খরচ করলেও প্রতিষ্ঠানটির ৬১ বছরের ইতিহাসে নেই তেমন কোনো উল্লেখযোগ্য সাফল্য।

এর কর্মকর্তা-কর্মচারীদের কেউ বনজ সম্পদ লুটপাটে ব্যস্ত, কেউ গবেষণার জায়গা দখল করে, গাছ কেটে কাঁচাঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছেন, কেউ অফিস না করে নিজস্ব দোকান চালাচ্ছেন আবার কেউ কেউ বিদেশে থেকেই চাকরির বেতন তুলছেন। হাতেগোনা দু-একজন বাদে ছোট থেকে বড় কর্তা প্রায় সবার বিরুদ্ধেই কমবেশি এমন অভিযোগ রয়েছে।

সূত্র জানায়, বন গবেষণা ইনস্টিটিউটটির অধীনে ২১টি স্টেশন রয়েছে। জনবল সংকট, কর্তৃপক্ষের চরম অবহেলা ও লুটপাটে প্রতিষ্ঠানটির ত্রাহি অবস্থা। অন্তত ৭৫০ জন লোকবল থাকার কথা থাকলেও তার অর্ধেকও নেই। যে সংখ্যায় গবেষক থাকার কথা, তা না হয়ে তৃতীয় ও চতুর্থ শ্রেণির কর্মচারী পদ ভরপুর। গবেষণার অভাবে প্রতিষ্ঠানটি এখনো লোকচক্ষুর আড়ালেই রয়ে গেছে। এখানে গবেষণা কিংবা বনায়নের উন্নয়নে কী ধরনের কাজ হয়, তাও অনেকেই জানে না। অথচ প্রতিবছরই সরকারি বরাদ্দ থাকছে, যা ভাগাভাগি করে নিজেদের আখের গোছাচ্ছেন অসাধু কর্মকর্তা-কর্মচারীরা। ভাগাভাগির বিষয়টি নিয়ে মাসিক সভায় কয়েকজন কর্মকর্তার মধ্যে হাতাহাতির ঘটনাও ঘটেছে। বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের আওতায় রয়েছে দেশের একমাত্র পাইন বাগান ও বীজ উত্পাদন বাগান। এ বাগানের জায়গা দখল করে কর্মকর্তা-কর্মচারীরা বসতিসহ ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান খুলেছেন। ভাড়াটিয়ারা বনের গাছপালা কেটে রান্নার কাজে ব্যবহার করছে। কাঁচাঘরগুলোয় রয়েছে অবৈধ বিদ্যুৎ ও গ্যাসের সংযোগ। পাশাপাশি রয়েছে ওয়াসার পানির অবৈধ লাইন।

নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন কর্মচারী বলেন, ‘এখানে গবেষণার জন্য একাধিক বিভাগ রয়েছে। এসব বিভাগে কোনো বৈজ্ঞানিক কর্মকর্তা নেই, তবে প্রতিটি বিভাগেই একাধিক কর্মচারী রয়েছে। এরা বিভাগের গবেষণার জায়গা দখল করে কাঁচাঘর তুলে ভাড়া দিচ্ছে। আর কর্মকর্তাদের জন্য বরাদ্দ বাসায় নিজেরা থাকছে। এটা শুধু নামেই গবেষণা ইনস্টিটিউট, এখানে কাজের কাজ কিছুই হয় না। বাইরে থেকে এটি সুন্দর দেখালেও ভেতরের পরিবেশ বস্তির চেয়েও খারাপ। ’

