বিনা দোষে ২১ বছর কারাগারে অবশেষে-331596 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

বুধবার । ২৮ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১৩ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৫ জিলহজ ১৪৩৭


বিনা দোষে ২১ বছর কারাগারে অবশেষে মুক্ত জবেদ আলী

হাইকোর্টের আদেশ ১৩ বছর পর কার্যকর

মোশাররফ হোসেন, সাতক্ষীরা   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



বিনা দোষে ২১ বছর কারাগারে  অবশেষে মুক্ত জবেদ আলী

উচ্চ আদালত থেকে বেকসুর খালাস পাওয়ার ১৪ বছর এবং গ্রেপ্তার হওয়ার ২১ বছর পর অবশেষে কারাগার থেকে মুক্তি পেলেন বিনা দোষে কারাভোগী সেই জবেদ আলী। গতকাল বুধবার সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে তিনি মুক্তি পান। অভিশপ্ত জীবন নিয়ে তিনি ফিরে যান সাতক্ষীরার কলারোয়া উপজেলার কয়লা গ্রামের নিজ বাড়িতে। সম্প্রতি মাদক মামলার এক আসামি যশোরের শার্শার আবদুর রশীদ মোড়ল তাঁর মুক্তির ব্যবস্থা করেন।

জানা গেছে, কন্যাসন্তান হত্যার অভিযোগে ১৯৯৪ সালের ৬ সেপ্টেম্বর কয়লা গ্রামের মৃত আজমেল আলী বিশ্বাসের ছেলে জবেদ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে বিচার শেষে সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ-২ আদালতের বিচারক মো. সিরাজুল ইসলাম ২০০১ সালের ১ মার্চ জবেদ আলীকে সশ্রম যাবজ্জীবন কারাদণ্ড দেন। এর দুই বছর পর ২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল হাইকোর্ট মিথ্যা অভিযোগ থেকে তাঁকে খালাস দেন। কিন্তু নিম্ন আদালত, বিশেষ করে পেশকারের ‘প্রশ্নবিদ্ধ’ উদাসীনতায় তিনি এত দিন মুক্তি পাননি। আর আইনি অজ্ঞতার কারণে নিয়তি ভেবে এত দিন কারাজীবনই মেনে নিয়েছিলেন। এ নিয়ে গত মঙ্গলবার কালের কণ্ঠে একটি প্রতিবেদন প্রকাশ হয়।

জানা গেছে, ১৬ বছর ধরে মিথ্যা অভিযোগে মুক্তি না মেলায় কোর্ট-কাচারি না চেনা জবেদ আলীর মা ছকিনা বেগমও বুকে পাথর চাপা দেন। এর মধ্যে জবেদ আলী উচ্চ আদালত থেকে মুক্তি পেয়েছেন এমন খবরকে মিথ্যা আখ্যা দিয়ে তাঁর দ্বিতীয় স্ত্রীও চলে যান অন্যের হাত ধরে।

গতকাল বিকেল সোয়া ৫টায় সাতক্ষীরা জেলা কারাগার থেকে বের হন জবেদ আলী। তখন যত দূর চোখ যায় তিনি তাকিয়ে দেখলেন। এরপর কারা ফটকে দাঁড়িয়ে বললেন, ‘যাঁরা দোষী মানুষের বিচার করেন তাঁরা যদি ভুল করেন তবে তাঁদের বিচার কে করবে।’ যাদের ভুলে তাঁর জীবনের ১৩টি বছর বিনা দোষে চলে গেছে তাদের বিচার আল্লাহ করবেন। তিনি বলেন, এ নিয়ে তাঁর আর কারোর বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ নেই।

জবেদ আলীর বৃদ্ধ মা ছখিনা বেগম জানান, জবেদ আলীর প্রথম স্ত্রী ফরিদা খাতুন দুই মেয়ে লিলি খাতুন (৮) ও রোকসেনা খাতুনকে (৫) রেখে মারা যান। এর তিন মাস পর জবেদ আলী আবারও বিয়ে করে। ১৯৯৪ সালের ৫ সেপ্টেম্বর সন্ধ্যায় জবেদ আলীর ছোট মেয়ে লিলি বিস্কুট খেয়ে এর বিষক্রিয়ায় মারা যায়। কিন্তু লিলির মামা এ অভিযোগে মামলা করলে ১৯৯৪ সালে জবেদ আলীকে গ্রেপ্তার করা হয়। পরে ২০০১ সালে নিম্ন আদালতে যাবজ্জীবন সাজা হয়।

