kalerkantho

শিক্ষার্থী মূল্যায়ন হচ্ছে কিভাবে?

মাছুম বিল্লাহ

১৬ এপ্রিল, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৯ মিনিটে



শিক্ষার্থী মূল্যায়ন হচ্ছে কিভাবে?

আমরা দীর্ঘদিন ধরে শিক্ষাদান, শিক্ষার্থী মূল্যায়ন, শিক্ষক নির্বাচন এবং শিক্ষকের দক্ষতা যাচাই—সব কিছুই প্রশ্ন কমন পড়ার এক সংস্কৃতির মধ্য দিয়ে বিচার করে আসছিলাম। পরীক্ষা পদ্ধতির মধ্য থেকেই এখানে প্রশ্ন কমনের এক সংস্কৃতি দীর্ঘদিন ধরেই বিরাজ করছিল। এই সংস্কৃতি এমন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছিল যে গোটা সমাজে এমন এক বিশ্বাস দাঁড়িয়ে গেল, যে প্রশ্ন এ বছর আসবে সেটা আর আগামী বছর আসবে না। শুধু প্রশ্নই নয়, গোটা একটি অধ্যায়ই বাদ দিয়ে পরীক্ষা দেওয়া যায়, পরীক্ষায় ভালো ফলও করা যায়। ফলে অর্ধেক অধ্যায় সম্পর্কে কোনো জ্ঞান না নিয়েও পরীক্ষায় ভালো ফলাফল করা চলে। আর যে শিক্ষক এই কাজটি ভালোভাবে করতে পারতেন তাঁকেই শিক্ষার্থী, অভিভাবক, প্রতিষ্ঠান তথা গোটা সমাজ নামকরা শিক্ষক বা সফল শিক্ষক বলে অভিহিত করত। যে অধ্যায়গুলো পড়া হতো সেগুলোর মধ্য থেকে বেছে বেছে কতগুলো প্রশ্নের উত্তর পড়লেই হতো। ফলে শিক্ষকরা নতুন কোনো প্রশ্ন তৈরি করতেন না, প্রশ্নগুলো বছরের পর বছর নকল হচ্ছিল। তাই শিক্ষার্থীদের একটি বিষয় সম্পর্কে পুরো ধারণা দেওয়ার জন্য নিজ থেকে লিখতে পারার দক্ষতা অর্জন করানোর লক্ষ্যে এবং শিক্ষকদের নিজ থেকে প্রশ্নপত্র তৈরি করার দক্ষতা বৃদ্ধির জন্য সৃজনশীল প্রশ্নপত্র চালু করা হয়েছে আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার মূল্যায়ন পদ্ধতিতে। এটি চালু করা হয় ২০১০ সালে। অর্থাৎ ৯ বছর অতিক্রান্ত হয়েছে। এখনো সৃজনশীল পদ্ধতি নিয়ে শিক্ষকদের আতঙ্ক কাটেনি, তাহলে শিক্ষার্থীদের কী অবস্থা হতে পারে তা  সহজেই বোঝা যায়। শিক্ষার্থীদের সঙ্গে সঙ্গে অভিভাবকরাও চিন্তিত। এই ৯ বছরেও পদ্ধতিটি আয়ত্ত করতে পারেননি অর্ধেক শিক্ষক। এত ঢালাওভাবে বলা! আসলে বৈজ্ঞানিক কোনো পদ্ধতি প্রয়োগ করে দেখা যেতে পারে যে কয়জন শিক্ষক আসলেই পারছেন আর কয়জন পারছেন না। সেই সংখ্যা আরো অনেক বেশি হবে। মাধ্যমিক ও উচ্চশিক্ষা অধিদপ্তরের এই তথ্যই সঠিক ধরে নিলাম যে অর্ধেক শিক্ষক এখনো এ পদ্ধতি বুঝতে পারছেন না, তাহলেও প্রশ্ন হচ্ছে, শিক্ষার্থীদের মূল্যায়নটি হচ্ছে কিভাবে? এই শিক্ষকরাই তো শিক্ষার্থীদের বিদ্যালয়ে, আন্ত বিদ্যালয় পরীক্ষায় এবং পাবলিক পরীক্ষায় মূল্যায়ন করছেন। সেই মূল্যায়ন কতটা সঠিক হচ্ছে? আমরা পুরো ভবিষ্যৎ নাগরিকদের সঙ্গে বিষয়টি নিয়ে এক ধরনের তামাশা করছি না তো?

