সংশোধন হচ্ছে ইটভাটা আইন-331922 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


সংশোধন হচ্ছে ইটভাটা আইন

আরিফুর রহমান   

৪ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



কৃষিজমি রক্ষা ও পরিবেশদূষণ কমাতে দেড় বছর আগে প্রণয়ন করা হয়েছিল ইটভাটা আইন। সেটি ঠিকমতো কার্যকর করা যায়নি; এখন পিছু হটছে সরকার। ২০১৪ সালের ১ জুলাই পাস করা ‘ইট প্রস্তুত ও ভাটা স্থাপন আইন’ সংশোধন করা হচ্ছে।

আইনের অনেক ধারাই বিলুপ্ত করতে যাচ্ছে পরিবেশ অধিদপ্তর। কিছু ধারা পরিমার্জন ও সংশোধন করা হচ্ছে। গত বুধবার সচিবালয়ে এক বৈঠকে সংশোধনীর খসড়ার ওপর অংশীজনদের মতামত নিয়েছে পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়। খসড়া চূড়ান্ত করার জন্য এ মাসে আরো একটি বৈঠক করা হবে। পরে প্রয়োজনে আরো বৈঠক হবে।

পরিবেশ ও বন মন্ত্রণালয়ের কর্মকর্তারা বলছেন, স্থানীয় সরকার প্রকৌশল অধিদপ্তরের (এলজিইডি) রাস্তা ব্যবহার করে তিন টনের বেশি ইট ও কাঁচামাল পরিবহন নিষিদ্ধ করা আছে বর্তমান আইনে। কিন্তু বাস্তবে এ-সংক্রান্ত ধারা কার্যকর করা যাচ্ছে না। তাই এটি বিলুপ্ত করার প্রস্তাব করেছে পরিবেশ অধিদপ্তর।

এলজিইডির রাস্তা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে ইটভাটা করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। কিন্তু ভাটার মালিকরা এ-সংক্রান্ত ধারা মানছেন না। সংশোধনীতে এটি রাখা হচ্ছে না। তিন ফসলি জমি থেকে মাটি নেওয়া নিষিদ্ধ। এ বিষয়ক ধারায়ও পরিবর্তনের কথা বলা হয়েছে গত সভায়।

ইটভাটা মালিক সমিতির সভাপতি মিজানুর রহমান বাবুল কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘ভাই, আমরাও তো এ দেশেরই মানুষ। আমরাও চাই পরিবেশ বাঁচুক, মানুষ বাঁচুক; কৃষিজমি নষ্ট না হোক। কিন্তু পরিবেশ অধিদপ্তর যে আইন করেছে, তাতে ইটভাটার অস্তিত্বই থাকে না। বাস্তবতার সঙ্গে এ আইনের কোনো মিল নেই।’ উদাহরণ দিয়ে তিনি বলেন, আইনে বলা হয়েছে, এলজিইডির রাস্তা ব্যবহার করে তিন টনের বেশি ইট ও কাঁচামাল পরিবহন করা যাবে না। অথচ একই রাস্তা ব্যবহার করে পাঁচ-সাত টন পণ্য (রড, সিমেন্ট প্রভৃতি) পরিবহন করা হচ্ছে। এটা কোন ধরনের বৈষম্য! আইন করলে সবার জন্য করা হোক।

মিজানুর রহমান বলেন, আইনে বলা হয়েছে, এলজিইডির রাস্তা থেকে আধা কিলোমিটার দূরে ইটভাটা করতে হবে। এটি করতে গেলে তো কৃষিজমি নষ্ট করে, মাটি ভরাট করেই করতে হবে। তাই আইন মেনে চলা অসম্ভব। তিনি বলেন, ‘আমলারা আমাদের সঙ্গে কথা বলেন একভাবে, আর আইন করেন অন্যভাবে—নিজেদের মতো করে। ফলে আইন অবাস্তব হয়। সে জন্যই বিদ্যমান আইনের সংশোধন জরুরি।’

পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, দেশে এখন প্রায় সাড়ে সাত হাজার ইটভাটা রয়েছে। এসবের ৯৫ শতাংশই অবৈধ। ৩৮ শতাংশ বায়ুদূষণ হয় ইটভাটার কারণে। ইটভাটায় বছরে ১২৭ কোটি ঘনফুট মাটির প্রয়োজন হয়।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা বলেন, আইনে বলা হয়েছে, তিন ফসলি জমি থেকে মাটি নেওয়া যাবে না। জলাশয় থেকে মাটি তোলা যাবে না। এলজিইডির রাস্তার পাশে ভাটা করা যাবে না। জ্বালানি-কাঠ ব্যবহার করা যাবে না। আবাসিক এলাকা, সিটি করপোরেশন, সরকারি বা ব্যক্তি মালিকানাধীন বনের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা নির্মাণ করা যাবে না। শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল বা গবেষণা প্রতিষ্ঠানের এক কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা করা যাবে না। কিন্তু এসব নিয়ম না মেনেই বেশির ভাগ স্থানে ভাটা করা হয়েছে। তাই পরিবেশ অধিদপ্তর এসব ইটভাটার জন্য ছাড়পত্র দেয়নি এখনো।

মালিক সমিতির নেতারা বলছেন, আইন মানলে দেশে ইটভাটার অস্তিত্বই থাকে না। এতে এমন অনেক ধারা আছে যেগুলোর বাস্তবের সঙ্গে কোনো সামঞ্জস্য নেই।

পরিবেশ অধিদপ্তরের কর্মকর্তারা জানান, আইন প্রয়োগ করতে গিয়ে বেশ জটিলতায় পড়তে হচ্ছে তাঁদের। আইনে বলা হয়েছে, ইটভাটায় জ্বালানিসাশ্রয়ী ও আধুনিক প্রযুক্তি যেমন হাইব্রিড টানেল, জিগজ্যাগ ও ভার্টিক্যাল শ্যাফট ব্যবহার করতে হবে। এগুলো বায়ুদূষণকে সহনীয় পর্যায়ে রাখে। কিন্তু প্রযুক্তি নির্দিষ্ট করে দেওয়া উচিত নয়। কারণ প্রযুক্তি পরিবর্তনশীল। তাই সংশোধনীতে বলা হয়েছে, জ্বালানিসাশ্রয়ী, আধুনিক ও বায়ুদূষণ সহনীয় মাত্রায় রাখে এমন প্রযুক্তি ব্যবহার করতে হবে। ইটভাটার জন্য মজা পুকুর, খাল, বিল, দীঘি, নদ-নদী, হাওর-বাঁওড়, চর ও পতিত জমি থেকে মাটিকাটা নিষিদ্ধ করা আছে বিদ্যমান আইনে। সংশোধনীতে এসব শর্ত শিথিল করা হয়েছে। বলা হয়েছে, জেলা প্রশাসক বা নিয়ন্ত্রণকারী কর্তৃপক্ষের অনুমোদন নিয়ে খাল-বিল, হাওর, চর ও পতিত জমি থেকে মাটি কাটা যাবে। বিদ্যমান আইনে পাহাড় ও টিলার আধা কিলোমিটারের মধ্যে ইটভাটা না করার বাধ্যবাধকতা রয়েছে। সংশোধনীতে এক কিলোমিটারের মধ্যে না করার প্রস্তাব করা হয়েছে। তবে ইটভাটা মালিক সমিতির নেতারা বলেছেন, এক কিলোমিটার দূরত্বে নয়, বরং পাহাড়ি এলাকায় ইটভাটা নির্মাণ বন্ধ করে দেওয়া উচিত।

পরিবেশ অধিদপ্তরের মহাপরিচালক রইছউল আলম মণ্ডল কালের কণ্ঠকে বলেন, বাস্তবতার কারণে বিদ্যমান আইন সংশোধন করতে হচ্ছে। কিছু ধারা বিলুপ্ত হবে, কিছু ধারার সংশোধন হবে। সংশ্লিষ্ট সবার সঙ্গে আলাপ-আলোচনা করেই সংশোধন করা হবে।

মন্তব্য