kalerkantho

রবিবার। ৪ ডিসেম্বর ২০১৬। ২০ অগ্রহায়ণ ১৪২৩। ৩ রবিউল আউয়াল ১৪৩৮।


রাস্তা আটকে জেলা পরিষদ প্রশাসকের ছেলের বিয়ে!

রফিকুল ইসলাম, বরিশাল   

১ মার্চ, ২০১৬ ০০:০০



রাস্তা আটকে জেলা পরিষদ প্রশাসকের ছেলের বিয়ে!

বরগুনা পৌর এলাকার শেরেবাংলা সড়কের ওপর বিশাল প্যান্ডেল বানিয়ে ছেলের বৌভাত অনুষ্ঠানের আয়োজন করেন জেলা পরিষদ প্রশাসক মো. জাহাঙ্গীর কবির। ছবি : কালের কণ্ঠ

তিনি জেলা আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক। জেলা পরিষদেরও প্রশাসক।

দীর্ঘদিন ধরে ইমারত নির্মাণসামগ্রীর ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। তাই জেলা বণিক সমিতির সভাপতিও তিনি। এই তিনি হলেন বরগুনার মো. জাহাঙ্গীর কবির। তাঁর বড় ছেলে রুবায়েত আদনান জেলার প্রতিষ্ঠিত ঠিকাদার। তিনি জেলা আওয়ামী লীগের উপপ্রচার সম্পাদকও। তাঁর বিয়ে উপলক্ষে পৌর এলাকায় ব্যস্ততম একটি রাস্তা আট দিন আটকে রাখা হয়।

রাস্তার ওপর তৈরি করা প্যান্ডেলে গতকাল সোমবার বৌভাত অনুষ্ঠানে ভোজন পর্ব সারেন জেলা প্রশাসক, পুলিশ সুপারসহ প্রশাসনের শীর্ষ পর্যায়ের কর্মকর্তারা। কিন্তু রাস্তা আটকানোর বিষয়ে কোনো প্রশ্ন তোলেননি তাঁরা।  

জানতে চাইলে জেলা প্রশাসক ড. বশিরউল আলম কালের কণ্ঠকে বলেন, ‘সামাজিক অনুষ্ঠান বিধায় অংশ নিয়েছি। রাস্তার ওপর টেবিল-চেয়ার দেখেছি। সেখানে খাবারের আয়োজন ছিল। কিন্তু আমি তাঁর (জেলা পরিষদ প্রশাসক) বাসায় বসেছি। তবে রাস্তা আটকানোর বিষয়টি তখন স্মরণ ছিল না। ’ আটকানোর ব্যাপারেও তিনি কোনো মন্তব্য করেননি।

বরগুনা প্রেসক্লাবে পাঠানো বিয়ের আমন্ত্রণপত্র অনুযায়ী, গত ২৬ ফেব্রুয়ারি শহরের কলেজিয়েট স্কুল রোডে কনের বাড়িতে বিয়ের অনুষ্ঠান সম্পন্ন হয়েছে। কিন্তু এর আগে ২১ ফেব্রুয়ারি শহীদ দিবসই জেলা পরিষদ প্রশাসক জাহাঙ্গীর কবিরের বাসার সামনের হাইস্কুল রোডের প্রায় আধা কিলোমিটার এলাকায় আলোকসজ্জা করা হয়। বিয়ের অনুষ্ঠানের জন্য পৌর শহরে বঙ্গবন্ধু কমপ্লেক্স, আইনজীবী সমিতি, পৌর মিলনায়তন রয়েছে। এর পরও রাস্তা আটকে বিয়ের অনুষ্ঠান করা লোক দেখানোর জন্য—এমন মন্তব্য ওই এলাকার বাসিন্দাদের।

গত ২৭ ফেব্রুয়ারি শনিবার রাতে এ প্রতিবেদক সরেজমিনে ওই রাস্তাটি ঘুরে দেখেন। হাইস্কুল সড়কের প্রথম সেতু লাগোয়া স্টুডিওর মালিক টুলুর বাসার সামনে বিশাল তোরণ তৈরি করা হয়েছে। টুলুর বাসা থেকে মসজিদসংলগ্ন সেতু পর্যন্ত প্রায় আধা কিলোমিটার রাস্তা দুই পাশে বাঁশ ফেলে আটকে দেওয়া হয়েছে। করা হয়েছে আলোকসজ্জা। মসজিদ সেতুর ঢালেই বরগুনা জেলা আওয়ামী লীগের সভাপতি সংসদ সদস্য ধীরেন্দ্রনাথ শম্ভুর বাসা। সেই বাসায় শহর থেকে হেঁটে যাতায়াত করতে হয়েছে। আর বিকল্প সড়কে প্রায় এক কিলোমিটার ঘুরতে হয়েছে। রাস্তা আটকে বিয়ের অনুষ্ঠানের এই আয়োজনে অন্তত ৫০০ পরিবার দুর্ভোগের শিকার হয়েছে। কিন্তু এ ব্যাপারে কেউ বক্তব্য দিতে চায়নি।