গাইড বইগুলোতে যে নমুনা প্রশ্ন দেওয়া থাকে কিংবা পাবলিক পরীক্ষায় যে প্রশ্ন দেওয়া হয়, বেশির ভাগ শিক্ষক শুধু তা অনুসরণ করে নাম পালটে প্রশ্নপত্র তৈরি করেন। এ ঘটনা ঘটছে যাঁরা নিজেরা তৈরি করেন তাঁদের ক্ষেত্রে, বাকিদের অবস্থা পাঠক বুঝতেই পারছেন। যদি মৌলিকভাবে ওই শিক্ষকদের সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করতে দেওয়া হতো তাহলে অবস্থা কেমন হতো, তা অনুমান করা যায়। তাহলে শিক্ষার্থী মূল্যায়নটি হচ্ছে কিভাবে? এক পাবলিক পরীক্ষার একটি প্রশ্নে যেভাবে একটি সৃজনশীল প্রশ্ন দেওয়া হয়েছে তার নমুনা দেখলে বোঝা যাবে বিষয়টি নিয়ে আমরা আসলেই তামাশা করছি। একটি দৃশ্য। দৃশ্যের এক অংশে পানি, তার মধ্যে রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর এবং আইনস্টাইনের চোখবন্ধ মরা মস্তক। এটি নাকি পরকাল! ওপরে বাড়িঘর, গাছপালা, তার ওপরে সূর্য, মেঘ, এই মেঘের মধ্যে কয়েকটি বই। এটি নাকি ইহকাল! এই হচ্ছে উদ্দীপক। এরপর চারটি প্রশ্ন—ক. ‘দেখে যেন মনে হয় চিনি উহারে’...কাহারে? খ. এপারেতে ছোট ক্ষেত আমি একলা’...একলা কেন? গ. উদ্দীপকের ছবিতে দৃশ্যমান গ্রন্থগুলোর সঙ্গে ‘সোনার তরী’ কবিতার কোন অনুষঙ্গটি সাদৃশ্যপূর্ণ—ব্যাখ্যা করো। ঘ. উদ্দীপকের ছবিটি ‘সোনার তরী’ কবিতার ‘অন্তর্লীন জীবন-দর্শনের চিত্ররূপ’ মন্তব্যটি যাচাই করো।

সৃজনশীল প্রশ্নপত্রে উদ্দীপক হচ্ছে মূল বিষয়। এখানেই শিক্ষকদের সমস্যা। সৃজনশীল প্রশ্ন একটি উদ্দীপক বা দৃশ্যকল্প বা সূচনা বক্তব্য দিয়ে শুরু হয়। এই উদ্দীপক কোনো ঘটনা, গল্প, চিত্র, মানচিত্র, গ্রাফ, সরণি, ছবি, উদ্ধৃতি, অনুচ্ছেদ, পেপার কাটিং ইত্যাদি হতে পারে। পাঠ্যপুস্তকে সরাসরি এ দৃশ্যকল্পটি থাকবে না। তবে দৃশ্যকল্পটি পাঠ্যপুস্তকের বিষয়বস্তুর আলোকে হতে হবে। এটি হতে হবে আকর্ষণীয় ও বোধগম্য। দৃশ্যকল্পের সঙ্গে সংগতি রেখে প্রশ্নের অংশগুলো তৈরি করতে হবে, যা সহজ থেকে ক্রমে কঠিনের দিকে এগোবে। স্তরগুলো হচ্ছে—জ্ঞানস্তর, অনুধাবন স্তর, প্রয়োগ ও উচ্চতর দক্ষতা স্তর। প্রথম কথা হচ্ছে, যে প্রক্রিয়ায় আমাদের শিক্ষক নিয়োগ হয়ে আসছে তাতে শিক্ষকতায় যে অনেক অশিক্ষকও শিক্ষক হয়েছেন, তাতে তো কারো সন্দেহ থাকার কথা নয়। তাহলে সবার পক্ষে কি এ ধরনের জটিল প্রশ্ন তৈরি করা এবং শিক্ষার্থীদের মূল্যায়ন করা সম্ভব?

