kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


আ. লীগ বিএনপি ও জাপার মনোনয়ন চায় উগ্রপন্থীরা

নিজস্ব প্রতিবেদক, রাজশাহী   

৩ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



আ. লীগ বিএনপি ও জাপার মনোনয়ন চায় উগ্রপন্থীরা

রাজশাহীর বাগমারার ১৬টি ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনের তারিখ এখনো ঘোষণা করা হয়নি। কিন্তু এরই মধ্যে শুরু হয়ে গেছে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের প্রচার।

অন্তত পাঁচটি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে পুলিশের তালিকাভুক্ত বেশ কয়েকজন জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ (জেএমবি) ও কথিত কমিউনিস্ট চরমপন্থী রয়েছে। তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ, বিরোধী দল জাতীয় পার্টি ও বিএনপির মনোনয়ন পেতে তত্পরতা চালাচ্ছে।

ইতিমধ্যেই তারা ক্ষমতাসীন আওয়ামী লীগ ও বিএনপির দলীয় প্রধান এবং স্থানীয় নেতাদের সঙ্গে নিজেদের ছবি দিয়ে পোস্টার, ফেস্টুন ও ব্যানার টানিয়েছে। প্রসঙ্গত, পঞ্চম দফায় আগামী মে মাসে এই উপজেলায় নির্বাচন হতে পারে। খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেএমবি ও কথিত কমিউনিস্ট চরমপন্থী দলের এসব ব্যক্তির অধিকাংশের বিরুদ্ধে হত্যাসহ একাধিক মামলা রয়েছে।

জানতে চাইলে বাগমারা থানার ওসি মতিয়ার রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘জেএমবি ও চমরপন্থীদের তালিকায় যাদের নাম আছে, তাদের অধিকাংশই জামিনে থেকে এলাকায় নির্বাচনী প্রচার-প্রচারণা চালাচ্ছে। তাদের অনেকেই বিভিন্ন দলের ছত্রচ্ছায়ায় রয়েছে। তবে তাদের নজরদারিতে রাখা হয়েছে। ’

এলাকাবাসী সূত্রে জানা গেছে, ১৯৯৫ সালে বাগমারার যোগীপাড়া ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যান আমজাদ হোসেনকে গলা কেটে হত্যার মধ্য দিয়ে এই উপজেলায় পূর্ববাংলা কমিউনিস্ট পার্টির (এলএমএল লাল পতাকা) কর্মকাণ্ড শুরু হয়। এরপর ২০০৪ সালে বিএনপি নেতৃত্বাধীন চারদলীয় জোট সরকারের সময় ওই এলাকায় শুরু হয় জাগ্রত মুসলিম জনতা বাংলাদেশ (জেএমজেবি) নামে ধর্মীয় উগ্রপন্থীদের কর্মকাণ্ড। এর নেতৃত্বে ছিলেন পরবর্তী সময়ে জামা’আতুল মুজাহিদীন বাংলাদেশ নামে দেশজুড়ে হামলা চালানো জঙ্গি সংগঠনটির দ্বিতীয় প্রধান সিদ্দিকুল ইসলাম ওরফে বাংলাভাই।

ওই বছরের ১ এপ্রিল এই জঙ্গি গোষ্ঠীটি বাগমারায় প্রথম তাণ্ডবে নামে। ওই দিন তারা বাগমারায় প্রবেশ করে সর্বহারা অধ্যুষিত গোয়ালকান্দি ইউনিয়নের পলাশী গ্রামে নাটোর সদর এলাকার মোনায়েম হোসেন বাবুকে ধরে এনে গাছের সঙ্গে টাঙিয়ে নির্যাতন করে এবং পরে নির্মমভাবে হত্যা করে। এরপর থেকে ২০০৬ সাল পর্যন্ত এই জঙ্গি সংগঠনটির হাতে রাজশাহী, নওগাঁ ও নাটোরে অন্তত ১৯ জন নিহত হয়।

পুলিশ ও স্থানীয় একাধিক সূত্রে জানা গেছে, উপজেলার গোয়ালকান্দি ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির মনোনয়ন চান জেএমবির শীর্ষ নেতা বাংলা ভাইয়ের অন্যতম সহযোগী মামুনুর রশিদ ওরফে মামুন মুহুরি। পুলিশের তালিকাভুক্ত এই জেএমবি ক্যাডারের বিরুদ্ধে হত্যা ও সন্ত্রাসী কার্মকাণ্ডের অভিযোগে প্রায় ডজন খানেক মামলা রয়েছে। একাধিকবার তিনি গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন। ২০০৪ সাল থেকে মামুন মুহুরি বাংলা ভাইয়ের নেতৃত্বে জাগ্রত মুসলিম জনতার নামে জেএমবির কর্মকাণ্ডে অংশ নেন। সে সময় মামুন মুহুরি ইউনিয়ন বিএনপির সাংগঠনিক সম্পাদক থাকলেও জেএমবিতে যোগ দিয়ে বাংলাভাইয়ের অন্যতম সহযোগী হিসেবে কাজ করেন। তিনি ওই ইউনিয়ন পরিষদের নির্বাচনে চেয়ারম্যান পদে বিএনপির মনোনয়ন পেতে জোর তত্পরতা চালাচ্ছেন। এ ইউনিয়নে বিএনপির আরেক মনোনয়নপ্রত্যাশী জামায়াত নেতা বর্তমান চেয়ারম্যান আবদুল মজিদ খানের বিরুদ্ধে জেএমবিকে সহযোগিতা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

