kalerkantho

সোমবার । ৫ ডিসেম্বর ২০১৬। ২১ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৪ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


সালিসে ঘটছে হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন

রেজাউল করিম   

২ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



সালিসে ঘটছে হত্যাকাণ্ড মানবাধিকার লঙ্ঘন

হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলায় চার শিশু হত্যা মামলার অন্যতম আসামি পঞ্চায়েত প্রধান আবদুল আলী বাগাল ও তার ছেলে রুবেল এর আগেও একটি জোড়া খুনের মামলার আসামি ছিল। ২০১৪ সালের অক্টোবরে স্থানীয় চা শ্রমিকদের ওপর হামলা ও দুজনকে হত্যার ঘটনায় সেই মামলা হয়েছিল।

স্থানীয় সালিসে পঞ্চায়েত কমিটির মধ্যস্থতায় সেই হত্যার ঘটনা নিষ্পত্তি হয়। পার পেয়ে যায় আব্দুল আলী বাগাল, রুবেলসহ অন্য অভিযুক্তরা। এবার সালিসে অপমানের জের ধরে বাগালের সমর্থকরা চার শিশুকে হত্যা করেছে বলে অভিযোগ উঠেছে।

সালিস-বৈঠকের জের ধরে হত্যা ও মানবাধিকার লঙ্ঘন ঠেকাতে আইনজ্ঞ ও মানবাধিকারকর্মীরা বলেছেন, এসব বেআইনি সালিস বন্ধে সরকারকে কঠোর পদক্ষেপ নিতে হবে।

দেশে এখনো অনেক সময় সালিসে শাস্তি দেওয়ার নামে হত্যাকাণ্ড ঘটে। গত ২২ ডিসেম্বর সাভারের আশুলিয়ায় ধার নেওয়া টাকা সময়মতো পরিশোধে ব্যর্থ হলে এক ভ্যানচালককে সালিসে পিটিয়ে হত্য করা হয়। ১৮ নভেম্বর চাঁপাইনবাবগঞ্জের শিবগঞ্জে উপজেলার দুর্লভপুর ইউনিয়নের ডাকাতপাড়ায় মুনসুর নামের এক ব্যক্তিকে পিটিয়ে হত্য করা হয় সালিসে। অক্টোবরে নওগাঁর মহাদেবপুরের খাজুর ইউনিয়নের রোনাইল আবাসন প্রকল্প এলাকার সুমন রহমানকে সালিসে পিটিয়ে হত্যা করা হয়। একই বছরের মার্চে যশোরের সদর পল্লী এলকায় সালিস না মানায় রাধারাণী মণ্ডলকে পিটিয়ে হত্য করা হয়। ২০১৪ সালের ৭ এপ্রিল কেরানীগঞ্জের কোণ্ডারচর এলাকায় কবুতর চুরির অভিযোগে এক বৃদ্ধকে সালিসে পিটিয়ে হত্য করা হয়।  

এসব বিষয়ে বাংলাদেশ হিউম্যান রাইটস ফাউন্ডেশনের প্রধান নির্বাহী অ্যাডভোকেট এলিনা খান কালের কণ্ঠকে বলেন, সালিসের নামে যেসব অপরাধ ও মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা ঘটছে তার সঠিক কোনো পরিসংখ্যন কারো কাছে নেই। তবে প্রতিবছর গড়ে ৩০টি হত্যাকাণ্ডসহ ৩০০টির বেশি মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা সালিসের মাধ্যমে ঘটে বলে তিনি উল্লেখ করেন। এসব কর্মকাণ্ড বন্ধ করতে সরকারকেই উদ্যোগ নেওয়ার আহ্বান জানান তিনি।

এলিনা খান বলেন, “এ জন্য স্থানীয় সরকার ব্যবস্থা শক্তিশালী করতে হবে। প্রতিটি এলাকার জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহির আওতায় আনতে হবে। স্থানীয়ভাবে বিচারকাজ সম্পন্ন করতে ‘গ্রাম আদালত’ কার্যকর করতে হবে। কোনো বিচার সালিস যেন গ্রাম আদালতের বাইরে সম্পন্ন না হয়, সেদিকে কঠোর নজরদারি রাখতে স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধিদের দায়িত্ব পালন করতে হবে। জনগণের মধ্যে সচেতনতা তৈরি করতেও সরকরাকে কাজ করতে হবে। ” যারা বেআইনিভাবে সালিস করে, তাদের খুঁজে বের করে বিচারের আওতায় আনার দাবি জানান তিনি।