৬১ বছরেও কোনো উল্লেখযোগ্য গবেষণার সাফল্য নেই প্রতিষ্ঠানটির। প্রতিবছরই নেওয়া হয় নতুন নতুন গবেষণা প্রকল্প। গৃহীত এসব প্রকল্পের টাকা উন্নয়ন বা গবেষণার নামে চলছে হরিলুট। পাশাপাশি প্রকল্পগুলোর ফোকাসিং করা বাবদ সরকার বছরের পর বছর লাখ লাখ টাকা বরাদ্দ দিয়ে যাচ্ছে। এত টাকা খরচের পরও কাজের কাজ কিছুই হয়নি। বন ও পরিবেশ মন্ত্রণালয়ের সচিব গত বছরের ১১ নভেম্বর এক ঝটিকা সফরে এসব অপকর্ম দেখে চরম অসন্তোষ প্রকাশ করেছেন। এ ছাড়া ২০১২-১৩ অর্থবছরে এক কোটি ৬০ লাখ টাকা ব্যয়ে তিন পার্বত্য জেলায় বাশক পাতা চাষ প্রকল্প হাতে নিলেও শেষ পর্যন্ত এটিও কোনো সুফল বয়ে আনেনি।

বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটে বন ব্যবস্থাপনা শাখা ও বনজ সামগ্রী শাখার অধীন ২০টি গবেষণা বিভাগ রয়েছে, যার মাধ্যমে বনজ দ্রব্যের ব্যবহারিক ও অভিযোজ্যতা গবেষণা করা হয়। এ ছাড়া বৃক্ষ ও পরিবেশগত অবস্থার ভিত্তিতে দেশের বিভিন্ন স্থানে এই সংস্থার ২১টি গবেষণা স্টেশন রয়েছে। এই প্রতিষ্ঠানে বিভিন্ন শ্রেণির ৭০ জন গবেষক এবং প্রায় ৬৫০ জন সহায়ক কর্মকর্তা ও কর্মচারী থাকার কথা রয়েছে। তবে কর্মচারীদের বাড়লেও গবেষকদের সংখ্যা প্রতিনিয়ত কমছে। নাম প্রকাশে অনিচ্ছুক একজন গবেষক বলেন, ‘এখানে কাজের তেমন কোনো সুযোগ-সুবিধা নেই। গবেষকরা গবেষণা করতে চায় অথচ গবেষণার কোনো পরিবেশ নেই। দিনের পর দিন কাজ ছাড়া বসে থাকতে হয়। যার  কারণে সুযোগ ফেলে সবাই চলে যায়। ’

ওই গবেষক আরো বলেন, ‘আর এখানের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে বন গবেষণা কর্মচারী সংঘ। এ সংঘের নেতারা গবেষকদের উপস্থিতি সহ্য করতে পারে না। কারণ গবেষকরা থাকলে তাদের  কাজ বাড়বে। গবেষকদের থাকার জায়গা তারা দখল করতে পারবে না। গাছ কেটে কাঁচা ঘর তুলতে পারবে না। ফলে তারা গবেষকদের সঙ্গে সব সময় খারাপ ব্যবহার করে। একজন উচ্চ শিক্ষিত ছেলে এখানে প্রতিনিয়ত অপমানিত হবে। এটা তো কেউ চায় না। ’

এদিকে লুটপাটের সুযোগ থাকায় কর্মকর্তা-কর্মচারী নিয়োগেও যথাযথ নিয়ম অনুসরণ না করার অভিযোগ রয়েছে। সম্প্রতি নিয়োগ-বাণিজ্য নিয়ে বিভিন্ন সংবাদপত্রে লেখালেখি হওয়ার পর তা স্থগিত করেন ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষ। নিয়োগ বিজ্ঞপ্তিতে গরমিল, নিয়োগ পরীক্ষায় অনিয়ম, নিয়োগ কমিটির ছাড়পত্রের মেয়াদ না থাকা, স্বজনপ্রীতিসহ নানা অনিয়মের অভিযোগে নিয়োগপ্রক্রিয়া স্থগিত করে মন্ত্রণালয়। এ ছাড়া প্রতিষ্ঠানটির পদোন্নতি নিয়েও রয়েছে নানা অভিযোগ। ওয়ার্ক সুপারভাইজার রফিকুল ইসলাম পালন করছেন বিভাগীয় কর্মকর্তার (প্রশাসন) দায়িত্ব। এখন আবার উচ্চতর পদোন্নতি নিতে মন্ত্রণালয়ে দৌড় শুরু করেছেন তিনি। নিয়ম ভঙ্গ করে মুখ্য গবেষণা কর্মকর্তার দায়িত্ব পালন করছেন বিভাগীয় কর্মকর্তা খুরশিদা আক্তার। এ বিষয়ে জানতে চাইলে দুজন কর্মকর্তার কেউ কালের কণ্ঠের সঙ্গে কথা বলতে রাজি হননি।