একই ইউনিয়নে চেয়ারম্যান পদে আওয়ামী লীগের মনোনয়ন পেতে তত্পর ইউনিয়ন আওয়ামী লীগের সভাপতি আলমগীর হোসেন সরকার। ২০০৯ সালে আওয়ামী লীগ ক্ষমতায় আসার পর জাতীয় পার্টি থেকে যোগ দেওয়া আলমগীরের নাম ‘চরমপন্থী’ সংগঠন সর্বহারা দলের সদস্য হিসেবে পুলিশের তালিকায় রয়েছে। তিনি গ্রেপ্তার না হলেও ‘চরমপন্থীদের’ দেওয়া স্বীকারোক্তিতে নাম আসায় তাঁর বিরুদ্ধে বাগমারা থানায় দুটি সাধারণ ডায়েরি করে পুলিশ। ‘চরমপন্থীদের’ হাতে নিহত সাবেক চেয়ারম্যান জাতীয় পার্টির নেতা জাহাঙ্গীর আলম সরকারের ছোট ভাই তিনি।

উপজেলার হামিরকুৎসা ইউনিয়নে এবার জাতীয় পার্টি থেকে দলীয় মনোনয়ন চান বাংলা ভাইয়ের আরেক অন্যতম সহযোগী মাহাতাব উদ্দিন খামারু। তাঁর বাড়িতেই করা হয়েছিল জাগ্রত মুসলিম জনতার ক্যাম্প। তাঁর বিরুদ্ধে বাগমারা থানায় হত্যা, চাঁদাবাজি, ত্রাস সৃষ্টি, লুটপাটসহ অন্তত পাঁচটি মামলা রয়েছে।

রাজশাহী র‌্যাব ও পুলিশের একাধিক সূত্র জানায়, জেএমবির আঞ্চলিক কমান্ডার ছিলেন মাহাতাব খামারু। বাংলা ভাইয়ের ‘সেকেন্ড ইন কমান্ড’ হিসেবে এলাকায় ত্রাস সৃষ্টি ও নানা অপরাধে জড়িত ছিলেন তিনি। তাঁকে একাধিকভার গ্রেপ্তারও করেছে পুলিশ ও র‌্যাব। জামিনে এলাকায় ফিরে ইউনিয়ন পরিষদ নির্বাচনের প্রস্তুতি নিয়ে তিনি প্রচার চালাচ্ছেন বেশ জোরেশোরে।

উপজেলার ঝিকড়া ইউনিয়নে বিএনপির দলীয় মনোনয়ন চান বর্তমান চেয়ারম্যান সাইদুজ্জামান রতন। একাধিক মামলার আসামি ও জেএমবির অন্যতম সদস্য হিসেবে রতন গোপন বৈঠক করার সময় দুবার গ্রেপ্তার হয়েছিলেন। এ ছাড়া এখানে বিএনপির মনোনয়নপ্রত্যাশী ইউনিয়ন জামায়াতের আমির ইব্রাহীম হোসেনের বিরুদ্ধে জেএমবি জঙ্গিদের সহযোগিতা করার অভিযোগ রয়েছে। এ ছাড়া এখানে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের তালিকায় থাকা চারজনের মধ্যে রফিকুল ইসলামের নাম পুলিশের ‘চরমপন্থীদের’ তালিকায় রয়েছে। তাঁর বিরুদ্ধে হত্যাসহ দুটি মামলা রয়েছে।

যোগীপাড়া ইউনিয়নে বিএনপির দলীয় মনোনয়নপ্রত্যাশীদের মধ্যে পুলিশের খাতায় ‘চরমপন্থী’ হিসেবে আরিফুল ইসলাম রনির নাম রয়েছে। মাড়িয়া ইউনিয়নে আওয়ামী লীগের দলীয় মনোনয়ন প্রার্থীদের মধ্যে ‘চরমপন্থীদের’ সহযোগিতাকারী হিসেবে অভিযোগ রয়েছে আসকান আলীর বিরুদ্ধে। ‘চরমপন্থীদের’ লিফলেটসহ তিনি একবার গ্রেপ্তারও হয়েছিলেন।


মন্তব্য