kalerkantho

বৈষম্য-শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনার বিরুদ্ধের মার্চ

ড. তুহিন ওয়াদুদ

২৬ মার্চ, ২০১৯ ০০:০০ | পড়া যাবে ৬ মিনিটে



বৈষম্য-শোষণ-পীড়ন-বঞ্চনার বিরুদ্ধের মার্চ

ইতিহাসের অন্ধকার সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে। আর সেই অন্ধকার দূর করার নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ মার্চে প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, যা বাস্তবে পরিণত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ২৬ মার্চ। মূলত হাজার বছরের অধীন বাঙালির অধীনতা দূর করার সব চেষ্টা চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল একাত্তরের মার্চেই

 

২৬ মার্চ ১৯৭১। বাঙালির জীবনের অগণিত দিনের চেয়ে আলাদা। এই দিনটি ইতিহাসে বাঙালির গতিপথে বাঁক নেওয়ার একটি দিন। এই দিনটি হচ্ছে হাজার বছরের বাঙালির অধীনতা থেকে মুক্ত হওয়ার জীবন-মরণ লড়াইয়ে নেমে পড়ার দিন।

আমাদের ইতিহাসে আলো ও অন্ধকার সব সময় পাশাপাশি চলেছে। ঘন অন্ধকারেও আমাদের কিছু কিছু মানুষ আলো জ্বেলে রেখেছিলেন। সেই আলোই যূথবদ্ধ হয়ে জ্বলে উঠেছিল একাত্তরে। ইতিহাসের পাতায় দেখলেই চোখে পড়বে, কখনো একচ্ছত্র অন্ধকারে আমাদের সমাজ ডুবে ছিল না। ১৯৪৭ সালে যখন দেশ বিভাগ হয়, তখন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানসহ সবারই ধারণা ছিল, বাঙালি এবার স্বাধীনতার স্বাদ পাবে। দেশ বিভাগের প্রাক্কালে সেই অনুভূতিও বড় হয়ে উঠেছিল। অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনকভাবে সেই ধারণা মিথ্যায় পর্যবসিত হয়েছে। বরং পশ্চিম পাকিস্তানি শোষণ-পীড়ন-নির্যাতন আর বঞ্চনা তীব্র থেকে তীব্রতর হয়ে উঠেছিল।

আজকের বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের জনগণকে ভাবতে হয়েছে নতুন পথ বিনির্মাণ নিয়ে। তবে সেই পথ রচনার ক্ষেত্র প্রস্তুত হয়েছে ধাপে ধাপে। দেশ বিভাগের অব্যবহিত পরেই পশ্চিম পাকিস্তানের শাসকগোষ্ঠী বাংলা ভাষার প্রতি চরম বিমাতাসুলভ আচরণ করে। সংখ্যাগরিষ্ঠ বাঙালির ভাষাকে অগ্রাহ্য করে। বাংলাভাষীদের পক্ষ  থেকে রাষ্ট্রভাষা হিসেবে বাংলার নাম প্রস্তাব করা হলেও তা গ্রহণ করা হয়নি। পশ্চিম পাকিস্তানিদের সঙ্গে বিরোধের ভূমি রচিত হয় সেখান থেকেই।

বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান অত্যন্ত দূরদৃষ্টিসম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। তিনি বাঙালির মুক্তির কথা ভেবেছেন সাংগঠনিকভাবে। আবেগ আর বুদ্ধির এক অনন্য সমন্বয় করেই তিনি বাঙালিকে মুক্তির পথে নিয়ে এসেছেন। এরই এক প্রচেষ্টা লক্ষ করা যায় ‘আওয়ামী মুসলিম লীগ’ থেকে ‘মুসলিম’ শব্দটি বাদ দেওয়ার মধ্যে। এর ফলে বাংলার সব ধর্মের মানুষকে একসারিতে নিয়ে আসার পথ সুগম ও প্রশস্ত হয়েছিল।