মানবাধিকার সংস্থা আইন ও সালিশ কেন্দ্র (আসক) তাদের পরিসংখ্যানে বলেছে, গত বছর এ রকম হত্যা ও ফতোয়ার ঘটনা ঘটেছে সারা দেশে ১২টি। আসক বলছে, গত ১৫ অক্টোবর বরিশালে সালিসের নামে এক গৃহবধূকে জুতাপেটা করা হয়। সিরাজগঞ্জের তাড়াশে ধর্ষণ মামলা আপস না করায় ধর্ষিতার পরিবারকে সমাজচ্যুত করা হয়। রাজশাহীতে সালিসের মাধ্যমে ক্ষুদ্র নৃগোষ্ঠীর নারীকে ধর্মান্তরিত করে বিয়ে করতে বাধ্য করা হয়। বগুড়ায় হিল্লা বিয়েতে রাজি না হওয়ায় তরুণীর পরিবারকে সালিসের মাধ্যমে একঘরে করা হয়।

আইনমন্ত্রী আনিসুল হক কালের কণ্ঠকে বলেন, বেআইনি সালিস বন্ধে সরকার তত্পর। স্থানীয়ভাবে কোনো ছোটখাটো অপরাধ বা বিরোধের বিচার করতে ‘গ্রাম আদালত আইন ২০০৬’-এর কথা উল্লেখ করে মন্ত্রী বলেন, সরকার আইনটি করে স্থানীয়ভাবে দ্রুত বিচারকাজ সম্পন্ন করতে। ওই আইনে স্পষ্ট বলা হয়েছে, এই আদালতে কোন ধরনের বিরোধ নিষ্পত্তি করা যাবে। গ্রাম্য সালিসের নামে যেন কোনো মানবাধিকার লঙ্ঘনের ঘটনা না ঘটে, এ জন্য তিনি স্থানীয় সরকারের প্রতিনিধি ও পুলিশ প্রশাসনকে সচেতন হওয়ার আহ্বান জানান।

জাতীয় মানবাধিকার কমিশনের চেয়ারম্যান ড. মিজানুর রহমান কালের কণ্ঠকে বলেন, “দেশে আইন-আদালত রয়েছে। আদালত নাগরিকের ন্যায়বিচার নিশ্চিত করবেন। পাশাপাশি আমাদের আদিকাল থেকেই গ্রাম্য সালিসের প্রথা রয়েছে। গ্রাম্য সালিসে পারিবারিক ও সামাজিক ছোটখাটো বিরোধ নিষ্পত্তি করা হয়ে থাকে। আবার স্থানীয় পর্যায়ে দ্রুত ন্যায়বিচার নিশ্চিত করার জন্য গ্রাম আদালত আইন রয়েছে। কিন্তু আমাদের দেশে অনেক ঘটনা ঘটে যেখানে সালিসের নামে হত্যাকাণ্ড পর্যন্ত সংঘটিত হয়। ”

বাংলাদেশ জাতীয় মহিলা আইনজীবী সমিতির নির্বাহী পরিচালক অ্যাডভোকেট সালমা আলী বলেন, ‘আমাদের দেশে যেসব সালিস হয় সেগুলোতে বেশির ভাগ ক্ষেত্রে অমানবিক শাস্তি দেওয়া হয়। সেসব শাস্তি আন্তর্জাতিক ও দেশীয় আইনে নিষিদ্ধ।

প্রসঙ্গত, ২০০৬ সালে গ্রাম আদালত অইন প্রণীত হয়। ২০১৩ সালে আইনটি সংশোধন করা হয়। এই আইনে ইউনিয়ন পরিষদের চেয়ারম্যানকে এই আদালতের বিচারক হিসেবে দায়িত্ব পালনের ক্ষমতা দেওয়া হয়েছে।


মন্তব্য