গত রবিবার সকালে এ প্রতিবেদক জাহাঙ্গীর কবিরের বাসায় যান। তখন বাসার ছাদে বর-কনের বসার আয়োজন চলছিল। বিষয়টি স্থানীয় সংবাদকর্মীরা টের পেয়ে যান। এমনকি বিষয়টি জাহাঙ্গীর কবিরকে জানানো হয়। পরিস্থিতির অবনতি টের পেয়ে প্রতিবেদক দ্রুত বরগুনা ত্যাগ করেন।

খোঁজ নিয়ে জানা গেছে, জেলা পরিষদ কার্যালয় এবং ডাকবাংলোর আসবাবপত্র বিয়ে উপলক্ষে প্রশাসক তাঁর বাসায় নিয়ে গেছেন। এমনকি সপ্তাহ খানেক ধরে ডাকবাংলোয় অতিথিদের থাকার ব্যবস্থাও করা হয়। শনিবার রাতে সেখানে গিয়ে দেখা গেছে, অপরিচিত লোকজন অবস্থান করছে। তাঁদের পরিচয় জানতে চাইলে তাঁরা বলেন, ‘আমরা জেলা পরিষদের প্রশাসকের ছেলের বিয়েতে এসেছি। ’ তখন সেখানে অন্তত ২০-২৫ জন যুবককে দেখা যায়। সাংবাদিকদের সেখানে আসার বিষয়টি তারা মোবাইল ফোনে একজনকে জানাচ্ছে দেখে স্থান ত্যাগ করতে হয়।

বৌভাত অনুষ্ঠানে ছিলেন এমন একজন কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলা প্রশাসক ড. বশিরউল আলম, পুলিশ সুপার বিজয় বাসক, সিভিল সার্জন ডা. রুস্তুম আলী, পানি উন্নয়ন বোর্ডের (পাউবো) নির্বাহী প্রকৌশলী এস এম শহীদুল ইসলাম, বরগুনা সরকারি কলেজ ও সরকারি মহিলা কলেজের অধ্যক্ষ, সরকারি বালিকা বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষককে অনুষ্ঠানে দেখেছেন। জেলা বিএনপির সাধারণ সম্পাদক এস এম নজরুল ইসলাম, ইসলামী ব্যাংকের ম্যানেজার, এ ছাড়া বরগুনা, পাথরঘাটা ও আমতলী পৌরসভার মেয়ররা বৌভাত অনুষ্ঠানে ছিলেন। জেলা প্রশাসক ও পুলিশ সুপার ছাড়া অন্যরা রাস্তায় নির্মিত প্যান্ডেলে বসে খাবার খেয়েছেন।

পৌর এলাকার শেরেবাংলা সড়কের সোনালী ডেকোরেটরের এক কর্মচারী বলেন, ২১ ফেব্রুয়ারি থেকেই তাঁরা জেলা পরিষদের প্রশাসকের বাসায় কাজ করছেন। গতকাল বৌভাতের অনুষ্ঠানে রাস্তার দুই পাশে ১২০টি খাবারের টেবিল সাজানো হয়েছে। প্রতিটি টেবিলে আটজন করে বসেছে। দুপুর ১টা থেকে বিকেল ৪টা পর্যন্ত প্রায় পাঁচ হাজার লোক খাবার খেয়েছে।

বরগুনা পৌর আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক ও পৌর মেয়র শাহাদাত হোসেন মোবাইল ফোনে কালের কণ্ঠকে বলেন, জেলা পরিষদের প্রশাসক একজন সম্মানিত ব্যক্তি। এ ছাড়া সামাজিক অনুষ্ঠানের কারণে রাস্তা বন্ধ থাকায় প্রতিবেশীদের একটু সমস্যা হয়েছে। দূরত্ব একটু বেশি হলেও বিকল্প রাস্তা থাকায় বিষয়টি তেমন গুরুত্ব দেওয়া হয়নি।

জানতে চাইলে আওয়ামী লীগ নেতা জেলা পরিষদের প্রশাসক জাহাঙ্গীর কবির কালের কণ্ঠকে বলেন, বৌভাতের অনুষ্ঠানে পাঁচ হাজার লোক খেয়েছে। কমিউনিটি সেন্টারে অনুষ্ঠান আয়োজন না করার ব্যাপারে তিনি বলেন, তাঁর বড় বাড়ি আছে, সেজন্য কমিউনিটি সেন্টারে যাননি। কিন্তু রাস্তা আটকে এ ধরনের আয়োজন করা ঠিক হয়েছে কি না জানতে চাইলে ব্যস্ত আছেন বলে ফোন কেটে দেন জাহাঙ্গীর কবির।


মন্তব্য