এ অবস্থায় সৃজনশীল বিষয়ে শিক্ষকরা কতটা দক্ষ হয়েছেন, তা নির্ধারণ করার নিমিত্তে মাউশি নিয়মিত জরিপ পরিচালনা করে থাকে। এটি মাউশির একটি চমৎকার উদ্যোগ। আমরা মাউশির এই পদক্ষেপকে স্বাগত জানাই। ফেব্রুয়ারি-২০১৯ মাসে প্রকাশিত এসংক্রান্ত রিপোর্টে বলা হয় যে সারা দেশে মাত্র ৬০ শতাংশ শিক্ষক সৃজনশীল প্রশ্ন তৈরি করেন। ৪০ শতাংশ করেন না। বরিশালে সৃজনশীলে প্রশ্ন করেন ৩৪ শতাংশ শিক্ষক, এ হার সিলেটে ৪৯ শতাংশ, রংপুরে ৪৬ শতাংশ। এই তিন বিভাগে অর্ধেকেরও বেশি শিক্ষক সৃজনশীলে প্রশ্ন করতে পারেন না। অর্থাৎ তাঁরা বাইরে থেকে প্রশ্ন সংগ্রহ করেন। তাই মাউশির সুপারিশে বলা হয়, বিদ্যালয়ে সৃজনশীল পদ্ধতি নিশ্চিত করতে হলে বাইরে থেকে প্রশ্নপত্র সংগ্রহ সম্পূর্ণভাবে বন্ধ করতে হবে। নিজেরাই যাতে প্রশ্নপত্র তৈরি করতে পারেন সে ব্যবস্থা নিতে হবে। বাইরে থেকে প্রশ্ন আনা বন্ধ হলে অবস্থা তো আরো বেগতিক হবে, কারণ গাইড বইয়ে যাঁরা এই প্রশ্ন তৈরি করেন তাঁরা তো দক্ষ শিক্ষক। সেগুলো দেখে দেখে অন্তত কিছুটা হলেও সবাই সৃজনশীল প্রশ্ন সম্পর্কে ধারণা পাচ্ছেন বা প্রশ্ন কিছুটা হলেও তৈরি করতে পারছেন। সেটি বন্ধ হলে তো ‘ভাঙা নৌকা দিয়ে নদী পার হওয়ার পথও বন্ধ হয়ে যাবে।’ এ জন্য অবশ্য এককভাবে কেউ দায়ী নয়। দায়ী গোটা সমাজ। তবে শিক্ষা মন্ত্রণালয় বিষয়টি নিয়ে কতটা ভাবছে সেটি একটি বড় প্রশ্ন।

সৃজনশীল পদ্ধতিতে শিক্ষকরা যাতে দক্ষ হতে পারেন সে জন্য সেকেন্ডারি এডুকেশন সেক্টর ডেভেলপমেন্ট প্রজেক্ট বিপুলসংখ্যক শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। শিক্ষকরা এ বিষয়ে দক্ষ না হওয়ার কারণ হিসেবে তারা শিক্ষকদের যোগ্যতা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে। তারা বলছে, শিক্ষকদের একাডেমিক ভিত্তি শক্ত না হওয়ায় বেশির ভাগ শিক্ষক এ বিষয়ে দক্ষ হতে পারছেন না। এক কর্মকর্তা বলেন, নতুন যেসব শিক্ষক নিয়োগ পাচ্ছেন, তাঁরা ভালো করছেন এবং করবেন। আগে নিয়োগ পাওয়া শিক্ষকরা প্রশিক্ষণ নিলেও বেশি লাভ হবে না। বিষয়টি আমরা বুঝতেই পারছি যে আগে কিভাবে শিক্ষক নিয়োগ হতো। ২০০৭ সাল থেকে এই প্রকল্প সৃজনশীল পদ্ধতির ওপর এসএসসি ও দাখিল পর্যায়ে চার লাখ ছয় হাজার এবং এইচএসসি ও আলিম পর্যায়ে ৩৬ হাজার শিক্ষককে প্রশিক্ষণ দিয়েছে। এ প্রশিক্ষণের পেছনে সরকারের ব্যয় হয়েছে ১৬৬ কোটি টাকা। রাষ্ট্রীয় কোষাগার থেকে এত বিপুল পরিমাণ অর্থ ব্যয় হয়েছে অথচ কাজের কাজ কিছুই হয়নি। এটি সেভাবে যাচাই করার শক্ত কোনো পদক্ষেপও আমরা দেখতে পাচ্ছি না।

