kalerkantho

বৃহস্পতিবার । ৮ ডিসেম্বর ২০১৬। ২৪ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৭ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


চট্টগ্রাম বন্দরে সিগারেট আটক

সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টই চোরাচালান চক্রের খোঁজ দিতে পারে!

আসিফ সিদ্দিকী, চট্টগ্রাম   

৫ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



চট্টগ্রাম বন্দরে এক সপ্তাহের ব্যবধানে আমদানি নিষিদ্ধ ১২ কোটি টাকার সিগারেটের দুটি চোরাচালান আটক করা হয়েছে। চালানগুলোর আমদানিকারক দুটি ভিন্ন প্রতিষ্ঠান হলেও রপ্তানিকারক প্রতিষ্ঠান একই।

তবে চক্রটি একই সমুদ্রপথ, একই বন্দর এবং একই কনটেইনার লাইন এজেন্ট ব্যবহার করে পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দরে এনেছে। সে কারণে এই দুটি চালানের মধ্যে যোগসূত্র রয়েছে বলে মনে করছেন শুল্ক গোয়েন্দারা। তাঁরা আরো মনে করছেন, চালান ছাড় করানোর দায়িত্বে থাকা সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের মাধ্যমে চক্রটিকে খুঁজে বের করা সম্ভব হবে।

বন্ড লাইসেন্সের শুল্কমুক্ত সুবিধার বিপরীতে সুতা আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা হয় দুটি চালান। একটি চালান আটক করা হয় গত ২৫ ফেব্রুয়ারি, দ্বিতীয়টি আটক হয় গত ২ মার্চ। প্রথম চালানে আসা সিগারেটের বাজারমূল্য পৌনে পাঁচ কোটি টাকা। দ্বিতীয় চালানে আসা সিগারেটের বাজারমূল্য সোয়া সাত কোটি টাকা। দুটি চালানের ক্ষেত্রেই সুতা আমদানির ঘোষণা দেওয়া হয়েছে। চালান দুটির দেশীয় কনটেইনার লাইন এজেন্ট সাকি শিপিং লাইনস। এগুলোর রপ্তানিকারক হচ্ছে সংযুক্ত আরব আমিরাতের আজমান সিটির ডিউটি ফ্রি এলাকার প্রতিষ্ঠান ট্রান্সভেগন জেনারেল ট্রেডিং।

দুবাইয়ের ইকন শিপিং লাইন থেকে দুটি কনটেইনারে বুকিং দেওয়া হয় সিগারেটগুলো। আরব আমিরাতের জেবল আলী বন্দর থেকে মালয়েশিয়ার কেলাং হয়ে চট্টগ্রাম বন্দরে আসে কনটেইনার দুটি।

এ বিষয়ে চট্টগ্রাম শুল্ক গোয়েন্দা ও তদন্ত অধিদপ্তরের উপপরিচালক জাকির হোসেন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘দুটি চালানের মধ্যে কোনো না কোনোভাবে পারস্পরিক যোগসূত্র রয়েছে। তবে দ্বিতীয় চালানের মতো প্রথম চালানটিতে বিল অফ এন্ট্রি দাখিল করার সুযোগ দেওয়া হলে জড়িত সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টও ধরা পড়ত। হয়তো দেখা যেত সিঅ্যান্ডএফও একই। ’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের গোয়েন্দা শাখার (এআইআর) প্রধান ও সহকারী কমিশনার মুকিতুল হাসানও স্বীকার করেছেন, দ্বিতীয় চালানে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে আটক করায় চোরাচালানের রহস্য উদ্ঘাটন কিছুটা সহজ হবে। কারণ আমদানিকারকের নিয়োজিত এজেন্টই হচ্ছে সিঅ্যান্ডএফ। কিন্তু প্রথম চালানে সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টকে বিল এফ এন্ট্রি দাখিলের সুযোগ দেওয়ার আগেই চালানটি আটক করায় এর সঙ্গে কোন সিঅ্যান্ডএফ জড়িত ছিল তা জানা সম্ভব হয়নি।

জানা গেছে, শুল্কমুক্ত সুবিধায় সুতা আমদানির ঘোষণা দিয়ে প্রথম চালানে আসা কনটেইনার খুলে সুতার বদলে পাওয়া যায় আমদানি নিষিদ্ধ ৪৭ লাখ বেনসন অ্যান্ড হেজেস ব্র্যান্ডের সিগারেট। এই ঘটনায় কাগজপত্রে দেখানো হয়েছে আমদানিকারক ঢাকার তৈরি পোশাক প্রস্তুতকারক প্রতিষ্ঠান এফআরসি নিট কম্পোজিটকে। যদিও এই ঘটনায় তারা কোনোভাবে সংশ্লিষ্ট নয় বলে দাবি করেছে।