পরে ২০০৩ সালে উচ্চ আদালতের খালাসের আদেশটি পাঠানো হয় সাতক্ষীরার অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ দ্বিতীয় আদালতে। এর এক মাস পর ২০০৩ সালের ৩ এপ্রিল তত্কালীন অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ উচ্চ আদালতের রায় ও আদেশের কপি সংযুক্ত করে সংশ্লিষ্ট রেজিস্ট্রার নোট করে বিধি মোতাবেক নথিটি রেকর্ডরুমে পাঠানো হোক মর্মে একটি আদেশ দেন। কিন্তু তাতে মুক্তি দিতে আপত্তি নেই মর্মে জেল সুপারকে নির্দেশ দেওয়া হয়নি। এছাড়া সংশ্লিষ্ট আদালতের পেশকার মতিয়ার রহমানের (বর্তমানে মাগুরা জুডিশিয়াল কোর্টের প্রশাসনিক কর্মকর্তা) ভূমিকা নিয়েও সংশয় রয়েছে। ফলে হাইকোর্টের আদেশ রেকর্ডরুমে বন্দি হয়ে যাওয়ায় এর পরের ১৩ বছরও তাঁকে জেলখানায় থাকতে হয়।

জবেদ আলীর মুক্তিতে সহায়তাকারী যশোরের শার্শা উপজেলার উলুসি গিলাতলার জয়নুদ্দিন মোড়লের ছেলে আবদুর রশীদ মোড়ল জানান, শার্শা থানার একটি মাদক মামলায় তিনি দুই মাস ৯ দিন যশোর কারাগারে ছিলেন। এ সময় তিনি জবেদ আলী মোড়লের ঘটনাটি জানতে পারেন। মাস খানেক আগে জামিনে মুক্তি পাওয়ার পর তিনি জবেদ আলীর ভাইদের জানান, হাইকোর্টে তিনি খালাস পেয়েছিলেন। এর পরই রশিদ ও জবেদ আলীর ভাইয়েরা বিষয়টি সাতক্ষীরা জজ কোর্টের অতিরিক্ত পিপি অ্যাডভোকেট জিল্লুর রহমানকে (২) অবহিত করেন। পিপি বিষয়টি আদালতে তোলেন।

গতকাল বিষয়টি ওঠে সাতক্ষীরা অতিরিক্ত জেলা ও দায়রা জজ (দ্বিতীয়) আদালতে। ভারপ্রাপ্ত বিচারক আশরাফুল ইসলাম শুনানি শেষে নিশ্চিত হন জবেদ আলী নির্দোষ ছিলেন এবং হাইকোর্ট থেকে মুক্তি পেয়েছিলেন। শুনানিকালে জবেদ আলী কিভাবে এত দিন জেল হাজতে রয়েছেন তা শুনে বিস্মিত হন। একপর্যায়ে তাঁকে খালাসের নির্দেশ দেন। এ সময় বিচারক নিজেই হতাশা প্রকাশ করে বলেন, ‘যাদের ত্রুটির জন্য আপনাকে বিনা অপরাধে ১৩ বছর জেলে জীবন কাটাতে হলো তাদের বিচার আল্লাহ করবেন। এ সময় কাঠগড়ায় দাঁড়িয়ে জবেদ আলী হাউমাউ করে কান্নায় ভেঙে পড়েন। জবেদ আলীর কান্না দেখে সেখানে আইনজীবীসহ উপস্থিত সবার চোখ ভিজে আসে। পরে আদালতের কপি জেলে পাঠানো হলে জবেদ আলী মুক্তি পান।

কারাগার থেকে মুক্তি পাওয়ার পর জবেদ আলীর মা ছকিনা বেগম বলেন, ‘যারা আমার জবেদের জীবনের ১৩টি বছর অন্ধকারের মধ্যে রেখে দিল তাদের সাজা হওয়া উচিত। তা না হলে আল্লাহই তাদের বিচার করবে।’ এ সময় উপস্থিত ছিলেন জবেদ আলীর ভাই ইয়ার আলীসহ স্বজনরা।

মন্তব্য