ঢাকার ধানমণ্ডির সফিউদ্দীন শিল্পালয়ে প্রবেশ করতেই দর্শকদের চোখ আটকে যায় একটি চিত্রকর্মে। চারকোল মাধ্যমে আঁকা ছবিটির নাম ‘চোখ কথা বলে’। ছবিতে ফুটে উঠেছে গভীর দৃষ্টির এক তরুণের অবয়ব। সেই চোখ ভাষাহীন এক গল্প বলছে যেন। ছবিটি এঁকেছেন তরুণ চিত্রশিল্পী আফসীন আব্দুল্লাহ।
আফসীনসহ প্রদর্শনীতে রয়েছে ২৩ জন তরুণ শিল্পীর সৃজনশীল চিত্রকর্ম। তাঁদের অংশগ্রহণে শুরু হয়েছে দলীয় চিত্র প্রদর্শনী ‘হাজারো গল্প’। চার দিনব্যাপী প্রদর্শনীর আয়োজন করেছে সফিউদ্দীন শিল্পালয়। শিল্পীদের কাজের মধ্যে যেমন রয়েছে শেখার অদম্য আগ্রহ ও অধ্যবসায়ের ছাপ, তেমনি প্রতিটি ছবির পেছনে লুকিয়ে আছে ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা, ভাবনা ও অনুভূতির নানা গল্প।
শৈশব থেকেই রং-তুলি নিয়ে সময় কাটাতে ভালোবাসেন আফসীন আব্দুল্লাহ। ইংরেজি মাধ্যমে পড়াশোনা করলেও শিল্পচর্চা তাঁর নেশা। এরই মধ্যে তিনি এঁকেছেন ৫০টির বেশি চিত্রকর্ম। এবারের প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে তাঁর তিনটি কাজ।
জীবনের প্রথম প্রদর্শনীতে অংশ নিতে পেরে ভীষণ উচ্ছ্বসিত আফসীন বলেন, নিজের কাজ দর্শকদের সামনে তুলে ধরতে পেরে খুব ভালো লাগছে। ভবিষ্যতে একক প্রদর্শনী করার ইচ্ছা রয়েছে।
আফসীনকে উৎসাহ দিতে প্রদর্শনীতে এসেছিলেন তাঁর বাবা মোহাম্মদ আব্দুল্লাহ ও মা শামিন্তা আফরীন। সন্তানের শিল্পচর্চার প্রতি তাঁদের সমর্থন ও উৎসাহ ছিল চোখে পড়ার মতো।
প্রদর্শনীতে দর্শকদের দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে ফারিয়া সিমন রহমানের ‘অঞ্জলি লহ মোর’ শিরোনামের চিত্রকর্মটিও। অ্যাক্রেলিক মাধ্যমে আঁকা ছবিতে ধরা পড়েছে এক নৃত্যরত তরুণীর প্রাণোচ্ছল আনন্দময় ভঙ্গি। অন্যদিকে আরিকা জেরিন তিথির ‘বর্ণময় প্রতিরোধ’ শিরোনামের ছবিতে আলো-ছায়ার নাটকীয় ব্যবহারে ফুটে উঠেছে প্রতিরোধের শক্তিশালী ভাষা।
নাবিয়া নাজাহর ‘প্রতিফলনের ভার’ শিরোনামের চিত্রকর্মেও রয়েছে ভিন্নমাত্রা। অয়েল প্যাস্টেলে আঁকা কাজটিতে জ্যামিতিক বিন্যাসের মধ্যে নানা রঙে রঞ্জিত অবয়ব দর্শকদের ভাবনার জগতে নিয়ে যায়।
প্রদর্শনী সম্পর্কে চিত্রশিল্পী, কবি ও শিল্পলেখক জাহিদ মুস্তাফা বলেন, এ ধরনের আয়োজন অংশগ্রহণকারী শিল্পীদের শিল্পবোধ ও আত্মবিশ্বাসকে আরো সমৃদ্ধ করে। দর্শক নতুন প্রজন্মের শিল্পচর্চার বৈচিত্র্য সম্পর্কে ধারণা লাভের সুযোগ পায়।
প্রদর্শনীর পেছনে রয়েছেন শিল্পী রিপন দাস। তিনি শুধু নিজে শিল্পচর্চাই করেন না, নতুন প্রজন্মের শিল্পীদেরও হাতে-কলমে প্রশিক্ষণ দেন। তাঁর তত্ত্বাবধানেই আয়োজন করা হয়েছে ‘হাজারো গল্প’। তিনি জানান, শিক্ষার্থীদের শিল্পকর্মকে বৃহত্তর দর্শকের সামনে তুলে ধরার লক্ষ্যেই এমন আয়োজন।
প্রদর্শনী উদ্বোধন করেন চিত্রশিল্পী ও বীর মুক্তিযোদ্ধা আবুল বারক আলভী। আয়োজকরা জানান, প্রদর্শনীতে স্থান পেয়েছে ৫২টি চিত্রকর্ম। প্রদর্শনী প্রতিদিন সকাল ১১টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত দর্শনার্থীদের জন্য উন্মুক্ত। ১৫ জুন প্রদর্শনীর সমাপ্তি ঘটবে।
নতুন প্রজন্মের শিল্পীদের সৃজনশীলতা, ভাবনা ও শিল্প ভাষার এক অনন্য মিলনমেলায় পরিণত হয়েছে ‘হাজারো গল্প’। ক্যানভাসে ফুটে ওঠা এসব গল্প যেন প্রমাণ করে শিল্প শুধু রং ও রেখার সমাহার নয়, বরং মানুষের অনুভূতি, স্বপ্ন ও জীবনের বহুমাত্রিক প্রকাশ।