যাদের জন্য প্রতিষ্ঠান তারাই অরক্ষিত-330681 | খবর | কালের কণ্ঠ | kalerkantho

kalerkantho

মঙ্গলবার । ২৭ সেপ্টেম্বর ২০১৬। ১২ আশ্বিন ১৪২৩ । ২৪ জিলহজ ১৪৩৭


যাদের জন্য প্রতিষ্ঠান তারাই অরক্ষিত

রেজাউল করিম   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



প্রতিবন্ধীদের সুরক্ষার জন্যই প্রতিষ্ঠিত শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট—মৈত্রী শিল্প। অথচ সেখানেই অরক্ষিত তারা। মৈত্রী শিল্পের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুনের স্বেচ্ছাচারিতা ও দুর্নীতির কারণে এর কার্যক্রম স্থবির হয়ে পড়েছে।

মৈত্রী শিল্পে কর্মরত প্রতিবন্ধীদের বেতন-ভাতা না দেওয়া, বেতন-ভাতা চাইতে গেলে কর্মীদের মারধরের অভিযোগ রয়েছে আল মামুনের বিরুদ্ধে। গত দুই বছরে প্রায় ১৫ জন প্রতিবন্ধীকে তিনি নানা অজুহাতে চাকরি থেকে অব্যাহতি দিয়েছেন বলেও অভিযোগ রয়েছে।

নির্বাহী পরিচালককে মৈত্রী শিল্প থেকে সরিয়ে দেওয়ার জন্য সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতি ড. মো. মোজাম্মেল হক এমপি জনপ্রশাসন মন্ত্রণালয়ে লিখিত সুপারিশ করেছিলেন। কিন্তু তা বাস্তবায়ন করা হয়নি।

গত নভেম্বরে এ সুপারিশ করা হয়। স্থায়ী কমিটি বলে, সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের অধীন মৈত্রী শিল্পের নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন (উপসচিব) দুর্নীতিতে আকণ্ঠ ডুবে আছেন। তাঁর দুর্নীতির কারণে প্রতিবন্ধী কর্মচারীদের দিয়ে পরিচালিত সংস্থাটি ধ্বংসের মুখে এসে দাঁড়িয়েছে। এক বছর ধরে কর্মচারীদের বেতন-ভাতা পরিশোধ করা হচ্ছে না। উপরন্তু বেতন চাইতে গেলে তাদের মারধর করেন তিনি। এ নিয়ে পত্রপত্রিকায় খবর প্রকাশিত হয়েছে। বাজারদরের বেশি দর দেখিয়ে ৫৬ লাখ টাকার কাঁচামাল কেনার অভিযোগও রয়েছে তাঁর বিরুদ্ধে।

সূত্র জানায়, উপসচিব আব্দুল্লাহ আল মামুন ২০১২ সালের শুরুর দিকে শারীরিক প্রতিবন্ধী সুরক্ষা ট্রাস্ট মৈত্রী শিল্পের নির্বাহী পরিচালকের দায়িত্ব গ্রহণ করেন। ২০১৪ সালের জুন মাস পর্যন্ত আট মাসের বেতন বকেয়া হয়। তখন থেকেই শ্রমিক-কর্মচারীদের মধ্যে অসন্তোষ দানা বাঁধে। একপর্যায়ে তা আন্দোলনে রূপ নেয়। যাঁরা এতে নেতৃত্ব দেন তাঁদের চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া শুরু করেন আব্দুল্লাহ আল মামুন। ছোটখাটো অভিযোগে এ পর্যন্ত ১০ জনকে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে এবং ছয়জনকে চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে বলে অভিযোগ রয়েছে। তাঁদের মধ্যে মাত্র একজনকে পাওনা বুঝিয়ে দেওয়া হয়েছে। বাকি ১৫ জনের কাউকে বকেয়া বেতন, প্রভিডেন্ট ফান্ড ও গ্র্যাচুইটির টাকা দেওয়া হয়নি। চাকরিচ্যুতদের কারখানায় প্রবেশে নিষেধাজ্ঞাও জারি করেছেন তিনি।