পশ্চিম পাকিস্তানিরা বাঙালিকে রাজনৈতিক, অর্থনৈতিক ও সাংস্কৃতিকভাবে অবরোধ করার চেষ্টা করতে থাকে। কাজী নজরুল ইসলামের কবিতা থেকে অনেক বাংলা শব্দকে হিন্দুয়ানি আখ্যা দিয়ে সংশোধনের চেষ্টাও করা হয়েছে; যেমন—‘নব নবীনের গাহিয়া গান, সজীব করিব মহাশ্মশান’ কবিতা সংশোধন করে লেখা হয়েছিল ‘গোরস্তান’। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান বাঙালির মুক্তির কথা ভেবেছেন। তিনি দেখেছেন, বর্তমান বাংলাদেশ তথা তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের মানুষের মুক্তির জন্য স্বতন্ত্র অর্থনৈতিক, রাজনৈতিক, প্রশাসনিক ও পররাষ্ট্র— সামরিক সব ব্যবস্থা থাকতেই হবে। এর কোনো বিকল্প নেই। এসব চিন্তা করে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ১৯৬৬ সালে ছয় দফা উপস্থাপন করেন। পশ্চিম পাকিস্তানিরা এই ছয় দফাকে খুবই ভয় করত। কারণ তারা জানত, এই ছয় দফা বাস্তবায়নের অর্থই হচ্ছে প্রাদেশিক সরকারই মূলত ক্ষমতাধর হবে। কেন্দ্রীয় সরকারের গুরুত্ব কমে আসবে অনেকখানি। কেন্দ্রীয় সরকার ঠুঁটো জগন্নাথে পরিণত হবে। এসব কারণে পশ্চিম পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী এই ছয় দফার বিরোধিতা করতে থাকে। ধর্মীয় আবেগকে কাজে লাগিয়ে তারা বলার চেষ্টা করেছিল, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান ইসলামী রাষ্ট্র ভাঙার পাঁয়তারা করছেন। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমানকে বলা হতো ভারতের দালাল। এর নেপথ্যেও ধর্মীয় আবেগকে তারা ব্যবহার করার চেষ্টা করেছে। “পূর্ব বাংলা যখনই তার ন্যায্য হিস্যার প্রশ্ন  তুলেছে, তখনই তারা ‘ইসলাম গেল’ ‘ইসলাম গেল’ চিৎকার জুড়ে দিয়েছে এবং নিপীড়ন-নির্যাতন চালিয়েছে। মওলানা ভাসানী, বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিব, কমরেড মণি সিংহসহ পূর্ব বাংলার নেতাদের ‘ভারতের দালাল’, ‘ইসলামবিরোধী’ প্রভৃতি খেতাব এই ইসলামপন্থীরা দিয়েছিলেন।” (ড. মোহাম্মদ হান্নান, ‘বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাস’)। কিন্তু বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান এসবের কোনো তোয়াক্কাই করেননি। তিনি বাংলার মানুষের কথা বিবেচনা করেই বরাবর রাজনৈতিক কর্মসূচি গ্রহণ করতেন।

১৯৭০ সালের নির্বাচনে একক সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জনেরও প্রধান কারণ ছিল ছয় দফা। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান দেশ পরিচালনার দায়িত্ব পেলে ছয় দফা বাস্তবায়ন করবেন—এমন অভিপ্রায় সর্বদাই প্রচার করেছেন। দেশবাসী ছয় দফার কথা বিবেচনা করে অকুণ্ঠ সমর্থন দিয়েছে আওয়ামী লীগের পক্ষে। আর ছয় দফার বাস্তবায়ন মানে পরোক্ষে স্বাধীনতাই লাভ করা। কিন্তু পশ্চিম পাকিস্তানিরা যে আগ্রাসী, পৈশাচিক, নির্মম প্রক্রিয়ায় নেমেছিল, তার বিরুদ্ধে মার্চের ২৬ তারিখ স্বাধীনতা ঘোষণার কোনো বিকল্পই ছিল না।

বাঙালির মধ্যে বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান একটি উজ্জ্বল স্বপ্ন তুলে ধরতে পেরেছিলেন, যে স্বপ্নে পৌঁছার জন্য জেলে-মুটে-মজুর থেকে শুরু করে উচ্চবর্গীয়রা পর্যন্ত জীবনকে তুচ্ছ করে যুদ্ধের মাঠে নেমেছিল। ৯ মাসব্যাপী এই ভয়াবহ যুদ্ধে প্রতি মাসে কয়েক লাখ দেশপ্রেমিক অকাতরে জীবন দিয়েছে। এই ৯ মাস প্রতিটি মুহূর্তে জীবন ছিল বিপন্ন। তবু একটিবারও কেউ উচ্চারণ করেনি যুদ্ধ থেকে সরে আসার কথা।

ইতিহাসবেত্তাদের ভাষ্য অনুযায়ী, শুধু ব্রিটিশ শাসনামলে বাঙালি পরাধীন ছিল তা নয়। মধ্যযুগে যারা বাংলা শাসন করেছে তারাও ভিনদেশি। এমনকি সেন ও পাল বংশীয় শাসকরাও এদেশীয় ছিল না। হাজার বছরের পরাধীনতা আর তার চেয়েও বেশিদিন ধরে চলে আসছে শ্রেণি-বৈষম্য। বংশপরম্পরায় চলে আসা বঞ্চনা-শোষণ-পীড়নের ক্ষোভ যেন বাঙালি রক্তে পুষে রেখেছিল। বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান সেই পুষে রাখা ক্ষোভকে জাগিয়ে তুলেছিলেন। ফলে ৩০ লাখ মানুষের জীবন দেওয়ার পরও তারা যুদ্ধে ছিল অনড়।

দিন যত গড়াচ্ছে ততই বোঝা যাচ্ছে, ইতিহাসের অন্ধকার কিভাবে সবচেয়ে বেশি ঘনীভূত হয়েছিল ১৯৭১ সালের ২৫ মার্চের কালরাতে। আর সেই অন্ধকার দূর করার নেতৃত্ব দিয়েছেন বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান। ৭ মার্চে প্রস্তুতি গ্রহণ করার নির্দেশনা দিয়েছিলেন বঙ্গবন্ধু, যা বাস্তবে পরিণত করার নির্দেশ দিয়েছিলেন ২৬ মার্চ। মূলত হাজার বছরের অধীন বাঙালির অধীনতা দূর করার সব চেষ্টা চূড়ান্ত রূপ লাভ করেছিল একাত্তরের মার্চেই।

লেখক : সহযোগী অধ্যাপক, বাংলা বিভাগ, বেগম রোকেয়া বিশ্ববিদ্যালয়, রংপুর

wadudtuhin@gmail.com

মন্তব্য