গবেষণা কেন্দ্রের বিভিন্ন পদের কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বিরুদ্ধে রয়েছে কর্মস্থলে উপস্থিত না থেকে বেতন তোলার অভিযোগ। সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের সঙ্গে বোঝাপড়ার মাধ্যমে মাসের কোনো একসময় অফিসে এসে হাজিরা খাতায় স্বাক্ষর করে চলে যান। সংশ্লিষ্ট সূত্র জানায়, খায়রুল আলম মজুমদার নামের এক দক্ষ কর্মী গত সাত মাস ধরে বিনা ছুটিতে মালয়েশিয়া অবস্থান করছেন। তবে তাঁর বেতন উঠানো বন্ধ হয়নি। কাজ না করে বেতন উঠানোর একই রকম অভিযোগ রয়েছে ফরেস্ট রেঞ্জার দিলশাদ, ব্ল্যাক স্মিথ (কামার) মো. আলী, মাঠ সহকারী পিযুষ কান্তি দাশ, নৌকাচালক অরুণ কুমার, ফটিকছড়ির হারুয়ালছড়ির স্টেশনের সনাতন তরীর বিরুদ্ধেও।

পাশাপাশি অফিস চলাকালীন সময়ে কাজ না করে গবেষণা কেন্দ্রের সম্মুখভাগে নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠানে বসে ব্যবসা করার অভিযোগও রয়েছে কয়েকজন কর্মচারীর বিরুদ্ধে। তাঁরা হলেন চা দোকানদার দক্ষ কর্মী আমান উল্লা, মাঠ সহকারী মুদি দোকানদার আবদুর রহিম, নাছির ও জসিম উদ্দিন। জানতে চাইলে বিভাগীয় কর্মকর্তা (বীজ বাগান) হাসিনা মরিয়ম বলেন, ‘এসব বিষয় আমার জানা ছিল না। সত্যতা পাওয়া গেলে ব্যবস্থা নেওয়া হবে। ’

গবেষণা কেন্দ্রের কর্মচারীরা অফিস সময়ে ডিউটি না করে ব্যস্ত থাকেন গবেষণা এলাকায় অবস্থিত নিজের ব্যবসাপ্রতিষ্ঠান নিয়ে। এসব কর্মচারীর দাপটের কাছে অসহায় ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। ফলে তাঁদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে ভয় পান তাঁরা। প্রতিষ্ঠানটির সিবিএ নেতাদের কাছে প্রতিনিয়তই নাজেহাল হচ্ছেন ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা। তাঁরা মান-সম্মানের ভয়ে ব্যবস্থা নেওয়া থেকে বিরত থাকার কৌশল নিয়েছেন।

জানতে চাইলে বাংলাদেশ বন গবেষণা ইনস্টিটিউটের পরিচালক ড. শাহিন আক্তার কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটিতে বিভিন্ন অনিয়ম রয়েছে। তবে আমি দায়িত্ব গ্রহণের পর ধীরে ধীরে তা কাটিয়ে ওঠার চেষ্টা চালাচ্ছি। আশা করছি, অচিরেই এসব সমস্যার সমাধান হয়ে যাবে। ’


মন্তব্য