অব্যাহতিপ্রাপ্ত শারীরিক প্রতিবন্ধী সৈয়দ আল ইমরান কালের কণ্ঠকে বলেন, বকেয়া বেতন-ভাতা আদায়ের আন্দোলনে নেতৃত্ব দেওয়ায় তাঁর ওপর ক্ষুব্ধ হন আব্দুল্লাহ আল মামুন। অসুস্থ হওয়ার কারণে কিছুদিন অফিসে যেতে পারেননি তিনি। এটাকেই কারণ দেখিয়ে গত মার্চে তাঁকে অব্যাহতি দেওয়া হয়। তবে তাঁর পাওনা এখনো পরিশোধ করা হয়নি। উল্টো তাঁর কাছে ক্ষতিপূরণ দাবি করেছেন নির্বাহী পরিচালক। ২০১৪ সালের শুরু থেকে আরো ৯ জন প্রতিবন্ধী শ্রমিককে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে বা চাকরি ছাড়তে বাধ্য করা হয়েছে। কারো পাওনাই পরিশোধ করা হয়নি।

মৈত্রী শিল্পে সরেজমিন অনুসন্ধানের সময় কর্মরত শ্রমিকদের অনেকে অভিযোগ করেন, তাঁদের নিয়মিত বেতন-ভাতা দেওয়া হয় না, নির্বাহী পরিচালক ও তাঁর অনুগত কর্মকর্তা মোহসীন আলীর ইচ্ছামতো কাজ করতে হয়। তাঁরা ব্যক্তিগত কাজেও প্রতিবন্ধী শ্রমিকদের ব্যবহার করেন। মনঃপূত কাজ না করলে নির্বাহী পরিচালক নির্যাতন চালান তাঁর অনুগত শ্রমিক ও কর্মচারীদের দিয়ে। এ বিষয়ে জানতে চাইলে সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয়ের যুগ্ম সচিব (প্রতিষ্ঠান ও প্রতিবন্ধিতা) এম এম সুলতান মাহমুদ বলেন, কয়েকজন শ্রমিক-কর্মচারী এই প্রতিষ্ঠানকে ধ্বংস করতে চায়। এসব অভিযোগ তারাই করেছে।

চলে সব তাঁর খেয়ালে : প্রতিষ্ঠানের গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোর বেশির ভাগ শূন্য রয়েছে। কয়েকটি উল্লেখযোগ্য পদে উপযুক্ত কর্মকর্তার পরিবর্তে পছন্দের কর্মচারীদের দায়িত্ব দিয়েছেন নির্বাহী পরিচালক। ব্যবস্থাপক পদটি প্রথম শ্রেণির। এ পদে দায়িত্ব দেওয়া হয়েছে তাঁর বিশ্বস্ত হিসাবরক্ষককে। প্রথম শ্রেণির বাণিজ্যিক কর্মকর্তার দায়িত্বে রয়েছেন একজন অদক্ষ শ্রমিক। হিসাবরক্ষক পদে রয়েছেন একজন পিয়ন। এভাবে প্রতিটি পদে বিশ্বাসভাজন অযোগ্য লোকদের বসিয়েছেন আব্দুল্লাহ আল মামুন।

শ্রমিক-কর্মচারীদের অভিযোগ, গুরুত্বপূর্ণ পদগুলোতে অযোগ্য ও কাছের লোকজনকে বসিয়েছেন নির্বাহী পরিচালক। প্রতিষ্ঠানটি এখন নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন, প্রশাসনিক কর্মকর্তা ইউনুস আহম্মেদ ও হিসাবরক্ষক মোহসীন আলীর কুক্ষিগত। তাঁদের অসদাচরণ ও অনিয়মের বিরুদ্ধে কথা বললে চাকরি থাকে না; নির্যাতন সইতে হয়।

সব অভিযোগ অস্বীকার করে নির্বাহী পরিচালক আব্দুল্লাহ আল মামুন কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘প্রতিষ্ঠানটি বিভিন্ন কারণে লোকসানে ছিল। আমি নির্বাহী পরিচালক হিসেবে যোগদানের পর সেটি  লাভজনক হয়েছে। কিছু শ্রমিক-কর্মচারী ছিল যারা অযোগ্য। তাদের নিয়ম মেনে চাকরি থেকে অব্যাহতি দেওয়া হয়েছে।’ তিনি বলেন, ‘সমাজকল্যাণ মন্ত্রণালয় সম্পর্কিত সংসদীয় স্থায়ী কমিটির সভাপতির এক আত্মীয় এ প্রতিষ্ঠানে কাজ করতেন। তাঁকে শোকজ করার কারণে তিনি ক্ষিপ্ত হয়ে আমার বিরুদ্ধে সুপারিশ করেছিলেন। পরে তদন্তে তাঁর বক্তব্য যথাযথ প্রমাণিত হয়নি।’

মন্তব্য