এ বিষয়ে এফআরসির কর্ণধার মহসিন চৌধুরী কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘বিদেশ থেকে ঋণপত্র খোলার জন্য আমার নির্দিষ্ট ব্যাংক রয়েছে। আর পণ্য খালাসে নির্দিষ্ট সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান রয়েছে। এ ক্ষেত্রে কোনোটিই ব্যবহার করা হয়নি। ফলে কোন চক্র আমার প্রতিষ্ঠানের সুনাম ব্যবহার করে অপকর্ম করেছে তা উদ্ঘাটন করতে জাতীয় রাজস্ব বোর্ড থেকে শুরু করে কাস্টমসে চিঠি দিয়েছি। ’

দ্বিতীয় চালানে পাওয়া গেছে মন্ড ব্র্যান্ডের ৩৮ কার্টন এবং ইজি ব্র্যান্ডের ২৫০ কার্টন সিগারেট। কাগজপত্রে চালানটির আমদানিকারক ঘোষণা দেওয়া হয়েছে ঢাকার আশুলিয়ার প্রতিষ্ঠান জেনেটিক ফ্যাশনস লিমিটেডের নাম।

নিট পোশাক রপ্তানিকারকদের সংগঠন বিকেএমইএর তথ্য অনুযায়ী, জেনেটিক ফ্যাশনস লিমিটেড সংগঠনটির সদস্য। এর সদস্য নম্বর ১২৬৬। সি শ্রেণির এই প্রতিষ্ঠানের নিবন্ধন হয়েছে ২০০৭ সালে। ঢাকার সাভার উপজেলার আশুলিয়া এলাকার জিরাবোতে অবস্থিত কারখানাটিতে বছরে ১২ লাখ পণ্য উত্পাদন হয়, কর্মীসংখ্যা ১৭০। কম্পানির ব্যবস্থাপনা পরিচালক গাজী মজিবুর রহমান।

তাঁর প্রতিষ্ঠানের নামে সুতা আমদানির ঘোষণা দিয়ে আনা কনটেইনারে আমদানি নিষিদ্ধ সিগারেট পাওয়ার বিষয়ে বক্তব্য জানতে গাজী মজিবুর রহমানের দুটি ব্যক্তিগত মোবাইল ফোন নম্বরে যোগাযোগের চেষ্টা করা হয়। কিন্তু তিনি ফোন ধরেননি।

জানা যায়, পণ্যগুলো চট্টগ্রাম বন্দর জলসীমায় পৌঁছার আগেই বিদেশি শিপিং লাইনের বিল অফ লোডিং (বিএল) কাগজপত্র এখানে চলে আসে। নিয়ম অনুযায়ী সেই কাগজপত্র চট্টগ্রাম বন্দর ও কাস্টমসে দাখিল করে বিদেশি কনটেইনার লাইনের দেশীয় এজেন্ট সাকি শিপিং লাইনস। প্রথম চালানের বিএল জমা হয় ২ ফেব্রুয়ারি এবং দ্বিতীয় চালানের বিএল জমা হয় ১০ ফেব্রুয়ারি। বিএল জমা হওয়ার পর জাহাজ থেকে পণ্য চট্টগ্রাম বন্দরে নামে। এরপর সেগুলো খালাসের জন্য বিল অফ এন্ট্রি দাখিল করে আমদানিকারকের নিয়োজিত সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান। চালানটি চট্টগ্রাম বন্দরে নামলেও সিঅ্যান্ডএফ প্রতিষ্ঠান বিল অফ এন্ট্রি দাখিল করার আগেই র‌্যাব-৭-এর তথ্যের ভিত্তিতে গত ২৫ ফেব্রুয়ারি চালানটি আটক করে কাস্টমস।

এই ঘটনায় জড়িত সন্দেহে সাকি শিপিং লাইনসের চার কর্মকর্তা-কর্মচারীকে আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে র‌্যাব।

শুল্ক গোয়েন্দার উপপরিচালক জাকির হোসেন বলেন, ‘সিঅ্যান্ডএফ এজেন্টের দায়িত্ব নিয়ে কথা বলবে এমন কাউকে আমরা এখনো পাইনি। আটককৃতরা অস্বীকার করলেও তাদের পাসওয়ার্ড ব্যবহার করে অন্য কেউ এই কাজটি করবে বলে মনে হয় না। ’

চট্টগ্রাম কাস্টমসের গোয়েন্দা শাখার (এআইআর) প্রধান ও সহকারী কমিশনার মুকিতুল হাসান বলেন, ‘প্রথম মামলায় বাইরের তথ্যের ভিত্তিতে চালানটি আটক করে র‌্যাব। তারাই আসামি আটক করে পুলিশে সোপর্দ করে। ফলে আটক আসামি দিয়েই মামলাটি করা হয়েছে। ’


মন্তব্য