তবে সৃজনশীল প্রশ্নপত্রের ওপর প্রশিক্ষণ নিয়ে শিক্ষকরা বলছেন, তাঁরা এ বিষয়ে পর্যাপ্ত প্রশিক্ষণ পাননি। সৃজনশীল পদ্ধতির জন্য যে প্রশিক্ষণ, তা যথেষ্ট নয়। যে সময় ধরে প্রশিক্ষণ পরিচালিত হয়, তা যথেষ্ট নয়। যে সময় ধরে এ প্রশিক্ষণ হওয়ার কথা তা-ও হয় না। প্রশিক্ষণ দেওয়া হয় নামকাওয়াস্তে। যাঁরা প্রশিক্ষণ দেন, তাঁদের অনেকে নিজেরাই বিষয়টি বোঝেন না বলেও অভিযোগ রয়েছে। এটি আমাদের শিক্ষাব্যবস্থার আরেকটি বাস্তবতা। যখনই সরকারি কোনো প্রশিক্ষণ বা ওয়ার্কশপ বা সভা-সেমিনার হয়, তখনই দেখা যায় সরকারি স্কুল বা কলেজের কিছু শিক্ষক তাঁরা একটি বিষয় জানুক বা না জানুক, বুঝুক বা না বুঝুক, তাঁদেরই এসব গুরুদায়িত্ব দেওয়া হয়। এখানে মাউশি বা মন্ত্রণালয়ের যুক্তি থাকতে পারে যে তাঁদের নাম তাদের কাছে সহজেই জানা, তাঁদের ওপর আলাদা এক ধরনের আস্থা রয়েছে তাদের। তা ছাড়া মন্ত্রণালয় বা মাউশি তাঁদের শনাক্ত করতে এবং তাঁদের সঙ্গে সহজে যোগাযোগ করতে পারে। এগুলো সত্য কিন্তু তাঁদের মধ্যে সবাই যে কোনো বিশেষ বিষয়ে দক্ষ তা কিন্তু নয়। শুধু পদাধিকার বলে যে অনেক টেকনিক্যাল বিষয়ে তাঁরা এক্সপার্ট হবেন এমন কোনো কথা নেই। সেটি মন্ত্রণালয়কে বুঝতে হবে। দেশে শুধু সরকারি পর্যায়ে নয়, বেসরকারি পর্যায়েও বহু রিসোর্স আছে, যা দেশের বৃহত্তর কল্যাণে সরকার ব্যবহার করতে পারে। তা না হলে অবস্থা এ রকমই থেকে যাবে। সৃজনশীলতার নামে এক বদ্ধ ধারণার সৃষ্টি হয়েছে। এই ধারণার মধ্যে আটকে পড়ে শিক্ষকরা উদ্দীপক নামক অংশে এলোমেলো বিষয়ের অবতারণা করছেন, আর সেই সুযোগে শিক্ষার্থীরাও আবোল-তাবোল লিখে নম্বর পাচ্ছে, ভালো গ্রেডিং পাচ্ছে।

কিন্তু আমরা যদি শিক্ষার্থীদের লিখতে দিই—সড়ক দুর্ঘটনা বলতে তুমি কী বোঝো? সড়ক দুর্ঘটনা কী কী কারণে হয়, একজন শিক্ষার্থী হিসেবে সড়ক দুর্ঘটনা একেবারে কমিয়ে আনতে বা বন্ধ করতে তুমি কী সুপারিশ করতে পারো। এটি কি সৃজনশীল প্রশ্ন নয়? এখানে তো কোনো উদ্দীপক নেই অথচ এই প্রশ্নের উত্তর দেওয়ার জন্য একজন শিক্ষার্থীকে বিভিন্ন দিকের ধারণা থাকতে হবে, ধারণা নিতে হবে, নিজের মতামত প্রকাশ করতে বিষয়টি ক্রিটিক্যালি দেখতে হবে এবং বিশ্লেষণ করতে হবে। এর পরিবর্তে আমরা যা দিয়েছি সেটি কতটা সৃজনশীল? সেটি তো শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের এক ধরনের বদ্ধ ধারণার মধ্যে আটকে দিয়েছে এবং পুরো ব্যবস্থায় এক ধরনের বিশৃঙ্খলার সৃষ্টি হয়েছে। এ থেকে পরিত্রাণ দরকার।

লেখক : ব্র্যাক শিক্ষা কর্মসূচিতে কর্মরত সাবেক ক্যাডেট কলেজ ও রাজউক কলেজ শিক্ষক

masumbillah65@gmail.com

মন্তব্য